মানবসভ্যতার ইতিহাস যত পুরনো, জাদুবিদ্যা বা কালো জাদুর ইতিহাসও প্রায় ততটাই প্রাচীন। যুগে যুগে মানুষ অলৌকিক শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। কেউ জাদুবিদ্যার মাধ্যমে মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে, আবার কেউ এ ধরনের রহস্যময় শক্তির ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছে। প্রাচীন মিসর, বাবেল, ভারত, গ্রিস কিংবা রোম—প্রায় সব সভ্যতার ইতিহাসেই জাদুবিদ্যার নানা চর্চার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ইসলাম এ বিষয়ে একদিকে যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি, অন্যদিকে জাদুবিদ্যাকে কখনোই গ্রহণযোগ্য বা বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং ইসলাম জাদুবিদ্যার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মুসলমানদের সতর্ক করেছে এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল, দোয়া, জিকির ও কোরআনের মাধ্যমে নিরাপত্তা লাভের শিক্ষা দিয়েছে।
বনি ইসরাইলের জামানায় জাদুবিদ্যা
জাদুবিদ্যা সম্পর্কে কোরআনে সবচেয়ে বিস্তারিত যে ঘটনার উল্লেখ এসেছে, তা হলো বনি ইসরাইলের একাংশের বিপথগামিতার ঘটনা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা সেই বিষয়ের অনুসরণ করল, যা সুলাইমানের রাজত্বকালে শয়তানরা পাঠ করত। সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা শিক্ষা দিত...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
এই আয়াত থেকে জানা যায়, বনি ইসরাইলের একদল মানুষ আল্লাহর নাজিলকৃত হিদায়াত পরিত্যাগ করে শয়তানদের প্রচারিত জাদুবিদ্যা ও বিভ্রান্তির পথ অনুসরণ করেছিল। তারা মনে করেছিল, জাদুবিদ্যার মাধ্যমে অসাধারণ ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব। অথচ এ পথ ছিল ঈমানের জন্য ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক। একই আয়াতে বাবেল নগরীতে প্রেরিত দুই ফেরেশতা হারুত ও মারুতের কথাও এসেছে। আল্লাহ তাদের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করেছিলেন। তারা কাউকে কিছু শেখানোর আগে স্পষ্টভাবে সতর্ক করতেন, ‘আমরা তো শুধু পরীক্ষা স্বরূপ; অতএব তুমি কুফরি কোরো না।’ (সুরা : আল-বাকারা, আয়াত : ১০২)
কিন্তু সতর্কবার্তা সত্ত্বেও বহু মানুষ জাদুবিদ্যার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং শয়তানের প্ররোচনায় বিভ্রান্তির পথে পা বাড়ায়।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটানোর অপচেষ্টা
জাদুবিদ্যার অন্যতম ভয়ংকর ব্যবহার সম্পর্কে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তারা এমন বিষয় শিখত, যার মাধ্যমে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করা যায়।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
কিন্তু একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ আকিদাগত সত্যও ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তারা এর দ্বারা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
অতএব, একজন মুসলমানের উচিত, এই বিশ্বাস করা যে, জাদুর কোনো শক্তি নেই। কেননা আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছুই কার্যকর হতে পারে না।
সুলাইমান (আ.)-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার
ইতিহাসে কিছু লোক দাবি করেছিল যে, হজরত সুলাইমান (আ.) তাঁর রাজত্ব জাদুবিদ্যার মাধ্যমে পরিচালনা করতেন। কোরআন এ অপবাদ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘সুলাইমান কুফরি করেননি; বরং শয়তানরাই কুফরি করেছিল।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১০২)
এ আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে, নবীদের মুজিজা কখনোই জাদুবিদ্যা নয়। মুজিজা আল্লাহপ্রদত্ত সত্যের নিদর্শন, আর জাদু শয়তানি বিভ্রান্তি।
ফেরাউনের জাদুকরদের পরাজয়
জাদুবিদ্যার আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনা হলো ফেরাউনের জাদুকরদের কাহিনি। আল্লাহ বলেন, ‘তারা মানুষের চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল এবং তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করল; তারা এক বিরাট জাদু প্রদর্শন করল।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১১৬)
অতঃপর আল্লাহ মুসা (আ.)-কে মুজিজা দান করেন। তাঁর লাঠি আল্লাহর আদেশে বাস্তব সাপে পরিণত হয়ে জাদুকরদের সব ভেলকি গ্রাস করে নেয়। সত্য প্রত্যক্ষ করার পর জাদুকররা সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে ঘোষণা করলেন, ‘আমরা হারুন ও মুসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৭০)
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদুর ঘটনা
সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, লাবিদ ইবনুল আসাম নামক এক ইহুদি ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর ওপর জাদু করেছিল। এ ঘটনা সহিহ বুখারি (হাদিস : ৫৭৬৫)-এ বর্ণিত হয়েছে। তবে এ জাদু তাঁর নবুয়ত বা ওহির ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। বরং কিছু সময় তিনি শারীরিকভাবে এর প্রভাব অনুভব করেছিলেন। পরে আল্লাহ তাআলা তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেন এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
জাদুকরদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কঠোর সতর্কতা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গণকের কাছে গেল এবং তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর যা নাজিল হয়েছে, তা অস্বীকার করল।’ (মুসনাদ আহমাদ : ৯৫৩২; সুনানে আবু দাউদ : ৩৯০৪)
আরেক হাদিসে তিনি বলেন, ‘ধ্বংসাত্মক সাতটি মহাপাপ থেকে বেঁচে থাকো।’ সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা এবং জাদুবিদ্যা করা...।’ (সহিহ বুখারি, ২৭৬৬)
আধুনিক যুগে কালো জাদুর নামে প্রতারণা
আজকের যুগেও সমাজে কালো জাদুর নামে ভয়াবহ প্রতারণা চলছে। প্রেম ফেরানো, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ঠিক করা, ব্যবসায় উন্নতি, শত্রু ধ্বংস, চাকরি নিশ্চিত করা কিংবা সন্তান লাভের আশ্বাস দিয়ে অসংখ্য ভণ্ড কবিরাজ, তান্ত্রিক ও গণক মানুষের ঈমান, অর্থ ও মানসিক শান্তি নিয়ে খেলছে। ইসলাম এসব প্রতারণা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। একজন মুসলমান কখনো ভাগ্যবক্তা, গণক কিংবা জাদুকরের শরণাপন্ন হবে না। বরং কোরআন-সুন্নাহসম্মত চিকিৎসা, দোয়া, বৈধ রুকইয়াহ এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতাই হবে তার একমাত্র আশ্রয়।
জাদু থেকে বাঁচতে মুমিনের করণীয়
১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা,
২. সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির করা,
৩. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা,
৪. সুরা ইখলাস, ফালাক ও নাস নিয়মিত তিলাওয়াত করে শরীরে ফুঁ দেওয়া,
৫. কোরআনের দোয়া ও সহিহ সুন্নাহভিত্তিক রুকইয়াহ অনুসরণ করা,
৬. ভণ্ড কবিরাজ, তান্ত্রিক, জাদুকর ও গণকদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা উচিত।
শেষকথা, আজকের যুগে কালো জাদুর ভয় দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করা, কুসংস্কার ছড়ানো কিংবা মানুষের দুর্বল বিশ্বাসকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জন করা একটি বড় সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো আকিদা বিশুদ্ধ রাখা, কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুসরণ করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বিশ্বাস না রাখা।
মনে রাখতে হবে, প্রকৃত শক্তি কোনো তাবিজ, তন্ত্র বা কালো জাদুর মধ্যে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি অটল ঈমান, আন্তরিক ইবাদত, নিয়মিত জিকির, কোরআনের তিলাওয়াত এবং দৃঢ় তাওয়াক্কুলের মধ্যে। একজন মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয় একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি চাইলে সব অনিষ্ট দূর করতে পারেন, আর তিনি ছাড়া কেউ কোনো উপকার বা অপকারের স্বাধীন ক্ষমতা রাখে না।