পৃথিবীতে মানুষ পরস্পরের প্রতি নির্ভরশীল। পারস্পরিক স্নেহ, মমতা ও সহযোগিতা ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। তাই মানুষের সঙ্গে মানুষের বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ও আচরণই পারস্পরিক এই সম্পর্ক ও তার সৌন্দর্য রক্ষা করে। ইসলাম মানুষকে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় যে নির্দেশনা দিয়েছে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো—
১. নিজের মূল্য ও সীমা জানুন : মুমিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজেকে মূল্যায়ন করবে এবং নিজের সীমা সম্পর্কেও সচেতন থাকবে। সে অন্যকে খুশি করতে নিজের অসম্মান করবে না। আবার নিজের মূল্য রক্ষা করতে গিয়ে অন্যের অসম্মানও করবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুমিনের উচিত নয় নিজেকে অসম্মান করা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২২৫৪)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, মানুষকে তার মর্যাদা অনুযায়ী স্থান দাও। (রিয়াজুস সালিহিন, হাদিস : ৩৫৬)
২. বিনয়ী হোন, দুর্বল নয় : সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুমিন পরস্পরের প্রতি বিনয়ী আচরণ করবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। আল্লাহ বলেছেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে।’
(সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)
তবে নিজের ক্ষতি ও অসম্মান মেনে নেওয়া বিনয়ের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ক্ষতি কোরো না নিজের বা অন্যের। (বায়হাকি, হাদিস : ১১৭১৭)
৩. প্রয়োজনে ‘না’ বলুন : যে কাজে আপনি সক্ষম নন, যে কাজ আপনার জন্য শোভন নয়, তাতে ‘না’ বলতে শিখুন। যেখানে আল্লাহ আপনাকে সাধ্যাতীত কাজের নির্দেশ দেননি, সেখানে কেন আপনি অন্যের কথায় সাধ্যাতীত বোঝা নিজের ওপর চাপিয়ে নেবেন? ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ কারো ওপর এমন কোনো কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তার সাধ্যাতীত। সে ভালো যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই এবং সে মন্দ যা উপার্জন করে তার প্রতিফল তারই।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮৬)
বিশেষত যখন মানুষের সন্তুষ্টি আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয়, তখন কোনো সংকোচ ছাড়াই ‘না’ করা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির আকাঙ্ক্ষা করে তা মানুষের অসন্তুষ্টি হলেও, মানুষের দুঃখ-কষ্ট থেকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ তাআলাই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আর যে ব্যক্তি মানুষের সন্তুষ্টি আশা করে আল্লাহ তাআলাকে অসন্তুষ্ট করে হলেও, আল্লাহ তাআলা তাকে মানুষের দায়িত্বে ছেড়ে দেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৪১৪)
৪. সবাইকে খুশি করা সম্ভব নয় : মুমিনকে অবশ্যই একটি বাস্তবতা মনে রাখতে হবে যে সব মানুষকে খুশি করা সম্ভব নয়। বরং সবাইকে খুশি করার মনোভাব মানুষকে বিভ্রান্ত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যদি তুমি দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষের কথামতো চলো তাহলে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা শুধু অনুমানের অনুসরণ করে, আর তারা শুধু অনুমানভিত্তিক কথা বলে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১১৬)
৫. অপছন্দ হলেই বিরোধিতা নয় : সম্পর্কের ক্ষেত্রে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও জরুরি। তাই কোনো কিছু অপছন্দ হলে তার বিরোধিতা করা কিংবা কেউ কষ্ট দিলেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং কখনো কখনো ধৈর্য, সহনশীলতা ও ক্ষমা সম্পর্কের ধরন পাল্টে দেয় এবং সুফল বয়ে আনে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)
৬. সুধারণা রাখুন, অন্ধবিশ্বাস নয় : ইসলাম মানুষের প্রতি সুধারণা রাখতে বলে এবং অহেতুক মন্দ ধারণা পোষণ করতে নিষেধ করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা অধিক পরিমাণ ধারণা পোষণ থেকে দূরে থাকো। কেননা ধারণা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১২)
তবে সুধারণার কারণে মুমিন কারো প্রতি অন্ধবিশ্বাস পোষণ করবে না; বিশেষত কারো থেকে মন্দ প্রবণতা প্রকাশের পর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুমিন একই গর্তে দুইবার দংশিত হয় না। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৩৩)
৭. সম্পর্ক অনিবার্য নয় : আল্লাহ যে সম্পর্ক রক্ষা করা আবশ্যক করেননি, এমন কোনো সম্পর্ক অনিবার্য নয়। তাই যখন কোনো সঙ্গী থেকে মন্দ কথা, কাজ ও প্রবণতা প্রকাশ পাবে, তখন তাকে পরিহার করতে বিলম্ব করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ তার বন্ধুর আদর্শে পরিচালিত হয়, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন ভেবে দেখে কাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করছে।
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৩৩)
৮. সম্পর্কে মধ্যপন্থা অবলম্বন : সম্পর্ক ও ব্যক্তিত্বের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সবকিছুতে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। সম্পর্ক, সম্মান, আবেগ, প্রত্যাশা, হতাশা, এমনকি বিরোধিতার ক্ষেত্রেও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যেন প্রয়োজনে সম্পর্কের ডানে বা বাঁয়ে মোড় নেওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি চলাফেরায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার কণ্ঠস্বর নিচু করো। নিশ্চয়ই সুরের মধ্যে গাধার সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর।’
(সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৯)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।







