সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য অনুসন্ধান আর মানুষের সুখ-দুঃখের খবর তুলে ধরাই ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। তবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি কৃষির প্রতি ভালাবাসা থেকেই শুরু করেন ফলের বাগান এবং গরু ও মাছের খামার। নাম দিয়েছেন ‘সাইরা অ্যাগ্রো’।
অদম্য পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আজ তিনি একজন সফল উদ্যোক্তা। এখন প্রতিবছর সাইরা অ্যাগ্রো থেকে আয় হয় ৬০ লাখ টাকা। সেখান থেকে সাত কর্মচারীর বেতনসহ সমস্ত খরচ মিটিয়ে বছরে মোট আয় প্রায় ২০ লাখ টাকা।
তরুণ উদ্যোক্তা গোলাম রব্বানীর সফলতার গল্প এটি। লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার দুর্গম চরে জন্ম নেওয়া গোলাম রব্বানী নিজের পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে গড়ে তুলেছেন এ স্বনির্ভর জীবনের পথ। পেশায় মফস্বল সংবাদকর্মী হলেও সেখান থেকে আজ সফল উদ্যোক্তা তিনি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রামগতির চরগাজী ইউনিয়নের চরলক্ষ্মী গ্রামে নিজ বসতবাড়ির পাশে খালি জায়গা থেকেই শুরু হয় রব্বানীর নতুন পথচলা। বাড়ির পাশে অব্যবহৃত ছয় একর ৪০ শতক জমিতে তিনি গড়ে তোলেন ফলের বাগান আর পাশেই গরু ও মাছের খামার। এতে রব্বানীর শুধু নিজের জীবনই বদলায়নি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন তিনি।
রব্বানীর বাবা খবিরুল হকসহ পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে সংবাদকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ছোটবেলা থেকে কৃষির প্রতি আগ্রহ ছিল রব্বানীর। সেই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অব্যবহৃত জমিতে ১৫ জাতের ফলের বাগান করেন তিনি। পাশাপাশি একটি ডেইরি ফার্ম ও মাছের ঘের। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকট থাকলেও হাল ছাড়েননি রব্বানী। সাতটি গরু দিয়ে শুরু করা ডেইরি ফার্মে এখন গরুর সংখ্যা ৩০টি। তার খামার থেকে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার টাকার দুধ বিক্রি হয়। এর থেকে বছরে আয় আসে প্রায় আট লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, রব্বানীর ফল বাগানে ৯ প্রজাতির আম ছাড়াও চেরি ফল, জামরুল, পেওলা ফল, ননী ফল, পেঁপে, চুঁইঝাল, লিচু , মাল্টা, সফেদা, অ্যাভোকাডো, কাউফল, পেয়ারা ও পাঁচ প্রজাতির কলা রয়েছে। এসব ফল বিক্রি করে বছরে আয় করেন আরো ২০ লাখা টাকা। বর্তমানে তার বাগানে উৎপাদিত ফল স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলেও সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাংবাদিকতার মতো ব্যস্ত পেশার পাশাপাশি কৃষিতে সফলতা অর্জন করে রব্বানী অনেকের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। তার দেখানো পথে এলাকার অনেক তরুণ ফলের বাগান ও গরুর খামার করতে আগ্রহী হচ্ছেন।
উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম রব্বানী বলেন, সাংবাদিকতার জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বরাবরই ছিল এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। এ কারণে একসময় নিজের জীবনে ভিন্ন কিছু করার ভাবনা আসে। তাছাড়া সংবাদপত্রে কাজ করতে গিয়ে কৃষি ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে অনেক প্রতিবেদন করেছি। তখনই নিজে কিছু করার বিষয়টি মাথায় আসে। প্রথমে ছোট আকারে খামার ও বাগান গড়ে তুলি। ইছাশক্তি, পরিশ্রম আর পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছি। এ কারণে আজ সফল হতে পেরেছি।
রব্বানী বলেন, ‘কৃষির প্রতি আমার ভালাবাসা অনেক আগের। অবসর সময় আমি বাগানের পরিচর্যা করি। ভালো বেতনে সাতজন লোক নিয়োগ দিয়েছি। নিজের ব্যস্ততার মধ্যেও কর্মচারীদের সঙ্গে সময় দিচ্ছি। আমার বাবাও আমাকে সহযোগিতা করছেন। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম করলে কৃষিতেও ভালো আয় করা সম্ভব।’
রামগতি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান বলেন, কৃষিতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা খুবই কঠিন। আর্থিক সংকট, সচেতনতা ও সময় দিতে অনেকেই আগ্রহী হয় না। সেক্ষেত্রে গোলাম রব্বানীর এ ধরনের উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক ফল চাষের মাধ্যমে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। আমরা আমাদের দপ্তর থেকে তাকে সঠিক পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা দেব।