• ই-পেপার

দেশের বন্যা পরিস্থিতি ও চলমান দুর্যোগে আমাদের করণীয়

আজ বাংলাদেশে আসছেন ভারতের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আজ বাংলাদেশে আসছেন ভারতের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী
সংগৃহীত ছবি

এশিয়ার প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও বিশিষ্ট আলেম আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী আজ (১২ জুলাই) ১১ দিনের এক গুরুত্বপূর্ণ সফরে বাংলাদেশে আসছেন। তাঁর এ সফরকে ঘিরে দেশের আলেম-উলামা, গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ইসলামপ্রেমী মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

সফরকালে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত দ্বীনি সেমিনার, ইসলামী চিন্তা ও গবেষণাবিষয়ক মতবিনিময় সভা, তরুণদের উদ্দেশে দাওয়াহভিত্তিক কর্মসূচি এবং আলেম-উলামাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেবেন। পাশাপাশি সমসাময়িক ইসলামী চিন্তা, শিক্ষা ও সমাজসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও তিনি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন।

সফরের অন্যতম আকর্ষণ আগামী ১৮ জুলাই রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিতব্য ‘ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) কনফারেন্স’। এ সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। একই অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতিতে ‘ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.) স্মারকগ্রন্থ’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হবে।

রাজধানীর কর্মসূচির পাশাপাশি চট্টগ্রাম সফরেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এ সময় তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী দুটি দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—হাটহাজারী ও পটিয়ার মতো দেশের বৃহৎ দুটি মাদরাসা পরিদর্শন করবেন এবং সেখানকার আলেম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন।

উল্লেখ্য, ১৯৫৫ সালে ভারতের লখনউয়ে জন্মগ্রহণকারী আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী উপমহাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড-এর খাস কমিটির সদস্য ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি মুম্বাইয়ের ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং জামিয়া দারুল উলুম ইমামে রব্বানী-এর পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ইসলামী গবেষণা, শিক্ষা, সমসাময়িক মুসলিম সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তাঁর অবদান আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও ব্যাপকভাবে সমাদৃত।

ইসলামপূর্ব প্রধান পাঁচ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামপূর্ব প্রধান পাঁচ ধর্মীয় জনগোষ্ঠী
সংগৃহীত ছবি

আরবরা ইসমাঈল (আ.)-কে আবুল আরব এবং নিজেদের ইবরাহিম (আ.)-এর অনুসারী দাবি করত; কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের সময় তারা ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর তাওহিদ বা একত্ববাদের বিশ্বাস ও শিক্ষার ওপর অবিচল ছিল না। মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর পরিচয় তুলে ধরা হলো—

১. মূর্তিপূজা
ইসলামপূর্ব যুগে আরব উপদ্বীপে সর্বাধিক প্রচলিত ধর্ম ছিল মূর্তিপূজা। যদিও মক্কায় একদল একেশ্বরবাদী মানুষ ছিল, যারা দ্বিনে হানিফের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিল। আরবের মুশরিকরা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করত, কিন্তু তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হিসেবে পাথর, কাঠ ও ধাতু দিয়ে নির্মিত দেব-দেবীর পূজা করত। আল্লাহর প্রতি তাদের এই বিশ্বাস ছিল ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর ধর্মের অবশিষ্টাংশ এবং আরবের প্রাচীন নগরী যেমন মাদায়িনে সালিহ, আদ ও সামুদের এলাকায় অবতীর্ণ আসমানি ধর্মগুলোর উত্তরাধিকার। কিন্তু পরবর্তীকালে তাওহিদের এই বিশুদ্ধ আকিদা বিকৃত হয়ে যায়।

তার জায়গায় মূর্তি ও নানা কুসংস্কারের উপাসনা ছড়িয়ে পড়ে, যা আরব উপদ্বীপের পার্শ্ববর্তী প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমন—আসিরীয়, ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয়, আমোরীয় ও আমোরাইটদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আরবরা তখন লাত, মানাত, উজ্জা, হুবাল, সুওয়া ও ওয়াদ্দ-এর মতো দেব-দেবীর পূজা করত। পাশাপাশি তারা পূর্বপুরুষদের পবিত্র মনে করত, বিভিন্ন প্রাণীর পূজা করত এবং নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র, দাবরান, সুরাইয়া ও শিরা নক্ষত্রমণ্ডলীর উপাসনা করত। তারা জিন, ফেরেশতা ও অগ্নিরও উপাসনা করত।

বেশির ভাগই নবুয়ত ও মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাস করত না। তাদের সমাজে গণক, জ্যোতিষী ও জাদুকরদের প্রভাব ছিল প্রবল এবং নানা পৌরাণিক কাহিনি ও কুসংস্কার ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।
আরবে মূর্তিপূজার জন্য নির্দিষ্ট উপাসনালয়ও ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল পবিত্র কাবাঘর। মুশরিকরা কাবাঘরের চারপাশে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে। হজের জন্য আসা বিভিন্ন গোত্র এসব মূর্তির পূজা করত এবং তাদের উদ্দেশ্যে কোরবানি ও মানত পেশ করত।

২. ইহুদি ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের মধ্যে অন্যতম ছিল ইহুদি ধর্ম। ইয়াসরিবের কয়েকটি গোত্র, ইয়েমেন ও ইয়ামামার কিছু ব্যক্তি এই ধর্ম অনুসরণ করত। তারা ধর্মীয় সাহিত্য রচনায় হিব্রু ও আরামীয় ভাষা ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন জীবনে আরবি ভাষায় কথা বলত। আরব সমাজের প্রভাবে তারা আরবদের অনেক রীতি-নীতি গ্রহণ করেছিল এবং আরবি নামও ব্যবহার করত। তাদের নিজস্ব শিক্ষাকেন্দ্র ছিল, যেখানে তারা তাওরাত, মিশনা ও তালমুদ অধ্যয়ন করত। এসব প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে উপাসনালয়, প্রার্থনার স্থান এবং ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তারা জাদুবিদ্যায় লিপ্ত ছিল, শনিবার কাজ করাকে নিষিদ্ধ মনে করত, আশুরার রোজা পালন করত এবং ইহুদিধর্মীয় উৎসবগুলো যথাযথভাবে পালন করত।

৩. খ্রিস্ট ধর্ম
আরব উপদ্বীপে সীমিতভাবে বিস্তার লাভ করা আরেকটি ধর্ম ছিল খ্রিস্ট ধর্ম। খ্রিস্টান সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী এবং খ্রিস্টান দেশ থেকে আসা দাসদের মাধ্যমে এই ধর্ম আরব ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যও খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারে উৎসাহ দিত। কেননা এর মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেত। শাম ও ইরাক অঞ্চল থেকে দাওমাতুল জান্দাল, আইলা, কিছু সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং মক্কা, ইয়াসরিব ও তায়েফের কিছু ব্যক্তি, বিশেষত আহাবিশ গোত্রের লোকজন ও দাসদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের মতবাদ ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আরব উপদ্বীপে খ্রিস্ট ধর্মের প্রধান কেন্দ্র ছিল ইয়েমেন, বিশেষ করে নাজরান। এ ছাড়া সীমিত আকারে বাহরাইন, কাতার ও হাজর অঞ্চলেও এর বিস্তার ঘটে। প্রাচ্যের খ্রিস্টানদের মধ্যে ধর্ম ও জ্ঞানের ভাষা ছিল আরামীয়। তবে ওয়ারাকা ইবন নওফলের ঘটনার মতো কিছু সূত্র থেকে জানা যায়, সে সময় আরবি ভাষায়ও ইনজিল লেখা হতো।

৪. মাজুসি ধর্ম
ইরান থেকে মাজুসি (অগ্নিপূজারি) ধর্মও আরবের কিছু অঞ্চলে পৌঁছেছিল। তারা মূলত অগ্নি উপাসনা করত। প্রতিবেশী হওয়ায় হিরায় এ ধর্মের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার ইয়েমেনে আবিসিনীয়দের বিতাড়িত করতে পারস্যের সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার ফলে সেখানে মাজুসি ধর্মের বিস্তার ঘটে। হাদরামাউত ও আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চলের আরো কিছু এলাকায়ও ইরানের নিকটবর্তী হওয়ার কারণে এর সীমিত প্রভাব দেখা যায়।

৫. সাবেয়ি ধর্ম
সাবেয়ি ধর্মের অনুসারীরা মূলত ইরাক ও হাররান অঞ্চলে সীমিত সংখ্যায় বসবাস করত। মক্কা ও তায়েফে সাবা শব্দটি ধর্মত্যাগের অর্থে ব্যবহৃত হতো। মুশরিকরা ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের ব্যঙ্গ করে সাবিয়ি বলত, কারণ তারা শিরক ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এরাই ছিল ইসলাম আবির্ভাবের সময় আরব উপদ্বীপের প্রধান প্রধান ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। 

তথ্যঋণ : নবীয়ে রহমত ও আর-রাহিকুল মাখতুম

অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী

মুফতি ওমর বিন নাছির
অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
সংগৃহীত ছবি

বৃষ্টি আল্লাহ তাআলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। এর মাধ্যমে মৃত জমিন জীবন্ত হয়ে ওঠে, ফসল ফলে, নদী-নালা পূর্ণ হয় এবং মানুষ ও প্রাণীকুলের জীবনধারণ সহজ হয়। তাই কোরআনে বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমতের নিদর্শন বলা হয়েছে। কিন্তু ইসলাম একই সঙ্গে শিক্ষা দেয়, সব বৃষ্টি এক ধরনের নয়। কখনো বৃষ্টি রহমত, কখনো পরীক্ষা, আবার কখনো শাস্তি বা কিয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিদর্শনও হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের পূর্বে পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনার সংবাদ দিয়েছেন। এসব ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে একটি হলো—এমন এক সময় আসবে, যখন অস্বাভাবিক ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হবে; কিন্তু সেই বৃষ্টি মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং ঘরবাড়ি ধ্বংস করবে এবং জমিনে প্রত্যাশিত ফসলও উৎপন্ন হবে না। বর্তমান বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাগুলো আমাদের এসব হাদিস স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনিই আকাশ থেকে পরিমিত পরিমাণে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি এর মাধ্যমে মৃত জনপদকে জীবিত করি। এভাবেই তোমাদেরও পুনরুত্থিত করা হবে।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ১১)

১. কিয়ামতের আগে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হবে : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

 لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُمْطَرَ النَّاسُ مَطَرًا لَا تُكِنُّ مِنْهُ بُيُوتُ الْمَدَرِ وَلَا تُكِنُّ مِنْهُ إِلَّا بُيُوتُ الشَّعَرِ

অর্থ : ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না মানুষের ওপর এমন বৃষ্টিপাত হবে, যাতে মাটির তৈরি ঘরগুলো টিকে থাকতে পারবে না; কেবল পশমের (তাঁবুর) ঘরগুলো রক্ষা পাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১২৪২৯)
এই হাদিসে এমন অস্বাভাবিক ও দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, যা মানুষের স্থায়ী বসতবাড়ির জন্য বড় ক্ষতির কারণ হবে।

২. প্রচুর বৃষ্টি হবে, কিন্তু ফসল উৎপন্ন হবে না : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,

لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُمْطَرَ النَّاسُ مَطَرًا عَامًّا وَلَا تَنْبُتَ الْأَرْضُ شَيْئًا

অর্থ : ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না সর্বত্র ব্যাপক বৃষ্টিপাত হবে; কিন্তু জমিন কোনো ফসল উৎপন্ন করবে না।’ (মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস নং : ৭৪১১)

স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টি ফসলের কারণ। কিন্তু কিয়ামতের পূর্বে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, যখন বৃষ্টি হলেও জমিন তার স্বাভাবিক উৎপাদনশীলতা হারাবে। এটি আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক ব্যবস্থায় এক ব্যতিক্রমী পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

৩. বৃষ্টি আল্লাহর রহমত, তবে তা পরীক্ষা ও সতর্কবার্তাও হতে পারে : কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘স্থলে ও সাগরে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে মানুষের কৃতকর্মের কারণে, যাতে আল্লাহ তাদের কিছু কর্মের স্বাদ আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ৪১)

এই আমাদের শিখায়, পৃথিবীর বিভিন্ন বিপর্যয় মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান জানায়।


অতএব, বৃষ্টি মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য নিয়ামত। কিন্তু মহানবী (সা.) আমাদের জানিয়েছেন, কিয়ামতের পূর্বে এমন এক সময় আসবে, যখন অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে দুর্ভোগের কারণ হবে। অতিবৃষ্টি ঘরবাড়ি ধ্বংস করবে, অথচ সেই বৃষ্টিতেও জমিন প্রত্যাশিত ফসল দেবে না। এসব ভবিষ্যদ্বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়; একদিন সবকিছু বদলে যাবে।

তাই একজন মুমিনের কর্তব্য হলো আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা, বিপদে ধৈর্যধারণ করা, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং কিয়ামতের প্রস্তুতি হিসেবে ঈমান, ইবাদত ও সৎকর্মে নিজেকে সমৃদ্ধ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর নিদর্শন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার, রহমতের বৃষ্টির জন্য কৃতজ্ঞ থাকার এবং সব ধরনের বিপদ-আপদ থেকে তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ব্যক্তিগত প্রয়োজন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

ইসলামী অর্থনীতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি জীবিকাকে শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজনের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না; বরং সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবেও দেখে। এ কারণেই কোরআন বৈধ উপার্জনের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের সম্পদের মধ্যে অন্যের অধিকারও নির্ধারণ করে দিয়েছে।

অর্থাৎ একজন মানুষ তার শ্রম, মেধা ও উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করবেন—এটি যেমন তার অধিকার, তেমনি সেই সম্পদের ব্যবহারে ন্যায়, ভারসাম্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও তার দায়িত্ব।
অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শ্রমকে সম্পদ সৃষ্টির প্রধান ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বহু চিন্তাবিদ। স্কটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘The Wealth of Nations’-এর সূচনাতেই লিখেছেন, ‘The annual labour of every nation is the fund which originally supplies it with all the necessaries and conveniences of life which it annually consumes.’

অর্থাৎ একটি জাতির মানুষের বার্ষিক শ্রমই তাদের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের মূল উৎস। আধুনিক অর্থনীতির বিকাশে এই পর্যবেক্ষণ গভীর প্রভাব ফেলেছে।

তবে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এখানে আরো একটি মৌলিক মাত্রা যোগ করে। ইসলাম শ্রমকে শুধু উৎপাদনের উপায় হিসেবে মূল্যায়ন করে না; শ্রমের নৈতিকতাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। কারণ অন্যায় উপায়ে অর্জিত বিপুল সম্পদের চেয়ে সৎ পরিশ্রমে অর্জিত সামান্য উপার্জনও ইসলামের দৃষ্টিতে অধিক মর্যাদাপূর্ণ। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায়ীদের শুধু লাভের পথ দেখাননি; শিখিয়েছেন সততার পথও। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গী হবে।’ (জামে তিরমিজি)

ব্যবসা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য এই হাদিসটির গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে ব্যবসাকে শুধু বৈধ জীবিকার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি; বরং সততার সঙ্গে পরিচালিত ব্যবসাকে এমন এক নৈতিক মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে, যা মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ইবাদতের চেতনার সঙ্গে যুক্ত করে। অর্থ উপার্জনের লক্ষ্য তখন শুধু মুনাফা থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় আমানতদারি, জবাবদিহি এবং আল্লাহভীতি। ইসলামের ইতিহাসে বাজার ছিল শুধু কেনাবেচার স্থান নয়; ছিল সামাজিক আস্থারও প্রতীক।

ক্রেতা ও বিক্রেতার পারস্পরিক সম্পর্ক টিকে থাকত বিশ্বাসের ওপর। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বাজারে প্রতারণা, মজুদদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, পণ্যের ত্রুটি গোপন করা কিংবা ওজনে কম দেওয়ার মতো আচরণের কঠোর নিন্দা করেছেন। কারণ বাজারে একবার বিশ্বাসের সংকট তৈরি হলে ক্ষতি শুধু একজন ক্রেতা বা একজন বিক্রেতার হয় না; তার অভিঘাত পুরো অর্থনৈতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজকের বিশ্বের বহু আর্থিক সংকটও শেষ পর্যন্ত এই আস্থাহীনতার দিকেই আমাদের দৃষ্টি ফেরায়।

মুসলিম মনীষীদের অর্থনৈতিক চিন্তায়ও এই নৈতিকতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। হানাফি ফকিহ ইমাম আবু ইউসুফ তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘কিতাবুল খারাজ’-এ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দায়িত্ব আলোচনা করতে গিয়ে ন্যায়ভিত্তিক রাজস্বনীতি, কর আদায়ে সংযম এবং জনগণের সম্পদের সুরক্ষাকে সুশাসনের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের শক্তি কর বৃদ্ধিতে নয়; বরং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্যে, যেখানে মানুষ নিরাপদে শ্রম দেবে, ব্যবসা করবে এবং উৎপাদনে উৎসাহিত হবে। এ কারণেই ‘কিতাবুল খারাজ’ ইসলামী রাজস্বনীতি ও জন-অর্থব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে আজও সমাদৃত।

একই ধারার চিন্তাকে আরো বিস্তৃত রূপ দিয়েছেন ইতিহাসবিদ ইবন খালদুন। তার অমর গ্রন্থ ‘মুকাদ্দিমা’য় শ্রম, উৎপাদন, রাষ্ট্র এবং সভ্যতার পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষের শ্রমই সম্পদের প্রকৃত ভিত্তি। কিন্তু সেই শ্রম তখনই ফলপ্রসূ হয়, যখন মানুষ তার শ্রমফল ভোগের নিরাপত্তা অনুভব করে। অন্যায় করনীতি, জুলুম কিংবা সম্পদের অনিরাপত্তা মানুষের কর্মস্পৃহা নষ্ট করে, উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও দুর্বল করে ফেলে। কয়েক শতাব্দী আগে উপস্থাপিত এই বিশ্লেষণ আজও অর্থনৈতিক গবেষণায় বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়।

এখানেই ইসলামী অর্থনীতির স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলাম মানুষকে সম্পদ অর্জনের আহ্বান জানায়, কিন্তু সম্পদের জন্য বিবেক বিসর্জনের অনুমতি দেয় না। ব্যবসাকে সম্মানজনক পেশা হিসেবে মর্যাদা দেয়, কিন্তু প্রতারণাকে কখনো ব্যবসায়িক কৌশল হিসেবে মেনে নেয় না। শ্রমকে সম্মানিত করে, তবে শ্রমিকের অধিকার উপেক্ষা করে অর্জিত মুনাফাকে বৈধ বলে না। অর্থনৈতিক সাফল্য ইসলামের কাছে কাম্য, কিন্তু সেই সাফল্যের ভিত্তি হতে হবে ন্যায়, সততা ও মানুষের অধিকার রক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আজকের বিশ্বে দক্ষতা, প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদনশীলতার গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এই বাস্তবতার পাশাপাশি আরেকটি সত্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ—অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি শুধু পুঁজি বা প্রযুক্তিতে নয়; মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসে। যখন বাজারে আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন শক্তিশালী আইনও অনেক সময় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক রাখতে পারে না। অথচ যেখানে সততা সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়, সেখানে বাজারও স্বাভাবিকভাবে স্থিতিশীলতা লাভ করে। ইসলামী অর্থনীতি তাই মানুষের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সেই হাতকে বিশ্বস্ত, ন্যায়পরায়ণ ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তুলতে চায়। এখানেই হালাল উপার্জনের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত।

ইসলামী অর্থনীতির আলোচনা অনেক সময় সুদ কিংবা জাকাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃত প্রাণ নিহিত থাকে তার উপার্জন-সংস্কৃতিতে। মানুষ কিভাবে সম্পদ অর্জন করছে, লেনদেনে কতটা বিশ্বস্ত, প্রতিশ্রুতি রক্ষায় কতটা আন্তরিক—এসবের ওপরই শেষ পর্যন্ত একটি অর্থনীতির স্থায়িত্ব নির্ভর করে। যে সমাজে প্রতারণা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হিসেবে প্রশংসিত হয়, সেখানে আইন আরো কঠোর করা যায়; কিন্তু মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। বিপরীতে যে সমাজে সততা সামাজিক মর্যাদায় পরিণত হয়, সেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্কও স্বাভাবিকভাবেই দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। এই নৈতিক ভিত্তিকেই আরো সুস্পষ্ট করেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)

হাদিসটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এখানে প্রতারণাকে শুধু একটি ব্যবসায়িক অনিয়ম হিসেবে দেখা হয়নি; বরং মুসলিম সমাজের নৈতিক পরিচয়ের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন মুসলমানের ব্যবসায়িক পরিচয় তার ঈমানি পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাই ইসলাম ব্যবসাকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে, কিন্তু অসততাকে কখনো ব্যবসায়িক দক্ষতা বা কৌশল হিসেবে বৈধতা দেয়নি।

হালাল উপার্জনের ধারণা শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; এটি একটি সুস্থ অর্থনৈতিক সভ্যতার ভিত্তি। এই দর্শন মানুষকে সম্পদ অর্জনে নিরুৎসাহ করে না; বরং সম্পদকে নৈতিকতার আলোয় পরিচালিত করতে শেখায়। ইসলাম চায় মানুষ স্বাবলম্বী হোক, উদ্যোগী হোক, ব্যবসায় সফল হোক, সম্পদশালী হোক; কিন্তু সেই সফলতার ভিত গড়ে উঠুক সৎ শ্রম, বৈধ ব্যবসা, আমানতদারিতা এবং মানুষের অধিকারের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধার ওপর।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সূচক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, নীতিমালা বদলে যায়, বাজারের কাঠামোও রূপান্তরিত হয়। কিন্তু একটি সত্য কখনো পুরনো হয় না, অন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত সমৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র—সবার ক্ষেত্রেই টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি নির্মিত হয় বৈধ উপার্জন, ন্যায়ভিত্তিক লেনদেন এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর।

এ কারণেই ইসলামী অর্থনীতি সম্পদের হিসাব শেখানোর আগে সম্পদ অর্জনের নৈতিকতা শেখায়। কারণ উপার্জনের পথ নির্মল হলে সম্পদ কল্যাণ বয়ে আনে, সমাজে আস্থা সৃষ্টি করে এবং রাষ্ট্রের ভিতকে শক্তিশালী করে। আর সেই পথ কলুষিত হলে প্রাচুর্যও অনেক সময় আশীর্বাদের পরিবর্তে অস্থিরতা, বৈষম্য ও অবিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের কল্যাণের জন্য তাই হালাল উপার্জন শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক জীবনের অপরিহার্য ভিত্তি।