• ই-পেপার

আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে তুরস্কে যাচ্ছেন বাংলাদেশের চার আলেম

বন্যা ও দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
বন্যা ও দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়
সংগৃহীত ছবি

বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস কিংবা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনে কঠিন পরীক্ষা হয়ে আসে। এসব দুর্যোগে অসংখ্য মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও জীবিকার উৎস হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। এমন সময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্বই নয়, বরং ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। একজন মুমিন নিজের স্বার্থের গণ্ডি পেরিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসবেন—এটাই ইসলামের শিক্ষা। অসহায় মানুষের চোখের অশ্রু মুছে দেওয়া, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, আশ্রয়হীনকে আশ্রয় দেওয়া এবং বিপদে সাহস জোগানো—এসব কাজ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।

বিপদগ্রস্ত মানুষের সহযোগিতা করা তাকওয়ার পরিচয় : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ২)
বন্যা ও দুর্যোগের সময় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, পোশাক কিংবা অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা অত্যন্ত জরুরি।

মানুষের উপকার করা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি, হাদিস : ৫৭৮৭)
অতএব, দুর্যোগে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য এগিয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় একটি কাজ।

মুমিনরা পরস্পরের ভাই : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)
আর ভ্রাতৃত্বের এই সম্পর্ক শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিপদের সময় একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই এর প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।

অন্যের কষ্ট দূর করার প্রতিদান : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
তাই বলা যায়, বন্যাদুর্গত মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কাজ করবে, আল্লাহ তার জন্য আখিরাতে মহা প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন।

দান-সদকার প্রতিদান বহুগুণ বৃদ্ধি পায় : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়; প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬১)
তাই দুর্যোগে দেওয়া একটি খাবারের প্যাকেট, একটি কম্বল বা সামান্য অর্থও আল্লাহর কাছে অমূল্য হয়ে যেতে পারে।

রহমত লাভের অন্যতম উপায় : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা পৃথিবীর মানুষের প্রতি দয়া করে, পরম দয়ালু আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯২৪)
তাই অসহায় মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

শুধু অর্থ নয়, যেকোনো সহযোগিতাই সদকা : অনেকে মনে করেন, অর্থবানরাই শুধু সহযোগিতা করতে পারেন। অথচ ইসলাম বলে, সামর্থ্য অনুযায়ী যেকোনো সহযোগিতাই সদকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক ভালো কাজই সদকা।’(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০০৫)
অতএব, খাদ্য বিতরণ, উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণ, অসুস্থদের সেবা, নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা, এমনকি সান্ত্বনার একটি বাক্যও আল্লাহর কাছে সওয়াবের কাজ। একজন সত্যিকারের মুমিন কখনো অসহায় মানুষের কষ্ট দেখে নির্লিপ্ত থাকতে পারেন না। তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, কারণ তিনি জানেন—মানুষের সেবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথ।

আসুন, আমরা সবাই বন্যা ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াই। খাদ্য, বস্ত্র, অর্থ, শ্রম, সময় কিংবা আন্তরিক দোয়া—যে যেভাবে পারি সহযোগিতা করি। মনে রাখতে হবে, আজ আমরা অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ালে, কাল আমাদের বিপদের সময় আল্লাহ তাআলা তাঁর অশেষ রহমত ও সাহায্য দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অসহায় মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

এক পেয়ালা দুধে অবিশ্বাস্য বরকত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
এক পেয়ালা দুধে অবিশ্বাস্য বরকত
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোনো রব নেই, আমি ক্ষুধার তাড়নায় মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি করতাম এবং পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। এভাবে একদিন আমি মানুষের চলার রাস্তায় বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর মহানবী (সা.) এসে আমাকে দেখে মুচকি হাসলেন। তিনি আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, আমার পেছনে পেছনে আসো। আমি তাঁর পিছু পিছু তাঁর সঙ্গে গেলাম। তিনি তাঁর ঘরে প্রবেশ করার পরে আমার প্রবেশের অনুমতি (তাঁর স্ত্রীদের কাছে) চাইলেন। তারা আমাকে অনুমতি দিলে আমি প্রবেশ করলাম।

মহানবী (সা.) ঘরে ঢুকে এক পেয়ালা দুধ দেখতে পেলেন। জিজ্ঞাস করলেন, এ দুধ আসলো কোথা থেকে? জবাবে তারা বললেন, অমুক আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছে। তিনি বললেন, আবু হির, (হে আবু হুরাইরা) আমি বললাম, লাব্বাইক (আমি উপস্থিত) ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, সুফফাবাসীদের কাছে গিয়ে তাদের ডেকে নিয়ে আসো। আর আহলে সুফফারা ইসলামের মেহমান ছিলেন, তাঁদের কোনো থাকার মতো ঘর-বাড়ি ছিল না। তাদের কোনো পরিবার-পরিজন ও ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না।

মহানবী (সা.)-এর কাছে কোনো সাদাকাহের জিনিস এলে, তিনি তা সুফফাবাসীদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। সাদাকাহ থেকে মহানবী (সা.) কখনোই কোনো কিছু নিতেন না। আবার কোনো কিছু হাদিয়া আসলেও তিনি সেটা তাঁদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। হাদিয়ার জিনিস থেকে মহানবী (সা.) নিজে গ্রহণ করতেন এবং অন্যকেও দিতেন। তো, তিনি আমাকে সুফফাবাসীকে ডাকার জন্য বললেন। তখন আমার মনে সংকোচ হলো।

আমি (মনে মনে) বললাম, এই অল্প দুধ সবার জন্য কি যথেষ্ট হবে? তা ছাড়া এই দুধের অধিক হকদার হলাম আমি। এই দুধ পান করে একটু শক্তিশালী হবো। আহলে সুফফারা উপস্থিত হওয়ার পর, তাদের পান করার জন্য মহানবী (সা.) আমাকে আদেশ করবেন। তারপর তাদের পান করানোর পরে কতটুকুই-বা বাকি থাকবে! তা ছাড়া আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথা মানা ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই।

তাই আমি তাদের কাছে এসে তাদের ডাকতে লাগলাম। তারা এসে অনুমতি চাইল, অনুমতি পেয়ে সবাই নিজ-নিজ জায়গায় বসে পড়লেন। এবার মহানবী (সা.) বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, পাত্রটি নিয়ে তাদের একেকজনকে দাও। ফলে আমি এক-একজনকে দিতে লাগলাম। প্রথমজন তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি ফেরত দিলেন। অতঃপর আমি অন্য একজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি দিলেন। এরপরে আরেকজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তিসহকারে পান করে আমাকে পাত্রটি দিলেন। এভাবে সবার পালা শেষ করে আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে উপস্থিত হলাম। সবাই তৃপ্তিসহকারে পান করতে পেরেছে। এরপরে মহানবী (সা.) পাত্রটি নিয়ে তাতে নিজ হাত রেখে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, আবু হির, আমি বললাম, লাব্বাইক ইয়া রাসুলাল্লাহ। তিনি বললেন, এখন তো তুমি আর আমি বাকি। আমি বললাম, জি, ইয়া রাসুলাল্লাহ।

মহানবী (সা.) আমাকে বললেন, তুমি এবার বসে পান করতে থাকো। আমি বসে-বসে পান করতে লাগলাম। তিনি আবার বললেন, পান করো। ফলে আমি আবার পান করতে থাকলাম। তিনি আমাকে বারবার পান করার কথা বললে আমি বললাম, আর পারছি না। সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, পান করার মতো আমার পেটে আর কোনো জায়গা ছিল না। অবশেষে তিনি বললেন, পাত্রটি আমাকে দেখাও। আমি পাত্রটি মহানবী (সা.)-এর কাছে দিলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করে 'বিসমিল্লাহ' বলে বাকি দুধ পান করে নিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৫২, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১০৬৭৯)

হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকার দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো আল্লাহর দেওয়া হিদায়াত। সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা দুনিয়ার সব অর্জন একদিকে, আর আল্লাহর সঠিক পথের দিশা অন্যদিকে। কেননা হিদায়াতই হলো মুমিনের প্রকৃত সফলতা। তবে হিদায়াত লাভ করাই শেষ কথা নয়; বরং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই হিদায়াতের ওপর অবিচল থাকা আরো বড় চ্যালেঞ্জ।

কারণ মানুষের অন্তর সর্বদা পরিবর্তনশীল। তাই মুমিনের সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত— কোথাও যেন গুনাহ, প্রবৃত্তির অনুসরণ বা শয়তানের ধোঁকায় পড়ে সে হিদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে যায়। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের এমন এক মহামূল্যবান দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর কাছে হিদায়াতের ওপর দৃঢ়তা, অন্তরের স্থিরতা এবং তাঁর বিশেষ রহমত লাভ হয়। দোয়াটি হলো-

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ

উচ্চারণ : ‘রব্বানা লা তুজিগ ক্বুলুবানা বাঅ’দা ইজ হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুংকা রাহমাহ। ইন্নাকা আংতাল ওয়াহহাব।’

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরকে বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই মহাদাতা।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৮)

মানবীয় ‘ফিতরাত’ আল্লাহর অস্তিত্বের সহজাত প্রমাণ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মানবীয় ‘ফিতরাত’ আল্লাহর অস্তিত্বের সহজাত প্রমাণ
সংগৃহীত ছবি

ফিতরাত অর্থ হলো প্রথমবার সৃষ্টি করা, উদ্ভাবন করা এবং মৌলিক সৃষ্টির অবস্থা। ফিতরাত মানে মানুষের সৃষ্টিগত সহজাত প্রবৃত্তি।ফিতরাত বলতে মানুষের সেই সহজাত স্বভাবকে বোঝায়, যার ওপর সে জন্মগ্রহণ করে। এতে মানুষের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় ধরনের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত। এগুলো এমন বৈশিষ্ট্য, যা মানবতার মৌলিক দাবি। এগুলোর বিরোধিতা করা বা এগুলো থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে মানবিক স্বভাব থেকে বিচ্যুত হওয়া—কখনো সম্পূর্ণভাবে, আবার কখনো আংশিকভাবে।

ইসলাম ও মানবীয় ফিতরাত
আসমানি সব ধর্মই মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সব নবী-রাসুলের শিক্ষা মানবীয় ফিতরাতকে সমর্থন করেছে, তাকে শক্তিশালী করেছে এবং সেই স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণেই ইসলামকে ‘ফিতরাতের ধর্ম’ বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে এ দ্বিনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন। এটি আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বিন।’ (সুরা : আর-রুম, আয়াত : ৩০)

আল্লাহর অস্তিত্বের একটি সহজাত প্রমাণ
ফিতরাত আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম বড় প্রমাণ। মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য, নিখুঁত পরিকল্পনা এবং বিস্ময়কর সামঞ্জস্য যেমন একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়, তেমনি মানুষের অন্তরের গভীরে নিহিত একটি সহজাত অনুভূতিও আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ বহন করে।

এই অনুভূতি আল্লাহ মানুষের অন্তরে জন্মগতভাবে স্থাপন করেছেন। এটিই মানুষের ধর্মীয় প্রবৃত্তি, যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে। তবে কখনো কখনো বিভিন্ন কারণে এই সহজাত অনুভূতি নিস্তেজ হয়ে যায়। কিন্তু যখন মানুষ বিপদে পড়ে, দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হয় কিংবা চারদিক থেকে অসহায় হয়ে যায়, তখন তার অন্তর্নিহিত ফিতরাত আবার জেগে ওঠে এবং সে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। এ বিষয়েই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন মানুষ কোনো কষ্টে পতিত হয়, তখন সে শোয়া, বসা কিংবা দাঁড়ানো—সব অবস্থায় আমাকে ডাকে। অতঃপর যখন আমি তার কষ্ট দূর করে দিই, তখন সে এমনভাবে চলে যায় যেন সে কখনো তার কষ্ট দূর করার জন্য আমাকে ডাকেইনি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১২)

বাস্তবতা হলো মানুষ যতই আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করুক না কেন, তার অন্তরের গভীরে লুকিয়ে থাকা ফিতরাত কখনো সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয় না।

অনেক নাস্তিক বা আল্লাহকে অস্বীকারকারী মানুষকেও দেখা যায়, যখন জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন সে অজান্তেই আকাশের দিকে তাকায়, দুই হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং সর্বশক্তিমান এক সত্তার আশ্রয় কামনা করে। এটাই মানবীয় ফিতরাতের জাগরণ এবং আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম শক্তিশালী সাক্ষ্য।

কোরআনে ফিতরাত সম্পর্কিত আয়াতসমূহ ও তাদের তাৎপর্য

কোরআনে এমন কিছু আয়াত আছে, যেগুলো সরাসরি মানবীয় ফিতরাতের কথা উল্লেখ করেছে। যেমন সুরা রুমের ৩০ নম্বর আয়াত। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইসলাম মানুষের প্রকৃত স্বভাবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষকে এমন একটি স্বাভাবিক প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করা হয়েছে, যা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ইবাদত এবং সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। যদিও ‘ফিতরাত’ শব্দ কোরআনে মাত্র একবার এসেছে, তবু বহু আয়াতে তার অর্থ ও তাৎপর্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

১. আল্লাহ মানুষের কাছ থেকে তাঁর রব হওয়ার সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘আর স্মরণ করুন, যখন আপনার প্রতিপালক আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করে এনে তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের প্রতিপালক নই?’ তারা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিলাম।’ যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পারো—আমরা তো এ বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৭২)

অর্থাৎ প্রত্যেক মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে এমন এক অন্তর্নিহিত স্বীকৃতি নিয়ে যে তার একজন স্রষ্টা আছেন।

২. আল্লাহর অঙ্গীকার (মিসাক) : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তোমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো এবং সেই অঙ্গীকারও স্মরণ করো, যা তিনি তোমাদের কাছ থেকে নিয়েছেন, যখন তোমরা বলেছিলে—‘আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম।’ আর আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের সব কথা জানেন।” (সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৭)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষকে মূলত আল্লাহর আনুগত্য করার স্বাভাবিক প্রবণতা দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছে।

৩. সুরা ইয়াসিনে বর্ণিত অঙ্গীকার : আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করিনি যে তোমরা শয়তানের ইবাদত করবে না? নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৬০)

এখানে ‘অঙ্গীকার’ বলতে সেই প্রাচীন অঙ্গীকারকেই বোঝানো হয়েছে, যা আদম (আ.)-এর পৃষ্ঠদেশে থাকা মানবজাতির কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল।

৪. যারা আল্লাহর অঙ্গীকার রক্ষা করে : আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।’ (সুরা : আর-রাদ, আয়াত : ২০)

কাফফাল (রহ.) বলেন, ‘এ অঙ্গীকার বলতে মানুষের বিবেক ও বুদ্ধির মধ্যে স্থাপিত তাওহিদ ও নবুয়তের প্রমাণকে বোঝানো হয়েছে।’

৫. আল্লাহ এরই মধ্যে অঙ্গীকার নিয়েছেন : আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছ না, অথচ রাসুল তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনার আহবান জানাচ্ছেন? আর যদি তোমরা সত্যিই মুমিন হও, তবে আল্লাহ তো এরই মধ্যে তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন।’ (সুরা : আল-হাদিস, আয়াত : ৮)

কোরআনুল কারিমে মানবীয় ফিতরাতকে একটি শক্তিশালী দলিল ও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর একত্ব এবং তাঁর প্রতি আনুগত্যের স্বাভাবিক অনুভূতি সৃষ্টি করে।