চট্টগ্রামসহ দেশের যেসব অঞ্চলে মানুষ বন্যায় পানিবন্দি, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমানি ও মানবিক দায়িত্ব। কেউ অর্থ দিয়ে, কেউ খাদ্য দিয়ে, কেউ বিশুদ্ধ পানি বা ওষুধ দিয়ে, কেউ শ্রম দিয়ে, আবার কেউ আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারেন। সামান্য সাহায্যও একজন অসহায় মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন এনে দিতে পারে। এজন্য আমাদের প্রত্যেকের যার যার সামার্থ অনুযায়ী করণীয় হলো-
১. দুর্গত মানুষের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা
বিপদে মানুষের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য, রহমত ও নিরাপত্তা কামনা করা একজন মুমিনের অন্যতম কর্তব্য। দোয়া মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। তাই দুর্গতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করতে হবে—আল্লাহ যেন তাদের কষ্ট দূর করেন, ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দেন এবং দ্রুত স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোয়াই ইবাদত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৯৬৯)
২. সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ দিয়ে সহযোগিতা করা
দুর্যোগে ক্ষুধার্তকে খাদ্য, তৃষ্ণার্তকে বিশুদ্ধ পানি, অসুস্থকে ওষুধ এবং গৃহহীনকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা ইসলামের অন্যতম মানবিক শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা : ইনসান, আয়াত : ৮)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৯৯)
৩. জাকাত, সদকা ও অনুদান যথাযথভাবে দুর্গতদের কাছে পৌঁছে দেওয়া
বন্যা বা দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যাকাত ও সদকার প্রকৃত হকদার হতে পারেন। তাই বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা কিছু কল্যাণমূলক ব্যয় করো, আল্লাহ তা সম্যক অবগত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৩)
৪. উদ্ধার ও ত্রাণকাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করা
যাদের শারীরিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা কিংবা দুর্গত মানুষের প্রয়োজনীয় কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশ নিতে পারেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (আল-মু'জামুল আওসাত, তাবারানি; হাদিসটি অর্থের দিক থেকে হাসান বলে অনেক আলেম গ্রহণ করেছেন)
৫. দুর্যোগকে আল্লাহর স্মরণ, তাওবা ও আত্মসমালোচনার উপলক্ষ বানানো
বিপদ-আপদ মানুষের জন্য আত্মসমালোচনা, তাওবা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ। তাই এমন সময় বেশি বেশি ইস্তিগফার, দোয়া, সালাত ও কোরআন তিলাওয়াতে মনোযোগী হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। তবে তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)
আরও বলেন, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো, হে মুমিনগণ! যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
৬. সাহায্য করতে গিয়ে লোক দেখানো থেকে বিরত থাকা
মানুষের প্রশংসা বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের জন্য নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সাহায্য করতে হবে। ইখলাস বা আন্তরিকতাই আমলের প্রাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা বলে, আমরা তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তোমাদের খাদ্য দান করি; তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।’ (সুরা আল-ইনসান, ৭৬:৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সমস্ত আমলের প্রতিদান নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৭)
দুর্যোগের সময় একজন মুমিন শুধুমাত্র দর্শক হয়ে থাকতে পারে না। সে নিজের সাধ্য অনুযায়ী মানুষের পাশে দাঁড়ায়, আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করে, ইখলাসের সঙ্গে দান-সদকা করে এবং সমাজে সহযোগিতা ও ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। মনে রাখতে হবে, আজ যারা বিপদে পড়েছেন, কাল হয়তো আমরাও একই পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারি। তাই আসুন, আমরা সবাই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াই, তাদের কষ্ট লাঘবে সর্বাত্মক চেষ্টা করি এবং বেশি বেশি তাওবা ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমত কামনা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করার এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রকৃত সহায়ক হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।




