<p>একজন মানুষ—যিনি ছিলেন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক, সমাজসেবক, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকসুলভ নেতা, এবং একই সঙ্গে একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অথচ জীবদ্দশায় তিনি পাননি তার প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান। তিনি হলেন মৃত মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া।</p> <p>তার পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার ভিটি বিশারা নয়াপাড়ায়। জীবনের শেষ সময় তিনি গ্রামের বাড়ি ও কুমিল্লায় কাটিয়েছেন। ২০১৬ সালে মারা যান তিনি।</p> <p>তার ছেলে সাংবাদিক তরিকুল ইসলাম তরুণ বলেন, আমার বাবা ছিলেন একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার ও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি—দুটো থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন। কোনো সরকারই তার এই ন্যায্য স্বীকৃতি নিশ্চিত করেনি। আমরা চাই, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু স্বীকৃতি পাননি, তাদের সন্তানদেরও মূল্যায়ন সনদ দেওয়া হোক।</p> <p>জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির যোদ্ধা মফিজুল ইসলাম মোহন মিয়া ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। সে সময় তিনি বরিশালের গৌরনদী থানায় কর্মরত ছিলেন।</p> <p>পরিবার সূত্রে জানা যায়, এক পর্যায়ে খবর আসে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গৌরনদী থানা দখল করতে যাচ্ছে। তখন এসপির নির্দেশে, তার নেতৃত্বে থানার অস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ মালামাল পার্শ্ববর্তী একটি কলেজে স্থানান্তর করা হয়। শুধু তাই নয়, তিনি ওই কলেজ মাঠে রাতে স্থানীয় তরুণ ও যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন টিম গঠন করেন এবং তাঁদের প্রশিক্ষণ দেন। ফলে তিনি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।</p> <p>পরিবারের দাবি, যুদ্ধের সেই স্মৃতি, সহযোদ্ধাদের সাক্ষ্য এবং তার তৎকালীন ভূমিকা—সবকিছুই আজও অনেকের মুখে মুখে জীবন্ত রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নথিতে তার নাম না থাকায়, সেই ইতিহাস এখনো পূর্ণ স্বীকৃতি পায়নি।</p> <p><strong>যুদ্ধ শেষে সনদ পেলেও হয়নি গেজেটভুক্তি</strong></p> <p>মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নীপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় তালিকা অনুযায়ী জেনারেল ওসমানীর স্বাক্ষরিত সনদ তাদের মধ্যে প্রদান করা হয়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় এক বেদনাদায়ক অধ্যায়।<br /> পরবর্তীতে সেই সনদ গেজেটভুক্ত করার জন্য বরিশাল থেকে টেলিগ্রাম এলেও তিনি অসুস্থ থাকায় আর সেখানে যেতে পারেননি। ফলে তার মুক্তিযুদ্ধের সনদটি সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। পরে যখন সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান, ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা চালু হয়, তখন গেজেটবিহীন সনদ দিয়ে তিনি আর কোনো সুবিধা গ্রহণ করতে পারেননি।</p> <p><strong>২০১১ সালের যাচাই-বাছাইয়েও বিতর্কিতভাবে বাদ</strong></p> <p>পরিবারের দাবি, ২০১১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের তালিকায় তার নাম ঢাকায় পাঠানো হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সে সময় তিনি রতনপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক থাকায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দুর্নীতির কারণে তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।</p> <p>পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন নবীনগর উপজেলার এক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাকে ‘বিএনপির ট্যাগধারী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং তার জমাকৃত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র উপজেলা অফিস থেকে উত্তোলন করে গায়েব করে দেন। ফলে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, ভাতা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন।</p>