আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে শেখ হাসিনা বিকল্পহীন ছিলেন—এমন ধারণা সঠিক ছিল না। তিনি বলেন, ‘একজন সাধারণ রিকশাচালকের ২২ বছর বয়সী ছেলেও দেশকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।’
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক ফোরাম আয়োজিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান : সাম্প্রতিক ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা শুধু প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেই নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর বড় অংশও দেশ ছেড়ে চলে যায়। ভবিষ্যতে সমাজবিজ্ঞানীরা এ ঘটনাকে ‘দ্য গ্রেট মাইগ্রেশন অব ফ্যাসিস্ট’ নামে অভিহিত করতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাকে ১২০৩ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খলজির আগমনের সময় লক্ষণ সেনের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসে ক্ষমতাসীনদের আকস্মিক পতনের এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘গত ৫৩ বছরে রাষ্ট্রব্যবস্থার অবক্ষয়, বাকশাল, রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কর্মীদের হত্যার মতো ঘটনার কারণে মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল। মানুষের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না বলেই এই গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে।’
গুমের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাস্তা বা কর্মস্থল থেকে সাদা কিংবা কালো পোশাকধারীরা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যেত। এরপর তাদের ওপর বৈদ্যুতিক শক, ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত, আঙুলে সুচ ফোটানো, যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হতো। অনেককে হত্যার পর লাশ নদী বা সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।’
বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিচারব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা নিজেদের শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ মনে করতেন এবং ম্যাজিস্ট্রেটরা নির্যাতনের বিষয়টি জেনেও রিমান্ড মঞ্জুর করতেন। শেখ হাসিনা মনে করতেন তাঁর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু জুলাই বিপ্লব প্রমাণ করেছে, শেখ হাসিনার বিকল্প ছিল।’
সেমিনারে মুখ্য আলোচকের বক্তব্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বৈরশাসনের অবসান এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে ছাত্র-জনতার ঐক্য শতভাগ সফল হয়েছে। ১৬ বছর ধরে টিকে থাকা একটি স্বৈরশাসনের পতন কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে প্রফেসর ইউনূসকে সমালোচনা করা সবচেয়ে সহজ। অথচ সেই সময় তাঁর কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি নিখুঁত নন, তাঁর সরকারের ভুল থাকতে পারে। কিন্তু দেশের সব সমস্যার দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে স্বৈরাচারকে ফিরিয়ে আনার একটি বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।’
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের অর্জনের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক নকীব বলেন, ‘এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো- ভাষাহীন মানুষ ভাষা খুঁজে পেয়েছে। মানুষ এখন প্রতিবাদ করতে শিখেছে। স্বৈরাচারের ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্র ও আইনি সংস্কার। আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় থাকে।’
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।




