• ই-পেপার

আজানের সময় যে আমলে দোয়া কবুল হয়

আল্লাহ ছাড়া কারো নামে কসম কাটা যায়? কসমের কাফফারা কী?

অনলাইন ডেস্ক
আল্লাহ ছাড়া কারো নামে কসম কাটা যায়? কসমের কাফফারা কী?
সংগৃহীত ছবি

প্রয়োজনে কসম বা শপথ করা জায়েজ। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে কসম করা নাজায়েজ, অর্থাৎ জায়েজ নয়। এটি শিরকের (আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা) সমতুল্য। ইবনু উমার (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত অন্য কারো নামে শপথ করল, সে শিরক করল। (মিশকাত, হাদিস : ৩৪১৯)

তবে বর্তমান সময়ে কথায় কথায় মানুষকে কসম কাটতে দেখা যায়। কেউ কেউ তো পান থেকে চুন খসলেও অবলীলায় কসম কাটেন, যা কোনোভাবেই উচিত নয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তুমি তার অনুসরণ করো না, যে বেশি বেশি কসম খায় আর যে (বারবার মিথ্যা কসম খাওয়ার কারণে মানুষের কাছে) লাঞ্ছিত।’ (সুরা আল-কলম, আয়াত : ১০)

আবার কোনো কিছুতে বিশ্বাসযোগ্যতা বোঝাতে অনেককে বাবা-মায়ের কসম কাটতেও দেখা যায়। এ ক্ষেত্রেও কঠোর নিষেধ রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) উমর ইবনু খাত্তাব (রা.)-কে কোনো বাহনের ওপর আরোহণ অবস্থায় পেলেন। ওই সময় তিনি তার বাবার নামে কসম করছিলেন। পরে রাসুল (সা.) বললেন, সাবধান! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের পিতৃপুরুষদের নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। কেউ যদি কসম করতে চায়, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে, নতুবা চুপ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৯১)

তবে প্রয়োজনে কসম কাটা জায়েজ থাকলেও কোনোভাবেই মিথ্যা কসম কাটা যাবে না। এ ক্ষেত্রে আখিরাতে ভয়ংকর শাস্তি রয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখিরাতের কোনো অংশই পাবে না এবং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না, বস্তুত তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সুরা আল-ইমরান, আয়াত : ৭৭)

অন্যদিকে মিথ্যা কসম কাটা কবীরা গুনাহের (বড় গুনাহ বা পাপ) মধ্যে অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) সূত্রে মুহাম্মদ ইবনু মুকাতিল (রহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কবীরা গুনাহগুলোর অন্যতম হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার সঙ্গে শরিক করা, পিতা-মাতার নাফরমানি করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম করা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬২১৯)

এছাড়াও মিথ্যা কসমকারীর জন্য পরকালে জাহান্নাম অবধারিত। ইমরান ইবন হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো হাকিমের আদালতে বন্দি থাকা অবস্থায় মিথ্যা কসম খায়, সে যেন তার আবাসস্থল জাহান্নামে বানিয়ে নেয়। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৩২২৭)

মনে রাখতে হবে, ভালো কিছুর জন্য আল্লাহর নামে কসম কাটার পর সেটি পূরণ করা মুমিনের কর্তব্য। কারণ, কেউ যদি আল্লাহর নামে কসম কেটে কারও কাছে কোনোকিছু দেয়ার ওয়াদা করে কিংবা নিজে কোনোকিছু না করার ওয়াদা করেও তা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে কসমের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত বা ক্ষতিপূরণ) দিতে হয়।

এ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর ভাষ্য, ভুল করে কিংবা রাগের মাথায় কোনোকিছু থেকে বিরত থাকার কসম করার পর কেউ যদি সেটি করে ফেলে তবে তাকে কসমের কাফফারা দিতে হবে। কসমের কাফফারা হলো- হয় ১০ জন মিসকিনকে খাবার খাওয়াতে হবে; নয়তো তিন দিন রোজা রাখতে হবে। অর্থাৎ, কেউ কোনো কিছুর কসম করেও তা পূরণে ব্যর্থ হলে তাকে কাফফারা হিসেবে ১০ জন মিসকিন বা দরিদ্র মানুষকে খাবার খাওয়াতে হবে। অথবা তিনি চাইলে ৩ দিন রোজে রেখেও কসমের কাফফারা বা কসম ভাঙার ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারবেন।

দেশের বন্যা পরিস্থিতি ও চলমান দুর্যোগে আমাদের করণীয়

মুফতি ওমর বিন নাছির
দেশের বন্যা পরিস্থিতি ও চলমান দুর্যোগে আমাদের করণীয়
সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রামসহ দেশের যেসব অঞ্চলে মানুষ বন্যায় পানিবন্দি, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমানি ও মানবিক দায়িত্ব। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ খাদ্য দিয়ে, কেউ বিশুদ্ধ পানি বা ওষুধ দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে, আবার কেউ আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারেন। সামান্য সাহায্যও একজন অসহায় মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। এজন্য আমাদের প্রত্যেকের যার যার সামার্থ অনুযায়ী করণীয় হলো-

১. দুর্গত মানুষের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা
বিপদে মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য, রহমত ও নিরাপত্তা কামনা করা একজন মুমিনের অন্যতম কর্তব্য। দোয়া মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। তাই দুর্গতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করতে হবে—আল্লাহ যেন তাদের কষ্ট দূর করেন, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দেন এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৯৬৯)

২. সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ দিয়ে সহযোগিতা করা
দুর্যোগে ক্ষুধার্তকে খাদ্য, তৃষ্ণার্তকে বিশুদ্ধ পানি, অসুস্থকে ওষুধ এবং গৃহহীনকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ইসলামের অন্যতম মানবিক শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা : ইনসান, আয়াত : ৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)

৩. জাকাত, সদকা ও অনুদান যথাযথভাবে দুর্গতদের কাছে পৌঁছে দেওয়া
বন্যা বা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যাকাত ও সদকার প্রকৃত হকদার হতে পারেন। তাই বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা কিছু কল্যাণমূলক ব্যয় করো, আল্লাহ তা সম্যক অবগত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৩)

৪. উদ্ধার ও ত্রাণকাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করা
যাদের শারীরিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা কিংবা দুর্গত মানুষের প্রয়োজনীয় কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মু'জামুল আওসাত, তাবারানি; হাদিসটি অর্থের দিক থেকে হাসান বলে অনেক আলেম গ্রহণ করেছেন)

৫. দুর্যোগকে আল্লাহর স্মরণ, তাওবা ও আত্মসমালোচনার উপলক্ষ বানানো
বিপদ-আপদ মানুষের জন্য আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। তাই এমন সময় বেশি বেশি ইস্তিগফার, দোয়া, সালাত ও কোরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। তবে তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)

আরও বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, হে মুমিনগণ! যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)

৬. সাহায্য করতে গিয়ে লোক দেখানো থেকে বিরত থাকা
মানুষের প্রশংসা বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাহায্য করতে হবে। ইখলাস বা আন্তরিকতাই আমলের প্রাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা বলে, আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাদ্য দান করি; তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।’ (সুরা আল-ইনসান, ৭৬:৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭)

দুর্যোগের সময় একজন মুমিন শুধুমাত্র দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করে, ইখলাসের সঙ্গে দান-সদকা করে এবং সমাজে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মনে রাখতে হবে, আজ যারা বিপদে পড়েছেন, কাল হয়তো আমরাও একই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারি। তাই আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাদের কষ্ট লাঘবে সর্বাত্মক চেষ্টা করি এবং বেশি বেশি তাওবা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত সহায়ক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আজ বাংলাদেশে আসছেন ভারতের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজ বাংলাদেশে আসছেন ভারতের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী
সংগৃহীত ছবি

এশিয়ার প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও বিশিষ্ট আলেম আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী আজ (১২ জুলাই) ১১ দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে বাংলাদেশে আসছেন। তাঁর এ সফরকে ঘিরে দেশের আলেম-উলামা, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ইসলামপ্রেমী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

সফরকালে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত দ্বীনি সেমিনার, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণাবিষয়ক মতবিনিময় সভা, তরুণদের উদ্দেশে দাওয়াহভিত্তিক কর্মসূচি এবং আলেম-উলামাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন। পাশাপাশি সমসাময়িক ইসলামী চিন্তা, শিক্ষা ও সমাজসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও তিনি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন।

সফরের অন্যতম আকর্ষণ আগামী ১৮ জুলাই রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) কনফারেন্স’। এ সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। একই অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতিতে ‘ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

রাজধানীর কর্মসূচির পাশাপাশি চট্টগ্রাম সফরেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এ সময় তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী দুটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—হাটহাজারী ও পটিয়ার মতো দেশের বৃহৎ দুটি মাদরাসা পরিদর্শন করবেন এবং সেখানকার আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

উল্লেখ্য, ১৯৫৫ সালে ভারতের লখনউয়ে জন্মগ্রহণকারী আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড-এর খাস কমিটির সদস্য ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি মুম্বাইয়ের ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং জামিয়া দারুল উলুম ইমামে রব্বানী-এর পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলামী গবেষণা, শিক্ষা, সমসাময়িক মুসলিম সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তাঁর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

ইসলামপূর্ব প্রধান পাঁচ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামপূর্ব প্রধান পাঁচ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী
সংগৃহীত ছবি

আরবরা ইসমাঈল (আ.)-কে আবুল আরব এবং নিজেদের ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত; কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময় তারা ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস ও শিক্ষার ওপর অবিচল ছিল না। মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরা হলো—

১. মূর্তিপূজা
ইসলামপূর্ব যুগে আরব উপদ্বীপে সর্বাধিক প্রচলিত ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। যদিও মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী মানুষ ছিল, যারা দ্বিনে হানিফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিল। আরবের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, কিন্তু তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পাথর, কাঠ ও ধাতু দিয়ে নির্মিত দেব-দেবীর পূজা করত। আল্লাহর প্রতি তাদের এই বিশ্বাস ছিল ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর ধর্মের অবশিষ্টাংশ এবং আরবের প্রাচীন নগরী যেমন মাদায়িনে সালিহ, আদ ও সামুদের এলাকায় অবতীর্ণ আসমানি ধর্মগুলোর উত্তরাধিকার। কিন্তু পরবর্তীকালে তাওহিদের এই বিশুদ্ধ আকিদা বিকৃত হয়ে যায়।

তার জায়গায় মূর্তি ও নানা কুসংস্কারের উপাসনা ছড়িয়ে পড়ে, যা আরব উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমন—আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়, আমোরীয় ও আমোরাইটদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আরবরা তখন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবাল, সুওয়া ও ওয়াদ্দ-এর মতো দেব-দেবীর পূজা করত। পাশাপাশি তারা পূর্বপুরুষদের পবিত্র মনে করত, বিভিন্ন প্রাণীর পূজা করত এবং নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, দাবরান, সুরাইয়া ও শিরা নক্ষত্রমণ্ডলীর উপাসনা করত। তারা জিন, ফেরেশতা ও অগ্নিরও উপাসনা করত।

বেশির ভাগই নবুয়ত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। তাদের সমাজে গণক, জ্যোতিষী ও জাদুকরদের প্রভাব ছিল প্রবল এবং নানা পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
আরবে মূর্তিপূজার জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয়ও ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল পবিত্র কাবাঘর। মুশরিকরা কাবাঘরের চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে। হজের জন্য আসা বিভিন্ন গোত্র এসব মূর্তির পূজা করত এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানি ও মানত পেশ করত।

২. ইহুদি ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মধ্যে অন্যতম ছিল ইহুদি ধর্ম। ইয়াসরিবের কয়েকটি গোত্র, ইয়েমেন ও ইয়ামামার কিছু ব্যক্তি এই ধর্ম অনুসরণ করত। তারা ধর্মীয় সাহিত্য রচনায় হিব্রু ও আরামীয় ভাষা ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন জীবনে আরবি ভাষায় কথা বলত। আরব সমাজের প্রভাবে তারা আরবদের অনেক রীতি-নীতি গ্রহণ করেছিল এবং আরবি নামও ব্যবহার করত। তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে তারা তাওরাত, মিশনা ও তালমুদ অধ্যয়ন করত। এসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে উপাসনালয়, প্রার্থনার স্থান এবং ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তারা জাদুবিদ্যায় লিপ্ত ছিল, শনিবার কাজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত, আশুরার রোজা পালন করত এবং ইহুদিধর্মীয় উৎসবগুলো যথাযথভাবে পালন করত।

৩. খ্রিস্ট ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে বিস্তার লাভ করা আরেকটি ধর্ম ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী এবং খ্রিস্টান দেশ থেকে আসা দাসদের মাধ্যমে এই ধর্ম আরব ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে উৎসাহ দিত। কেননা এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত। শাম ও ইরাক অঞ্চল থেকে দাওমাতুল জান্দাল, আইলা, কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং মক্কা, ইয়াসরিব ও তায়েফের কিছু ব্যক্তি, বিশেষত আহাবিশ গোত্রের লোকজন ও দাসদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আরব উপদ্বীপে খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, বিশেষ করে নাজরান। এ ছাড়া সীমিত আকারে বাহরাইন, কাতার ও হাজর অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটে। প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্ম ও জ্ঞানের ভাষা ছিল আরামীয়। তবে ওয়ারাকা ইবন নওফলের ঘটনার মতো কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষায়ও ইনজিল লেখা হতো।

৪. মাজুসি ধর্ম
ইরান থেকে মাজুসি (অগ্নিপূজারি) ধর্মও আরবের কিছু অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তারা মূলত অগ্নি উপাসনা করত। প্রতিবেশী হওয়ায় হিরায় এ ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ইয়েমেনে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করতে পারস্যের সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার ফলে সেখানে মাজুসি ধর্মের বিস্তার ঘটে। হাদরামাউত ও আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আরো কিছু এলাকায়ও ইরানের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এর সীমিত প্রভাব দেখা যায়।

৫. সাবেয়ি ধর্ম
সাবেয়ি ধর্মের অনুসারীরা মূলত ইরাক ও হাররান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যায় বসবাস করত। মক্কা ও তায়েফে সাবা শব্দটি ধর্মত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হতো। মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে সাবিয়ি বলত, কারণ তারা শিরক ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এরাই ছিল ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। 

তথ্যঋণ : নবীয়ে রহমত ও আর-রাহিকুল মাখতুম

আজানের সময় যে আমলে দোয়া কবুল হয় | কালের কণ্ঠ