অনেক সময় একটি দেশের ভবিষ্যেক বোঝা যায় তার শিশু বা কিশোরদের দিকে তাকিয়েই। শিশুরা নিজে থেকে কোনো সমাজকে বদলে দিতে পারে না। তারা প্রথমে বিদ্যমান সমাজকেই অনুকরণ করে। তারা বড়দের ভাষা ধার করে, বড়দের আচরণ নকল করে, বড়দের রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কয়েক দিন আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রবল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া হয়েছে; অনেক পরীক্ষার্থী চরম ভোগান্তির মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছেছে, কেউ কেউ পরীক্ষায় অংশ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রীর কিছু মন্তব্য নিয়েও শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচার করা নয়। এখানে আমি একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। আমাদের শিশুরা আন্দোলন করতে গিয়ে যেসব আচরণ করছে, যেসব ভাষা ব্যবহার করছে, সেগুলোর সবকিছু কি কাঙ্ক্ষিত? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শিশুরা কেন আজ এমন ভাষায় কথা বলছে? তাদের ব্যবহৃত ভাষা, অনেক শব্দ একসময় প্রাপ্তবয়স্ক রাজনীতিকদের কাছেও অশোভন বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু আজ তা কি স্বাভাবিকে পরিণত হতে চলেছে? এর কারণ কি শিশু বা কিশোররা? এর উত্তরে সহজেই বলা যায়, না।
সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আন্দোলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেটি হলো কিছু স্লোগান ও বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটাক্ষ এবং অসম্মানজনক ভাষার ব্যবহার। আবার অন্যদিকে অনেকেই বলেছে, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিষয়টি দেখা উচিত। অর্থাৎ জনপরিসরে দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে—একটি প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে, অন্যটি প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্নতা।
এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করা দরকার। শিশুরা এমন ভাষা শিখল কোথা থেকে? শিশু জন্মের সময় কোনো রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সে জানে না কাকে অপমান করতে হয়, কাকে বিদ্রুপ করতে হয় কিংবা কিভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে হয়। এসব সে শেখে পরিবার থেকে, আশপাশের সমাজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে, ফেসবুকের ভিডিও থেকে, ইউটিউবের শর্টস থেকে এবং সর্বোপরি বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ শিশুর মুখে যে ভাষা আমরা শুনি, সেটি আসলে আমাদেরই ভাষা।
আমরা যদি গত এক দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকাই, তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মতের অমিলকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, প্রতিপক্ষকে অপমান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল—এসব ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সংসদে, রাজনৈতিক সমাবেশে, টক শোতে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আমরা প্রতিদিন এমন সব ভাষা শুনছি, যা কয়েক বছর আগেও অস্বাভাবিক বলে মনে হতো। এমন বাস্তবতায় বড় হওয়া একটি শিশু যখন আন্দোলনে নামে, তখন সে কি হঠাৎ করেই ভদ্র, সংযত ও যুক্তিনির্ভর ভাষা ব্যবহার করবে? সম্ভবত না।
মনোবিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, অবজারভেশনাল লার্নিং বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক শিক্ষা। মানুষ, বিশেষ করে শিশু অন্যকে দেখে আচরণ শেখে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে কিংবা সমাজে যে আচরণকে পুরস্কৃত হতে দেখে, সেটিকেই সে গ্রহণ করতে শুরু করে।
আজ যদি কোনো শিশু দেখে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে; রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে তীব্র ভাষা ব্যবহার করে; তাহলে সে অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করবে, নেতৃত্ব মানেই উচ্চকণ্ঠ হওয়া, আর প্রতিবাদ মানেই প্রতিপক্ষকে অপমান করা। এই বিশ্বাসের জন্ম এক দিনে হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সাল একটি বড় মোড়। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী পর্যায়ে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশে পরিণত হয়েছিল। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবির ধরন বদলেছে, নতুন নেতৃত্ব উঠে এসেছে এবং পরে সেই আন্দোলনের কিছু মুখ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিসরেও সক্রিয় হয়েছেন। আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা ছিলেন। কেউ কেউ এখন দেশের সংসদ সদস্য। অনেকটা ধারণা করে বলা যায় যে ২০২৪ সালের ওই আন্দোলন না হলে তাঁরা অনেকেই এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে এত সহজে যেতে পারতেন কি না, সন্দেহ আছে। তবে এটি গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতা ছাত্র আন্দোলন থেকেই উঠে এসেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর এ ক্ষেত্রে একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে।
আজকের কিশোর-কিশোরীরা খুব কাছ থেকে দেখেছে একটি আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জাতীয় পরিচিতি এনে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এখানেই একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটেছে। আগে আন্দোলন ছিল মূলত দাবি আদায়ের মাধ্যম। এখন অনেকের কাছে আন্দোলন ব্যক্তিগত দৃশ্যমানতারও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। অবশ্যই এটি সব আন্দোলনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আন্তরিকভাবেই নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত পরিচিতি অর্জনের আকর্ষণও শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করছে।
যদি কোনো শিশু কিংবা কিশোর বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সবচেয়ে জোরে স্লোগান দিলেই সে নেতা হয়ে যাবে, সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেই তার ভিডিও ভাইরাল হবে, তাহলে আমরা তাকে আসলে কী শিক্ষা দিচ্ছি? রাজনীতি কি তখন আর জনসেবার শিক্ষা থাকে, নাকি জনদৃষ্টিতে আসার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়? আমাদের আত্মসমালোচনা সেখানেই প্রয়োজন। কারণ শিশুরা আমাদের শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা আমাদের বর্তমানেরই প্রতিফলন। তারা আমাদের ভাষা ধার করে, আমাদের রাগ ধার করে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ধার করে। শিশুরা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু তারা কিভাবে আন্দোলন করে, তাদের ভাষা কেমন থাকে, সেটি একটি নতুন গবেষণাযোগ্য বিষয়।
শিশুরা শুধু আমাদের উপদেশ শোনে না, তারা আমাদের আচরণও পর্যবেক্ষণ করে। যদি মা-বাবা প্রতিদিন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গালি দেন, যদি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভিন্নমতকে বিদ্রুপ করেন, যদি সমাজে অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে শিশুদের কাছ থেকে সহনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা পরীক্ষার ফল নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, নাগরিক চরিত্র গঠনের বিষয়ে ততটা নই। একজন শিক্ষার্থী গণিতে ‘এ প্লাস’ পেলেও যদি সে ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে, যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে না শেখে, পরাজয় মেনে নিতে না শেখে, তাহলে সে শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে ওঠে না।
বিদ্যালয়ে নাগরিক শিক্ষা, বিতর্কচর্চা, মতবিনিময়, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্কৃতি নিয়ে আরো বেশি কাজ করা দরকার। প্রতিবাদ শেখাতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে শেখাতে হবে প্রতিপক্ষকে অপমান না করেও প্রতিবাদ করা যায়।
আজ অনেক শিশুই মনে করে, প্রতিবাদ মানেই রাস্তা অবরোধ, চিৎকার, ভাইরাল ভিডিও এবং উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান। কিন্তু ইতিহাস বলে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল আন্দোলনগুলোর অনেকগুলোই টিকে ছিল শৃঙ্খলা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সংগঠনের ওপর। আজকের শিশুরা আগামী দিনের নেতা, শিক্ষক, বিচারক, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও প্রশাসক। আমরা যদি আজ তাদের শেখাই যুক্তির চেয়ে গালি শক্তিশালী, তাহলে আগামী দিনের গণতন্ত্রও সেই ভাষায়ই কথা বলবে। অতএব প্রশ্নটি শুধু একটি আন্দোলন ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আরো বড়। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ছি, যেখানে শিশুদের প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষা হবে শালীনতা, সহনশীলতা ও যুক্তি; নাকি এমন একটি সমাজ গড়ছি, যেখানে নেতৃত্বের প্রথম পাঠই হবে বিদ্বেষ, বিভাজন ও চিৎকার? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে যেমন দিতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকে, শিক্ষককে, অভিভাবককে, গণমাধ্যমকে এবং আমাদের প্রত্যেককেও দিতে হবে। কারণ শিশুরা কখনো একা বদলে যায় না। তারা বড়দের পৃথিবী থেকেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের ভাষা ধার করে।
লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়





রপ্তানি খাতের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি এখনো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাত দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।