• ই-পেপার

জানাজায় বহু মানুষের সমাগম নিয়ে ইসলামী পর্যালোচনা

হাদিসের বাণী

আল্লাহ কাউকে ভালোবাসলে যেভাবে তা প্রকাশ করেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আল্লাহ কাউকে ভালোবাসলে যেভাবে তা প্রকাশ করেন
সংগৃহীত ছবি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে শত্রুতা পোষণ করবে, আমি তার সঙ্গে যুদ্ধ করার ঘোষণা করলাম। আর বান্দা আমার যে সমস্ত কাজের মাধ্যমে নিকটবর্তী হয়, সেগুলো হলো—আমি তার ওপর যা কিছু ফরজ করেছি তা (ফরজ ইবাদাতসমূহ সে পালন করে) আর আমার বান্দা নফল ইবাদাতের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, এমনকি তখন আমি তাঁকে ভালোবাসতে শুরু করি। তারপর যখন আমি তাকে ভালোবাসতে থাকি, আমি তার ওই কান হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে শ্রবণ করে ; আমি তার ওই চোখ হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে দেখে; আমি তার ওই হাত হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে স্পর্শ করে; আমি তার ওই পা হয়ে যাই, যার মাধ্যমে সে হাঁটা-চলা করে। তখন যদি সে আমার কাছে কোনো কিছু চায়, আমি তাকে তা প্রদান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে আশ্রয় দিই। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৫০২)

শিক্ষা ও বিধান
১. আল্লাহর অলিদের সঙ্গে শত্রুতা করা ভয়াবহ অপরাধ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নেক বান্দা, দ্বীনদার ও মুত্তাকিদের কষ্ট দেয় বা শত্রুতা করে, আল্লাহ নিজেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন।

২. আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো ফরজ ইবাদতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করা। তাই ফরজ ইবাদতের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া জরুরি।

৩. ফরজ আদায়ের পর বান্দা যখন নফল সালাত, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সদকা ইত্যাদিতে মনোযোগী হয়, তখন আল্লাহ তাকে বিশেষভাবে ভালোবাসতে শুরু করেন।

৪. আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তাকে হিদায়াত, তাকওয়া ও সঠিক পথে চলার তাওফিক দেন। সে হারাম থেকে দূরে থাকে এবং কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়।

৫.  আল্লাহর প্রিয় বান্দার দোয়া কবুল হয়। তাই যখন বান্দা আল্লাহর প্রিয় হয়ে যায়, তখন তার দোয়া অধিক কবুল হয়। সে কিছু চাইলে আল্লাহ দান করেন এবং বিপদে আশ্রয় চাইলে তাকে রক্ষা করেন।

৬. প্রকৃত সফলতা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দুনিয়ার সম্পদ, পদমর্যাদা বা খ্যাতি নয়; বরং আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়াই সবচেয়ে বড় সফলতা।

মানুষের যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার পরীক্ষিত আমল

মুফতি ওমর বিন নাছির
মানুষের যেকোনো অনিষ্ট থেকে বাঁচার পরীক্ষিত আমল
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে বন্ধু যেমন আছে, তেমনি শত্রুও আছে। কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে—কিছু মানুষ হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসা কিংবা স্বার্থের কারণে অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের প্রথম ও প্রধান আশ্রয় হলো মহান আল্লাহ। কারণ প্রকৃত রক্ষাকর্তা, সাহায্যকারী ও অভিভাবক একমাত্র তিনিই। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ আমাদের এমন একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা বিপদ-আপদ, শত্রুর অনিষ্ট, জুলুম ও ষড়যন্ত্র থেকে আল্লাহর আশ্রয় লাভে সহায়ক। দোয়াটি হলো-

اللَّهُمَّ إِنَّا نَجْعَلُكَ فِي نُحُورِهِمْ وَنَعُوذُ بِكَ مِنْ شُرُورِهِمْ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাজআলুকা ফী নুহুরিহিম, ওয়া নাঊজুবিকা মিন শুরুরিহিম।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমরা আপনাকে তাদের মুখোমুখি করছি এবং তাদের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৩৭)

আমলের নিয়ম : যেকোনো ভয় বা শত্রুর চক্রান্তের আশঙ্কায় এই দোয়াটি অন্তত তিনবার করে নিয়মিত পাঠ করলে শত্রুর যেকোনো অনিষ্ঠ থেকে আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে হেফাজত করবেন। ইনশাআল্লাহ। 

পরকীয়া প্রতিরোধে ইসলামের ৮ নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
পরকীয়া প্রতিরোধে ইসলামের ৮ নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানবজীবনের সবচেয়ে পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন হলো পরিবার। একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হচ্ছে একটি সুশৃঙ্খল পরিবার, আর সেই পরিবারের ভিত্তি হলো বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমান সময়ে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, অশ্লীল সংস্কৃতির বিস্তার এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফলে পরকীয়ার মতো জঘন্য অনৈতিক সম্পর্ক সমাজে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ভেঙে যাচ্ছে অসংখ্য পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শান্তি ও পারস্পরিক বিশ্বাস। 

পরকীয়া কী?
পরকীয়া বলতে বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা অবস্থায় স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক নিজের বৈধ জীবনসঙ্গী ছাড়া অন্য কারো সঙ্গে প্রেম, আবেগ, অন্তরঙ্গতা বা অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াকে বোঝায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ব্যভিচারের অন্তর্ভুক্ত। এবং মারাত্মক অপরাধ।

১. ব্যভিচারের যাবতীয় উপকরণ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ
ইসলাম শুধু ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেনি; বরং তার দিকে নিয়ে যায় এমন সকল পথও নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
এই আয়াতে অবৈধ প্রেম, গোপন সম্পর্ক, অশালীন বার্তা আদান-প্রদান, অনৈতিক মেলামেশা কিংবা এমন যেকোনো আচরণ যা ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়—সবই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

২. দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ
পরকীয়ার সূচনা প্রায়ই অনিয়ন্ত্রিত দৃষ্টি থেকে হয়। তাই ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)

এরপর আল্লাহ তাআলা নারীদের প্রতিও একই নির্দেশ প্রদান করেছেন। ‘আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের পবিত্রতা রক্ষা করে।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
দৃষ্টি সংযম মানুষের অন্তরকে পবিত্র রাখে এবং অবৈধ আকর্ষণ থেকে রক্ষা করে।

৩. একাকী নির্জনে অবস্থান নিষিদ্ধ
ইসলাম পরপুরুষ ও পরনারীর নির্জনে একত্রে অবস্থান করতে নিষেধ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান না করে। কারণ তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি, হাদিস নং : ২১৬৫)
এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অনেক বড় অপরাধের সূচনা হয় ছোট ছোট অসতর্কতা থেকে।

৪. লজ্জাশীলতা ঈমানের অংশ
পরকীয়া প্রতিরোধে লজ্জাশীলতা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৯)
লজ্জাবোধ মানুষকে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে দূরে রাখে।

৫. বিবাহকে সহজ করার নির্দেশ
অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধে ইসলাম বৈধ বিবাহকে উৎসাহিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিবাহ সম্পন্ন করে দাও।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩২)
বিবাহ মানুষের চরিত্রকে সংযত রাখে এবং অবৈধ সম্পর্কের প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

৬. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার আদায়
পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ বজায় থাকলে পরকীয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)
এই আয়াত দাম্পত্যজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য—প্রশান্তি, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।

৭. অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা
বর্তমান যুগে অশ্লীল সিনেমা, অনৈতিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং অশালীন বিনোদন পরকীয়ার অন্যতম কারণ। তাই এসব থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

৮. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জন
যে ব্যক্তি সর্বদা মনে রাখে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন, সে সহজে গুনাহে লিপ্ত হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২)
এভাবে তাকওয়া মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং হারাম সম্পর্ক থেকে দূরে রাখে।

পরকীয়ার ভয়াবহ পরিণতি
পরকীয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। এর ফলে—
১. পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যায়।
২. স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট হয়।
৩. সন্তানের মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়।
৪. সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়।
৫. আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও আখিরাতের কঠিন শাস্তির কারণ হয়।

অতএব, পরকীয়া প্রতিরোধে শুধু আইন নয়, বরং ঈমান, তাকওয়া, আত্মসংযম, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ইসলামী নৈতিকতার চর্চা অপরিহার্য। পরকীয়া একটি পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসলাম মানবজাতির কল্যাণে এমন একটি জীবনব্যবস্থা প্রদান করেছে, যেখানে দৃষ্টি সংযম, লজ্জাশীলতা, বৈধ বিবাহ, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, আল্লাহভীতি এবং নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পরকীয়ার সব পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। একজন প্রকৃত মুমিন কখনো সাময়িক আবেগ বা পার্থিব মোহের কাছে নিজের ঈমান, পরিবার ও সম্মানকে বিসর্জন দিতে পারে না। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র জীবনযাপন এবং হারাম সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জাদুবিদ্যার ইতিহাস, বাস্তবতা ও একজন মুমিনের করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
জাদুবিদ্যার ইতিহাস, বাস্তবতা ও একজন মুমিনের করণীয়
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাস যত পুরনো, জাদুবিদ্যা বা কালো জাদুর ইতিহাসও প্রায় ততটাই প্রাচীন। যুগে যুগে মানুষ অলৌকিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। কেউ জাদুবিদ্যার মাধ্যমে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, আবার কেউ এ ধরনের রহস্যময় শক্তির ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছে। প্রাচীন মিসর, বাবেল, ভারত, গ্রিস কিংবা রোম—প্রায় সব সভ্যতার ইতিহাসেই জাদুবিদ্যার নানা চর্চার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইসলাম এ বিষয়ে একদিকে যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি, অন্যদিকে জাদুবিদ্যাকে কখনোই গ্রহণযোগ্য বা বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং ইসলাম জাদুবিদ্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মুসলমানদের সতর্ক করেছে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল, দোয়া, জিকির ও কোরআনের মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভের শিক্ষা দিয়েছে।

বনি ইসরাইলের জামানায় জাদুবিদ্যা
জাদুবিদ্যা সম্পর্কে কোরআনে সবচেয়ে বিস্তারিত যে ঘটনার উল্লেখ এসেছে, তা হলো বনি ইসরাইলের একাংশের বিপথগামিতার ঘটনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করল, যা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা পাঠ করত। সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

এই আয়াত থেকে জানা যায়, বনি ইসরাইলের একদল মানুষ আল্লাহর নাজিলকৃত হিদায়াত পরিত্যাগ করে শয়তানদের প্রচারিত জাদুবিদ্যা ও বিভ্রান্তির পথ অনুসরণ করেছিল। তারা মনে করেছিল, জাদুবিদ্যার মাধ্যমে অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। অথচ এ পথ ছিল ঈমানের জন্য ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক। একই আয়াতে বাবেল নগরীতে প্রেরিত দুই ফেরেশতা হারুত ও মারুতের কথাও এসেছে। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করেছিলেন। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে স্পষ্টভাবে সতর্ক করতেন, ‘আমরা তো শুধু পরীক্ষা স্বরূপ; অতএব তুমি কুফরি কোরো না।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ১০২)
কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও বহু মানুষ জাদুবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্তির পথে পা বাড়ায়। 

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর অপচেষ্টা
জাদুবিদ্যার অন্যতম ভয়ংকর ব্যবহার সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
কিন্তু একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত সত্যও ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

অতএব, একজন মুসলমানের উচিত, এই বিশ্বাস করা যে, জাদুর কোনো শক্তি নেই। কেননা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছুই কার্যকর হতে পারে না।

সুলাইমান (আ.)-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার
ইতিহাসে কিছু লোক দাবি করেছিল যে, হজরত সুলাইমান (আ.) তাঁর রাজত্ব জাদুবিদ্যার মাধ্যমে পরিচালনা করতেন। কোরআন এ অপবাদ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)

এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, নবীদের মুজিজা কখনোই জাদুবিদ্যা নয়। মুজিজা আল্লাহপ্রদত্ত সত্যের নিদর্শন, আর জাদু শয়তানি বিভ্রান্তি।

ফেরাউনের জাদুকরদের পরাজয়
জাদুবিদ্যার আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা হলো ফেরাউনের জাদুকরদের কাহিনি। আল্লাহ বলেন, ‘তারা মানুষের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল এবং তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করল; তারা এক বিরাট জাদু প্রদর্শন করল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১১৬)
অতঃপর আল্লাহ মুসা (আ.)-কে মুজিজা দান করেন। তাঁর লাঠি আল্লাহর আদেশে বাস্তব সাপে পরিণত হয়ে জাদুকরদের সব ভেলকি গ্রাস করে নেয়। সত্য প্রত্যক্ষ করার পর জাদুকররা সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা হারুন ও মুসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৭০)

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদুর ঘটনা
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, লাবিদ ইবনুল আসাম নামক এক ইহুদি ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদু করেছিল। এ ঘটনা সহিহ বুখারি (হাদিস : ৫৭৬৫)-এ বর্ণিত হয়েছে। তবে এ জাদু তাঁর নবুয়ত বা ওহির ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। বরং কিছু সময় তিনি শারীরিকভাবে এর প্রভাব অনুভব করেছিলেন। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।

জাদুকরদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গণকের কাছে গেল এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর যা নাজিল হয়েছে, তা অস্বীকার করল।’ (মুসনাদ আহমাদ : ৯৫৩২; সুনানে আবু দাউদ : ৩৯০৪)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘ধ্বংসাত্মক সাতটি মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং জাদুবিদ্যা করা...।’ (সহিহ বুখারি, ২৭৬৬)

আধুনিক যুগে কালো জাদুর নামে প্রতারণা
আজকের যুগেও সমাজে কালো জাদুর নামে ভয়াবহ প্রতারণা চলছে। প্রেম ফেরানো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ঠিক করা, ব্যবসায় উন্নতি, শত্রু ধ্বংস, চাকরি নিশ্চিত করা কিংবা সন্তান লাভের আশ্বাস দিয়ে অসংখ্য ভণ্ড কবিরাজ, তান্ত্রিক ও গণক মানুষের ঈমান, অর্থ ও মানসিক শান্তি নিয়ে খেলছে। ইসলাম এসব প্রতারণা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। একজন মুসলমান কখনো ভাগ্যবক্তা, গণক কিংবা জাদুকরের শরণাপন্ন হবে না। বরং কোরআন-সুন্নাহসম্মত চিকিৎসা, দোয়া, বৈধ রুকইয়াহ এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতাই হবে তার একমাত্র আশ্রয়।

জাদু থেকে বাঁচতে মুমিনের করণীয়

১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা,
২. সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির করা,
৩. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা,
৪. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস নিয়মিত তিলাওয়াত করে শরীরে ফুঁ দেওয়া,
৫. কোরআনের দোয়া ও সহিহ সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ অনুসরণ করা,
৬. ভণ্ড কবিরাজ, তান্ত্রিক, জাদুকর ও গণকদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা উচিত।

শেষকথা, আজকের যুগে কালো জাদুর ভয় দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করা, কুসংস্কার ছড়ানো কিংবা মানুষের দুর্বল বিশ্বাসকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন করা একটি বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো আকিদা বিশুদ্ধ রাখা, কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বিশ্বাস না রাখা।

মনে রাখতে হবে, প্রকৃত শক্তি কোনো তাবিজ, তন্ত্র বা কালো জাদুর মধ্যে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি অটল ঈমান, আন্তরিক ইবাদত, নিয়মিত জিকির, কোরআনের তিলাওয়াত এবং দৃঢ় তাওয়াক্কুলের মধ্যে। একজন মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয় একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি চাইলে সব অনিষ্ট দূর করতে পারেন, আর তিনি ছাড়া কেউ কোনো উপকার বা অপকারের স্বাধীন ক্ষমতা রাখে না।