ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও সিলেট অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট বিভাগের লাখের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছে। বিভাগের হবিগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলেও মৌলভীবাজারে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বাকি দুই জেলার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই। অন্তত সাত হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। খাবার ও সুপেয় পানির সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছে অনেকে।
হবিগঞ্জ জেলার সবচেয়ে বন্যাকবলিত এলাকা হচ্ছে সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়ন। সরেজমিন ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পুরো গ্রামই বন্যায় জলমগ্ন হয়ে আছে। গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ পানিবন্দি অবস্থায়ও ঘরের মায়া ছাড়তে পারেনি, তাই সেখানেই রয়ে গেছে অনেকে।
ওই গ্রামের বাসিন্দা তরুণ মুর্শেদ আলম বলেন, ‘আমরা গত তিন দিন ধরে পানিতে ডুবে আছি। আমাদের বাসাবাড়ি বুক সমান পানির নিচে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারসহ গ্রামবাসী স্কুলেরআশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছি। বর্তমানে টিউবওয়েল বা সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই, সব বন্যার পানির নিচে। নিরাপদ পানি বা খাবার এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহযোগিতা পাইনি।’
বন্যার কারণে এরই মধ্যে হবিগঞ্জে প্রায় তিন হাজার মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন। সেরকম একটি আশ্রয় কেন্দ্র লস্করপুর ইউনিয়নের হাতিরথান এলাকার রাধানন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, নারী-শিশু, বৃদ্ধসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘কিভাবে মানুষ স্কুলঘরে থাকছে, কত যে ভোগান্তি, কিন্তু কেউ তো একবার এসে দেখে না, কেউ সাহায্য করে না। মানুষ এসে উঠছেই। সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু তাদের খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই।’
পাশ থেকে আরেকজন নারী অভিযোগ করে বলেন, ‘খোয়াই নদীর বাঁধ ভাঙায় আমাদের বাড়িঘর সব পানির নিচে চলে গেছে। ছেলে-মেয়ে, গরু-বাছুর, ছাগল নিয়ে কোনোমতে আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছি। অসহায় অবস্থায় কোনোমতে বেঁচে আছি। এখানে চুলো বা রান্না করার কোনো ব্যবস্থা নেই।’
তিনি বলেন, ‘গ্রামের যুবকরা মুড়ি এনে দিয়ে গেছে। আর কোনো খাবার পাইনি। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। ময়লা পানি খেয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, পাতলা পায়খানা হচ্ছে। মেম্বার, চেয়ারম্যান কেউ এসে একবারও খোঁজ নেয়নি।’
স্থানীয়রা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় খোয়াই নদীর কালিগঞ্জ এলাকায় নদী রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত বেগে নোয়াবাদ, চরহামুয়া, সুঘর, বনগাও, নতুন বাজার, বালিহাটা, কালীগঞ্জ, যাদবপুর, বিষ্ণরামপুর, দক্ষিণচর, রামনগর ও বনদক্ষিন এলাকাসহ অন্তত ২৫টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। এ ছাড়া শহরের কামড়াপুর, দানিয়ালপুর ও যশেরআব্দা এলাকায়ও বাড়ি-ঘরে পানি প্রবেশ করে। পরদিন শুক্রবারও পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি উঠে যায়। তবে শনিবারে খোয়াই নদীর পানি অনেকটাই কমেছে এবং বন্যা কবলিত এলাকার পানীয় নামতে শুরু করেছে।
শুধু লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় নদী ভাঙনে প্লাবিত হয়েছে অন্তত ২৫টি গ্রাম। জেলায় পানিবন্দি হয়েছেন অর্ধ লাখের বেশি মানুষ। তারা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্য সংকটের কারণে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন এবং নদীর ভূগর্ভ থেকে মাটি কাটার কারণে বাঁধ ভেঙে বন্যার কবলে পড়তে হয়েছে বাসিন্দাদের।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩ হাজার বন্যার্ত আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে উঠেছেন।
লস্করপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান উজ্জ্বল মিয়া বলেন, ‘এমন বন্যা এই এলাকা আর দেখেনি। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে প্রশাসন এবং ৮টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড হবিগঞ্জের প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ‘ভাঙনপ্রবণ এলাকাগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আশ্রয় নিয়েছেন জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘ভারি বর্ষণ এবং ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর কালীগঞ্জ অংশে ভাঙনের সৃষ্টি হয় এবং পরে প্লাবিত হয় লস্করপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম। দ্রুত ভাঙনের স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হবে।’
হবিগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘বন্যার পরিস্থিতি তদারকি করতে কন্ট্রোলরুম খোলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৫ লাখ টাকা, ১০০ টন চাল ও ১ হাজার ৮২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।’
অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনে বন্যা :
খোয়াই তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন এবং নদীর তলদেশ থেকে মাটি কাটার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তীরের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। ফলে নদী ভাঙন দিয়ে বন্যার কবলে পড়েছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক ত্রাণ নয়, খোয়াই নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, নদী শাসন এবং স্থায়ীভাবে তীর সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ না নিলে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়তে হবে হাজারো মানুষকে।
মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে :
ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা কবলিত মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির দিকে। নদ-নদীর পানি কিছুটা কমলেও মনু নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার মনু নদীর পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে ধলাই, জুড়ী এবং কুশিয়ারা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্তত অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। এরই মধ্যে ৪ হাজার মানুষ বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে উঠেছেন।
এদিকে বন্যায় প্লাবিত জেলার রাজনগর ও কুলাউড়া উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় বাঁধ ভেঙে পানি লোকালয়ে প্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। রাজনগর উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিরপুর ও একামধু এলাকায় বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের শিকরিয়া এলাকায় বাঁধ ভাঙার ফলে তীব্র বেগে পানি ঢুকে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেছে। বন্যায় ৩৫টি গ্রামের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। অনেকেই ভিটেমাটি ছেড়ে উঁচু স্থান বা আশ্রয়কেন্দ্রে সরে গেছেন।
ত্রাণ ও আশ্রয়কেন্দ্র :
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যাকবলিত দুর্গত এলাকায় সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। পানি কমা শুরু করলেও দুর্গত মানুষের মাঝে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাঁধ মেরামতের কাজ ও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জে কমেছে নদীর পানি :
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সবকটি পয়েন্টে নদীর পানি আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে এখনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই। এরমধ্যে সিলেটের কানাইঘাটে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৪১ মিলিমিটার, কুশিয়ারার পানি জকিগঞ্জের অমলসিদে বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৮৯ মিলিমিটার, শেওলায় নদীর পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৯৪ মিলিমিটার, ফেঞ্চুগঞ্জে নদীর পানি বিপৎসীমার শূন্য দশমিক ৭৬ মিলিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, ‘উজানে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাবে সিলেটের সব নদ-নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’
তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক দিন উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নদ-নদীর পানির উচ্চতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে।’




