• ই-পেপার

হাদিসের বাণী

আল্লাহ কাউকে ভালোবাসলে যেভাবে তা প্রকাশ করেন

ভুল হলে তাওবায় মেলে অসীম ক্ষমা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ভুল হলে তাওবায় মেলে অসীম ক্ষমা
সংগৃহীত ছবি

মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে গুনাহ বা ভুলের সম্মুখীন হননি। তবে ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই যে এটি মানুষকে পাপের কারণে হতাশ হতে শেখায় না; বরং তাওবার মাধ্যমে মহান রবের সান্নিধ্যে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য তাওবার দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রেখেছেন এবং আন্তরিক তাওবাকারীদের ক্ষমা করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছেন।


এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) এক অনন্য সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সেই মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা কোনো পাপই না করতে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতিকে নিয়ে আসতেন, যারা পাপ করত; অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করত, আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭৪৯; জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৫২৬)

এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ তাআলা পাপকে ভালোবাসেন না; কিন্তু পাপী বান্দার আন্তরিক অনুতাপ, বিনম্র হৃদয়ে করা তাওবা এবং ক্ষমা প্রার্থনাকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ভুলের ওপর অটল থাকা কিংবা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘আপনি বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : আয-ঝুমার, আয়াত : ৫৩)
এই আয়াত মানবজাতির জন্য আশা, সাহস ও আশ্বাসের এক চিরন্তন ঘোষণা। গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন, আন্তরিক তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা তা ক্ষমা করতে সক্ষম। তাই কোনো পাপী বান্দার জন্য নিরাশার কোনো অবকাশ নেই।

অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী; আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা অধিক তাওবা করে। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৪৯৯)

তবে আলোচ্য হাদিসের অর্থ কখনোই এই নয় যে মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করবে এবং পরে তাওবা করবে।

এমন মানসিকতা আল্লাহর প্রতি ধৃষ্টতা ও আত্মপ্রবঞ্চনার নামান্তর। প্রকৃত তাওবা হলো, গুনাহ থেকে অবিলম্বে বিরত হওয়া, কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া, ভবিষ্যতে সেই গুনাহে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা এবং মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকলে তা যথাযথভাবে আদায় বা ক্ষমা গ্রহণ করা।
মহান আল্লাহ তাআলা তাওবাকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ২২২)

এটি একজন মুমিনের জন্য পরম সৌভাগ্যের সংবাদ। কারণ যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে তাওবা করে, সে শুধু ক্ষমাই লাভ করে না; বরং আল্লাহর ভালোবাসারও অধিকারী হয়ে যায়।

আজকের সমাজে অনেক মানুষ অতীতের গুনাহের কারণে হতাশ হয়ে পড়েন। কেউ মনে করেন, ‘আমার মতো পাপীকে আল্লাহ আর ক্ষমা করবেন না।’ অথচ এটি শয়তানের অন্যতম বড় প্রতারণা। শয়তান চায় মানুষ গুনাহের পর তাওবা না করে হতাশার অতল গহ্বরে ডুবে যাক। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। যতক্ষণ প্রাণ কণ্ঠাগত না হয় এবং কিয়ামতের বড় আলামত—পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদিত হওয়া—প্রকাশ না পায়, ততক্ষণ তাওবার দরজা উন্মুক্ত থাকে।

অতএব আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের গুনাহের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে বিনম্রচিত্তে ক্ষমা প্রার্থনা করা, বেশি পরিমাণে ইস্তিগফার পাঠ করা, নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে সমৃদ্ধ করা এবং সর্বদা আত্মশুদ্ধির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

জানাজায় বহু মানুষের সমাগম নিয়ে ইসলামী পর্যালোচনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
জানাজায় বহু মানুষের সমাগম নিয়ে ইসলামী পর্যালোচনা
সংগৃহীত ছবি

মৃত্যু মানুষের জীবনের অবধারিত পরিণতি। পৃথিবীর সব পরিচয়, ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব একদিন মৃত্যুর কাছে থেমে যায়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের কর্ম, চরিত্র, ঈমান, ইলম ও মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদান মৃত্যুর পরও মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে পারে। তাই ইতিহাসে আমরা দেখি, কোনো কোনো নেককার আলেম, দাঈ, মুজাহিদ বা সমাজসেবকের ইন্তেকালে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে, আবার অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি নীরব পরিবেশে দাফন হয়েছেন। প্রশ্ন হলো—জানাজায় মানুষের সংখ্যা কি ইসলামে বিশেষ কোনো মর্যাদার প্রমাণ? অধিক লোকের উপস্থিতি কি মৃত ব্যক্তির কল্যাণের নিশ্চয়তা বহন করে? 

ইসলাম বাহ্যিক সংখ্যা বা লোকদেখানো সম্মানের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অধিক গুরুত্ব দেয়। তবে একই সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, নেককার ব্যক্তির জন্য মুমিনদের আন্তরিক দোয়া, সৎ সাক্ষ্য এবং জানাজার সালাতে অধিক সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে যে, ইসলামে মানুষের মর্যাদার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া। জানাজায় মানুষের সংখ্যা, সামাজিক অবস্থান বা বাহ্যিক জনপ্রিয়তা নয়; বরং আল্লাহভীতি ও নেক আমলই প্রকৃত মর্যাদার মানদণ্ড।

জানাজায় বহু মানুষের সমাগম মৃত ব্যক্তির জন্য কল্যাণের একটি কারণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলিম ব্যক্তির জানাজায় এমন চল্লিশজন মুসলিম অংশগ্রহণ করবে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে না, এবং তারা তার জন্য সুপারিশ (দোয়া) করবে, আল্লাহ তাদের সুপারিশ কবুল করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৮)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, জানাজায় অধিকসংখ্যক ঈমানদার মানুষের উপস্থিতি মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের একটি কারণ হতে পারে। তবে এর মূল বিষয় হলো—তাঁদের আন্তরিক দোয়া ও ঈমান, শুধু সংখ্যা নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্য হাদিসে আরও বলেন, ‘যে মুসলিমের জানাজায় একশত মুসলিম অংশগ্রহণ করে এবং সবাই তার জন্য দোয়া করে, তাদের দোয়া কবুল করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৯৪৭)
এখানে সংখ্যার উদ্দেশ্য গৌরব প্রদর্শন নয়; বরং বেশি সংখ্যক মুমিনের আন্তরিক দোয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা।

মুমিনদের সাক্ষ্য একটি সুসংবাদ
একবার একটি জানাজা অতিক্রম করলে সাহাবিগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়েছে।’ পরে আরেক ব্যক্তির জানাজা গেলে সাহাবিরা তার নিন্দা করেন। তখন তিনি বলেন, ‘তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত হয়েছে।’ এরপর তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘তোমরা পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষী।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ১৩৬৭)
এই হাদিসের অর্থ এই নয় যে, মানুষের মতামতই চূড়ান্ত ফয়সালা। বরং নেককার ব্যক্তির ব্যাপারে সৎ মুমিনদের স্বতঃস্ফূর্ত উত্তম সাক্ষ্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি শুভ লক্ষণ হতে পারে।

আল্লাহ যাঁকে ভালোবাসেন, মানুষও তাঁকে ভালোবাসে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন জিবরাইল (আ.)-কে বলেন, 'আমি অমুককে ভালোবাসি, তুমিও তাকে ভালোবাস।' এরপর আকাশবাসীদের মধ্যে তাঁর ভালোবাসার ঘোষণা দেওয়া হয়। অতঃপর পৃথিবীতেও তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৩২০৯)

এ কারণেই অনেক নেককার আলেম ও বুযুর্গের মৃত্যুতে অসংখ্য মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন। ইতিহাসে বহু মনীষীর জানাজায় অভূতপূর্ব মানুষের সমাগম ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল এবং ইবনে তাইমিয়া (রহ.)। 

জানাজায় বহু মানুষের উপস্থিতি কামনা করার চেয়ে এমন জীবন গড়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মানুষ মৃত্যুর পর আন্তরিকভাবে আমাদের জন্য দোয়া করে। একজন মুসলমানের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইখলাসের সঙ্গে আমল করা।
২. কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করে জীবন-যাপন করা।
৩. মানুষের উপকার করা এবং উত্তম চরিত্র গঠন করা।
৪. জীবদ্দশায় এমন আচরণ করা, যাতে মৃত্যুর পর মানুষ কল্যাণের সাক্ষ্য দেয় ও দোয়া করে।
৫. অন্যের জানাজায় অংশগ্রহণ করে তার জন্য আন্তরিকভাবে মাগফিরাতের দোয়া করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এমন জীবন দান করুন, যা মাধ্যমে মৃত্যুর পরও মুমিনদের আন্তরিক দোয়ার সৌভাগ্য অর্জন করা। আমিন।
 

মানুষের যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার পরীক্ষিত আমল

মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার পরীক্ষিত আমল
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে বন্ধু যেমন আছে, তেমনি শত্রুও আছে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে—কিছু মানুষ হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা কিংবা স্বার্থের কারণে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের প্রথম ও প্রধান আশ্রয় হলো মহান আল্লাহ। কারণ প্রকৃত রক্ষাকর্তা, সাহায্যকারী ও অভিভাবক একমাত্র তিনিই। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের এমন একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা বিপদ-আপদ, শত্রুর অনিষ্ট, জুলুম ও ষড়যন্ত্র থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভে সহায়ক। দোয়াটি হলো-

اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফী নুহুরিহিম, ওয়া নাঊজুবিকা মিন শুরুরিহিম।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের মুখোমুখি করছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৭)

আমলের নিয়ম : যেকোনো ভয় বা শত্রুর চক্রান্তের আশঙ্কায় এই দোয়াটি অন্তত তিনবার করে নিয়মিত পাঠ করলে শত্রুর যেকোনো অনিষ্ঠ থেকে আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে হেফাজত করবেন। ইনশাআল্লাহ। 

পরকীয়া প্রতিরোধে ইসলামের ৮ নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
পরকীয়া প্রতিরোধে ইসলামের ৮ নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন হলো পরিবার। একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল পরিবার, আর সেই পরিবারের ভিত্তি হলো বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমান সময়ে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে পরকীয়ার মতো জঘন্য অনৈতিক সম্পর্ক সমাজে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শান্তি ও পারস্পরিক বিশ্বাস। 

পরকীয়া কী?
পরকীয়া বলতে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক নিজের বৈধ জীবনসঙ্গী ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে প্রেম, আবেগ, অন্তরঙ্গতা বা অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বোঝায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত। এবং মারাত্মক অপরাধ।

১. ব্যভিচারের যাবতীয় উপকরণ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ
ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সকল পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
এই আয়াতে অবৈধ প্রেম, গোপন সম্পর্ক, অশালীন বার্তা আদান-প্রদান, অনৈতিক মেলামেশা কিংবা এমন যেকোনো আচরণ যা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়—সবই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ
পরকীয়ার সূচনা প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি থেকে হয়। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

এরপর আল্লাহ তাআলা নারীদের প্রতিও একই নির্দেশ প্রদান করেছেন। ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
দৃষ্টি সংযম মানুষের অন্তরকে পবিত্র রাখে এবং অবৈধ আকর্ষণ থেকে রক্ষা করে।

৩. একাকী নির্জনে অবস্থান নিষিদ্ধ
ইসলাম পরপুরুষ ও পরনারীর নির্জনে একত্রে অবস্থান করতে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২১৬৫)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অনেক বড় অপরাধের সূচনা হয় ছোট ছোট অসতর্কতা থেকে।

৪. লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ
পরকীয়া প্রতিরোধে লজ্জাশীলতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৯)
লজ্জাবোধ মানুষকে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রাখে।

৫. বিবাহকে সহজ করার নির্দেশ
অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধে ইসলাম বৈধ বিবাহকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করে দাও।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)
বিবাহ মানুষের চরিত্রকে সংযত রাখে এবং অবৈধ সম্পর্কের প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

৬. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার আদায়
পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ বজায় থাকলে পরকীয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
এই আয়াত দাম্পত্যজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য—প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।

৭. অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা
বর্তমান যুগে অশ্লীল সিনেমা, অনৈতিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অশালীন বিনোদন পরকীয়ার অন্যতম কারণ। তাই এসব থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

৮. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জন
যে ব্যক্তি সর্বদা মনে রাখে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, সে সহজে গুনাহে লিপ্ত হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২)
এভাবে তাকওয়া মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে রাখে।

পরকীয়ার ভয়াবহ পরিণতি
পরকীয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। এর ফলে—
১. পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।
২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।
৩. সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
৪. সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়।
৫. আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আখিরাতের কঠিন শাস্তির কারণ হয়।

অতএব, পরকীয়া প্রতিরোধে শুধু আইন নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, আত্মসংযম, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ইসলামী নৈতিকতার চর্চা অপরিহার্য। পরকীয়া একটি পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসলাম মানবজাতির কল্যাণে এমন একটি জীবনব্যবস্থা প্রদান করেছে, যেখানে দৃষ্টি সংযম, লজ্জাশীলতা, বৈধ বিবাহ, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, আল্লাহভীতি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পরকীয়ার সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনো সাময়িক আবেগ বা পার্থিব মোহের কাছে নিজের ঈমান, পরিবার ও সম্মানকে বিসর্জন দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র জীবনযাপন এবং হারাম সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।