আর্থিক সংকট এড়াতে অনেক বেশি পরিমাণে দেশিবিদেশি ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। সরকারের আয় কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, শুধু উন্নয়ন ব্যয়ই নয়, সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার অতীতে মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে প্রতিদিন। যার ফলে সরকারের দেশিবিদেশি ঋণের বোঝা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। একই সঙ্গে চাপ ঋণের সুদ পরিশোধেরও।
আসছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছর এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটে প্রাক্কলের চেয়েও ৫ হাজার কোটি টাকা বেশি সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তুত করা বাজেট ডকুমেন্টে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এরই মধ্যে আবার নতুন এক ঋণ কর্মসূচির আলোচনা শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে। এ ঋণের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। পরিস্থিতি সামলাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম দুই দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ পরশুদিন রেকর্ড পরিমাণ ১৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এতে একদিকে সরকারের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ। ধারণা করা হচ্ছে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পুরো সময়টা চাপের মধ্যে থাকবে সামষ্টিক অর্থনীতি। খোদ অর্থ বিভাগও এমন ধারণা করছে। তবু বৈশ্বিক চাপ সামাল দিতে একের পর এক সব ধরনের জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বছরব্যাপী ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রক্রিয়াই বেছে নিয়েছে সরকার।
বিশ্বব্যাংক ঢাকার সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ঋণের বোঝা বাড়ছে এটা নতুন নয়। আরও আগে থেকেই এটা বাড়ছে। একসময় বাংলাদেশে পরিশোধ সক্ষমতা বেশ ভালো ছিল। সেটা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এর কারণ হলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত দুর্বল হয়ে যাওয়া। আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি। সরকারের আয় কমে যাওয়া। আবার গত এক দশকে অপ্রয়োজনীয় এবং অতিমূল্যায়িত প্রকল্পগুলোও এর জন্য দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রকৃত রাজস্ব আয় ৪৬৩ কোটি টাকা কম পড়ে। পরে সেই ঘাটতি ঋণ নিয়ে পূরণ করা হয়। পরের বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ঘাটতি বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকায়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রধান মাধ্যম বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) পুরো ব্যয়ই ঋণ নিয়ে চালাতে হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ সংকটের পেছনে রয়েছে কয়েকটি বড় কারণ। একদিকে সরকার বড় বড় মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে, অন্যদিকে বাজেটের আকারও দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে রাজস্ব আদায় বাড়েনি। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ক্রমেই বড় হয়েছে, আর সেই ঘাটতি পূরণে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিতে হয়েছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশকে অন্যতম বড় ঋণদাতা সংস্থা আইএমএফ তাদের ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশ থেকে ‘মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় স্থান দিয়েছে। ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, জিডিপির তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি আয় ও রাজস্ব আদায়ের দুর্বল অবস্থার ভিত্তিতেই এ মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য এ ঋণ পরিশোধের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। সরকার এখন তাদের প্রথম বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ঋণ পরিশোধ ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশিবিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশকে ৩০ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ২৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে শুধু সুদ বাবদই পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই (জুলাই-মার্চ) বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানসহ দাতাদের ঋণের সুদ ও আসলের কিস্তি দিতে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন