টানা সাত দিনের অতিভারি বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং একের পর এক পাহাড়ধসে বান্দরবানের সাত উপজেলাই এখন কার্যত দুর্যোগকবলিত। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আরো প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও শুক্রবার রাত ৮টার দিকে আবারও ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আজ শনিবার বান্দরবানের সঙ্গে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও রাঙামাটির সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি উপজেলা রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়া এবং পাহাড়ধসের কারণে এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় যাতায়াতও মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে, জেলার বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা আধানির্মিত ভবনে আশ্রয় নিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ ও স্যানিটেশনের সংকটে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।
জেলা শহরের আর্মিপাড়া, শেরেবাংলা নগর, ওয়াপদা সেতু এলাকা, বনানী স'মিল, ইসলামপুর, ব্রিগেড এলাকা, ক্যাচিংঘাটা, হাফেজঘোনা, বালাঘাটা, কালাঘাটাসহ সাঙ্গু নদীতীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। একইভাবে মাতামুহুরী নদীর পানি বেড়ে লামা ও আলীকদম উপজেলার বহু নিম্নাঞ্চল পানির নিচে চলে গেছে। এসব এলাকার কোথাও কোমরসমান, কোথাও আবার গলা সমান পানি। মানুষ নৌকা, ভেলা কিংবা হেঁটে প্রয়োজনীয় কাজ সারছেন। সুযোগ বুঝে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে নৌকা ভাড়া।
শনিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সরেজমিন বান্দরবান জেলা শহর এবং সদর উপজেলার গোয়ালাখোলা, মাঝেপাড়া, সুলতারপুর, চেমিমুখ, খানসামা, বাঘমারা ও রোয়াংছড়ির ছাইঙ্গ্যা এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উজানের ঢলে সৃষ্টি হওয়া বন্যায় শত শত পরিবার পানিবন্দি। অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি কোমর থেকে ছাদসমান পানিতে ডুবে রয়েছে। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে এসব এলাকার কয়েক শ বসতঘর প্লাবিত হয়েছে।
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে কৃষিতে। বান্দরবান সদর, গোয়ালাখোলা, মাঝেপাড়া, সুলতারপুর, চেমিমুখ, খানসামা, বাঘমারা, রোয়াংছড়ি ছাইঙ্গ্যা, লামা ও আলীকদমের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানির নিচে।
শুধু বসতঘরই নয়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমির আমন ও মৌসুমি ফসল ১০ থেকে ১২ ফুট পানির নিচে। অসংখ্য মাছের ঘের, পুকুর এমনকি লেকও পানিতে ডুবে যাওয়ায় মাছ ভেসে গেছে, অনেক মাছ মারাও গেছে। এতে কৃষক ও মাছচাষিরা ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে এবং অনেক পরিবার দীর্ঘমেয়াদি খাবার সংকটে পড়বে।
সুয়ালকের আমতলী মারমাপাড়ার কৃষক মংপু মারমা বলেন, আমার পাঁচ কানি বরবটির ক্ষেত পুরো শেষ হয়ে গেছে। তিনটি মাছের ঘেরে প্রায় ৮০ হাজার টাকার পোনা ছেড়েছিলাম। মাছ বড় হয়েছিল। আর ১০ থেকে ১৫ দিন পর বিক্রি করার কথা ছিল। বন্যার পানিতে সব ভেসে গেছে।
খানসামা-পূর্ণবাসনের কৃষক শ্যামল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, প্রায় ১২০০ ফলন্ত পেঁপে গাছ পানির নিচে। তিন কানি সবজির জমিও শেষ। অন্তত ১২-১৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষ করেছিলেন। এখন ফসল হারিয়ে ঋণ শোধের পথও অন্ধকার হয়ে গেছে।
এদিকে বন্যা শুধু ঘরবাড়ি নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনও থামিয়ে দিয়েছে। ছাইঙ্গ্যা এলাকার বাসিন্দা মো: ইলিয়াস বলেন, পাঁচ-ছয় দিন ধরে পানিবন্দি। ঘরে খাবার নেই। বাজারে যেতে পারছি না।
গোয়ালাখোলার মো. ইদ্রিস বলেন, ছোট মেয়েটা দুই দিন ধরে অসুস্থ। চারদিকে পানি। নৌকা ভাড়াও অনেক বেশি। আমি দিনমজুর। এক সপ্তাহ ধরে কাজ নেই। মেয়েকে হাসপাতালে নেওয়ার টাকাও নেই।
একই অবস্থা লামা ও আলীকদম উপজেলায়। আলীকদমের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম বলেন, মাতামুহুরী নদীর দুই পাড়ে শত শত একর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। কয়েক শ মাছের ঘের ও পুকুর ভেসে গেছে। শত কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছি।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলেন, বন্যার পানি নেমে গেলে মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এরপর প্রকৃত হিসাব নিরূপণ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এনামুল হাসান বলেন, প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পানি কমলে ইউনিয়নভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হবে।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও পাড়াপ্রধানদের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন্যার পানি না কমা পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।