বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অসংখ্য নারী চেহারা প্রকাশ না করে শুধু কণ্ঠ ব্যবহার করে, কিংবা হাত দেখিয়ে বিভিন্ন বিষয় উপস্থাপন করছেন। কেউ শিক্ষা দিচ্ছেন, কেউ রান্না শেখাচ্ছেন, কেউ দ্বীনি আলোচনা করছেন, আবার কেউ এসবের মাধ্যমে অর্থও উপার্জন করছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে— নারী যদি চেহারা প্রকাশ না করেন, শুধু কণ্ঠে কথা বলেন কিংবা হাত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করেন, তবে তা কি শরীয়তসম্মত? এবং এভাবে অর্জিত অর্থ কি হালাল?
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী-পত্নীরা! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় কর, তবে পরপুরুষের সঙ্গে কোমল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলো না; তাহলে যার অন্তরে রোগ আছে, সে লোভে পড়বে। বরং তোমরা সংযত ও শালীন কথা বলো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩২)
এ আয়াত থেকে ফোকাহায়ে কেরাম বলেন, নারীর কথা বলা মূলত নিষিদ্ধ নয়; তবে এমনভাবে কথা বলা নিষিদ্ধ, যা ফিতনার কারণ হতে পারে। হানাফি ফিকহের গ্রহণযোগ্য মত হলো— নারীর কণ্ঠ নিজে সতর নয়। এজন্য নারী-সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মাসআলা জিজ্ঞাসা করতেন এবং অনেক পুরুষ সাহাবিরাও তাঁদের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তবে ফিতনার আশঙ্কার কারণে ফোকাহয়ে কেরাম এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন।
শরীয়ত প্রয়োজনে নারীর কথা বলাকে বৈধ করেছে। যেমন— মাসআলা জিজ্ঞাসা করা, চিকিৎসা, ব্যবসায়িক লেনদেন, সাক্ষ্য প্রদান এবং অন্যান্য জরুরি প্রয়োজন। কিন্তু নিয়মিত জনসম্মুখে বক্তব্য প্রদান, বিনোদনমূলক উপস্থাপনা বা অনুসারী বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কণ্ঠ প্রচার—এসব ক্ষেত্রে ফিতনার সম্ভাবনা থাকাটা স্বাভাবিক। তাই তা পরিহারযোগ্য। আর শুধু চেহারা গোপন রাখলেই শরীয়তের পর্দার উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। যদি ভিডিও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যাতে নারী নিজেই দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যান এবং এতে ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, তবে তা শরীয়তের পর্দার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলামী শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি হলো— ‘সাদ্দুজ জারায়ে’ অর্থাৎ, যে বৈধ কাজ হারামের দিকে পৌঁছে দেওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে, প্রয়োজনে সেই পথও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইমাম কারাফী (রহ.) বলেন, ‘হারামের দিকে পৌঁছে দেয় এমন বৈধ মাধ্যমকেও শরীয়ত অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করেছে।’ (আল-ফুরূক, ২/৩৩)
বর্তমানে বেশিরভাগ ইউটিউব চ্যানেলের আয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আসে। বাস্তবে এসব বিজ্ঞাপনে প্রায়ই থাকে— গান-বাজনা, অশালীন দৃশ্য, সুদভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রচার, হারাম পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং শরীয়তবিরোধী বিভিন্ন বিষয়। যেহেতু সাধারণ ব্যবহারকারী এসব বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাই বহু সমসাময়িক ফকিহ এ ধরনের আয়কে সন্দেহযুক্ত অথবা অনেক ক্ষেত্রে নাজায়েজ বলে মত দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৫০)
ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘প্রাণীর ছবি অঙ্কন হারাম হওয়ার বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য রয়েছে। তা কাপড়ে, দেয়ালে, মুদ্রায় বা অন্য যেকোনো স্থানে হোক; কারণ এতে আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণ করা হয়।’ (শারহু সহিহ মুসলিম, ১৪/৮১)
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ডিজিটাল ফটোগ্রাফি ও ভিডিওকে ঐতিহ্যগত চিত্রাঙ্কনের একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না—এ বিষয়ে সমসাময়িক ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাই এ অংশে ইজমা তথা ঐকমত্য দাবি করা যাচ্ছেনা। কেননা ইসলাম বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না। প্রয়োজন দেখা দিলে নারী— প্রয়োজনীয় কথা বলতে পারবেন, দ্বীনি মাসআলা জিজ্ঞাসা করতে পারবেন এবং শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদান করতে পারবেন। এর প্রমাণ সাহাবিয়াদের জীবন ও বহু সহিহ হাদিসে বিদ্যমান। তবে এসব হবে প্রয়োজনসীমার মধ্যে, শালীনতা বজায় রেখে এবং ফিতনার আশঙ্কা থেকে মুক্ত অবস্থায়। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪০৬)
তাই ইসলামের দৃষ্টিতে একজন নারীর জন্য নিজেকে এমন সব উপায় থেকেও দূরে রাখা, যা ধীরে ধীরে ফিতনা, অশ্লীলতা বা গুনাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে।




