• ই-পেপার

ঐতিহ্যের মিশেল হোক ‘কবি নজরুল সিটি’

  • ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল

নৈতিকতার সংকট ও আমাদের আগামী প্রজন্ম

এম আরিফুজ্জামান

নৈতিকতার সংকট ও আমাদের আগামী প্রজন্ম

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আর এই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো বিবেক, বুদ্ধি, আত্মসংযম ও মনুষ্যত্ববোধ। সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার নামই হলো জীবন। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ‘মানুষ হওয়া’র চেয়ে ‘সার্টিফিকেট অর্জন’ বা ‘ভালো ফলাফল’ করাকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্যুতিই আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বর্তমানের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার যে ধারাবাহিক চিত্র আমরা দেখছি, তা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের অশনিসংকেত। যে শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, তাঁর প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন শুধু একজন ব্যক্তির অবমাননা নয়, এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার নামান্তর। অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং ফলাফলকেন্দ্রিক অস্থিরতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা শিক্ষার্থীদের মেধার চেয়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে বেশি ঠেলে দিচ্ছি। পরীক্ষার নম্বরই যখন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ই নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো উপায়ে ফলাফল অর্জনের মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হন। এই মরিয়া ভাবই আজকের সামাজিক অস্থিরতার মূল উৎস।

আজকের প্রজন্ম এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির অবারিত সুবিধা, অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম সাফল্যের ইঁদুর দৌড়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’ ও ‘ভিউ’-এর প্রতিযোগিতার মতো পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। তারা ভার্চুয়াল জগতের চকচকে মোড়কে নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখছে, ফলে বাস্তবের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল আগ্রাসনের যুগে সহমর্মিতা ও ধৈর্য কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে।

অথচ শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরি হয় পরিবারে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’ কিন্তু আজ সেই পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব প্রকট। যখন পরিবার থেকে সন্তানকে সাফল্যের চেয়ে সততার মূল্য শেখানো হয় না, যখন কোনো অভিভাবক তার সন্তানের ভুল সংশোধন না করে শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ করেন, তখন সেই সন্তান শুধু মেধাবী হতে পারে, কিন্তু মানুষ হতে পারে না।

নটর ডেম কলেজে অধ্যয়নকালীন স্মৃতি আজও আমার মানসপটে অম্লান হয়ে আছে। ফিজিক্সের অধ্যাপক সুশান্ত স্যার একবার কুইজ পরীক্ষায় ভুলবশত অনেককে ১০ নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটি ছিল মূলত একটি ‘নৈতিক পরীক্ষা’। আমি ও আমার বন্ধুরা সেই লোভ সংবরণ করে স্যারকে জানালে তিনি সবাইকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘বাবারা, আজকের ক্লাসের শিক্ষা হলো—ছোটখাটো লোভ সামলাতে হবে। যারা আজ ১০ নম্বরের লোভ সামলাতে পারলে না, তারা ভবিষ্যতে কোটি টাকার লোভে বিবেক বিসর্জন দেবে। আমি চাই না আমার ছাত্ররা অসৎ হোক।’ আজ সেই স্যারের আদর্শের বড় অভাব। শিক্ষকের সেই ধমক বা শাসনকে আজ আর কেউ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না; উল্টো শিক্ষকের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কটি আজ দাতা-গ্রহীতার ব্যাবসায়িক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি চরিত্র গঠনের কারিগর। মেধাবী হওয়ার চেয়ে অনুগত ও নীতিবান হওয়া অধিক জরুরি।

আগামী প্রজন্মকে এই নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমেই পরিবারকে শিক্ষার মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে, কারণ পারিবারিক মূল্যবোধই শিশুর নৈতিকতার প্রথম সোপান। সন্তানকে শুধু জিপিএ ৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে সৎ ও নীতিবান হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষকদের ভয় নয়, বরং গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার বাস্তবধর্মী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে মেধাবীদের চেয়েও মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতির চর্চা কমিয়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নিজেদের দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

পরিশেষে সুশিক্ষিত ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে হলে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নটর ডেমের সেই ১০ নম্বরের লোভ বর্জন বা স্যারের সেই কঠোর শাসন আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে। আমরা কি পারব না আজকের অস্থির প্রজন্মকে সত্য ও সুন্দরের পথে ফিরিয়ে আনতে? মনে রাখতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি নয়, প্রকৃত ‘মানুষ’ গড়ে তোলা। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের প্রত্যয়ের নাম হোক—‘নৈতিকতায় মেধার উৎকর্ষ’।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর

 

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর

মাসুদ রুমী

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর

বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর। গত পাঁচ দশকে দেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক অবস্থান এবং সামাজিক সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে যে পুরনো প্রবৃদ্ধির মডেল আর আগের মতো কার্যকর থাকবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, জলবায়ু সংকট, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা নতুন ধরনের প্রস্তুতি দাবি করছে।

আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় নয়, এটি হতে পারে অর্থনীতির ভিত্তিগত রূপান্তরের সময়। এই রূপান্তর শুধু শিল্প বা রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনা, বাজারব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আর্থিক খাত এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বিত পরিবর্তন।

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তররপ্তানি খাতের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি এখনো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাত দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

আগামী পাঁচ বছরে তাই তৈরি পোশাক শিল্পকে উচ্চমূল্য সংযোজনের দিকে যেতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন, নিজস্ব ব্র্যান্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। পাশাপাশি ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মতো খাতকে রপ্তানির নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াবে না, এটি কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎসও সৃষ্টি করবে।

বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই উদ্যোক্তারা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, করব্যবস্থার জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে।

একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে হলে সরকারকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে, কিন্তু বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ব্যবসা শুরু করা, জমি নিবন্ধন, বিদ্যুৎ সংযোগ, কর পরিশোধ, আমদানি-রপ্তানি অনুমোদন—সবকিছুই ডিজিটাল ও সময়মাফিক করতে হবে। নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরির অন্যতম শর্ত।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছতে পারেনি। শুধু করছাড় বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করলেই বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা।

বাংলাদেশ যদি আগামী পাঁচ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হতে চায়, তাহলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে কাগজে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি কার্যকর ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল শর্ত।

অর্থনীতির রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকতে হবে সুশাসন। উন্নয়নের ইতিহাস বলে, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অর্জন করেছে, তারা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে নীতি কার্যকর হয় না, বিনিয়োগ কমে যায়, জন-আস্থা নষ্ট হয় এবং উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুশাসনের অর্থ শুধু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নয়। এর অর্থ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসন। অর্থনৈতিক নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান কিংবা বিনিয়োগ—কোনোটিই টেকসই হতে পারে না। আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন আগামী পাঁচ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি থাকলে এই জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত হবে না। শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতভিত্তিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং ডিজিটাল সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এখনই প্রস্তুতি না নেয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। আবার সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে এই প্রযুক্তিই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করবে। ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি। শিল্প, কৃষি, সেবা খাত—সবকিছুই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ওপর। আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার ঝুঁকি এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষির ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; কৃষিকে উচ্চমূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশের নগরায়ণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ উৎপাদনশীলতা কমায়, পরিবেশদূষণ বাড়ায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে। পরিবহন, আবাসন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ অবকাঠামোতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত অর্থনীতির প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে। অভিযোজন ও সহনশীলতা এখন আর পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নীতিরও অংশ। উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে মূলধারায় আনতে হবে।

সামাজিক উন্নয়নকে অর্থনৈতিক নীতির বাইরে রাখা যাবে না। বৈষম্য বাড়তে থাকলে প্রবৃদ্ধির সুফল টেকসই হয় না। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযত্ন সুবিধা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অর্থনীতির জন্যও লাভজনক।

করব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি। করের আওতা বাড়াতে হবে, কিন্তু ব্যবসার ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করে। ডিজিটাল কর প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং করদাতাবান্ধব সেবা রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

অবশেষে একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির

রূপান্তর শুধু সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা দরকার। নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক আস্থা ছাড়া বড় কোনো অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনো রয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, তরুণ জনশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সুযোগ নিজে থেকে সাফল্যে রূপ নেয় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

আগামী পাঁচ বছর তাই শুধু আরেকটি উন্নয়ন পরিকল্পনার সময় নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন ভিত্তি নির্মাণের সময়। সেই ভিত্তি হবে বৈচিত্র্যময়, উদ্ভাবননির্ভর, পরিবেশসহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সুশাসনভিত্তিক। প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হবে উৎপাদনশীলতা, ন্যায়সংগত সুযোগ, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং নাগরিকের মর্যাদা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের মূল প্রশ্ন তাই প্রবৃদ্ধির হার কত হবে, তা নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি কতটা শক্ত, কতটা বৈচিত্র্যময় এবং কতটা টেকসই হবে। আগামী পাঁচ বছরে যদি আমরা সেই ভিত্তি নির্মাণে সফল হই, তবে অর্থনীতির রূপান্তর আর শুধু একটি নীতিগত আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, সেটি বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠবে।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের ডেপুটি এডিটর

শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিন

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিন

সাধারণত পরিণত বয়সে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও এখন শিশু-কিশোরদের মধ্যে এ প্রবণতা বেড়েই চলছে। কারো আত্মহত্যাই কাম্য নয়, তবে শিশুদের আত্মহনন আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। পরিণত বয়সে মানসিক চাপ, আর্থিক অনটন, দীর্ঘদিনের রোগ কিংবা অন্য কোনো কারণে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু একজন শিশু কিংবা কিশোর, যার নেই কোনো আর্থিক সংকট কিংবা টানাপড়েন, নেই কোনো মানসিক চাপ, তাকে কেন আত্মহননের মতো পথ বেছে নিতে হবে। সিলেটে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সম্প্রতি আত্মহত্যা করে। ঠিক কয়েক মাস আগে একই বিদ্যালয়ের আরেকজন শিক্ষার্থীও আত্মহত্যা করে এবং বিষয়টি তখন বেশ আলোচনা সৃষ্টি করে। অভিযোগের ভিত্তিতে তখন ওই বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অপসারণও করা হয়। এমন ঘটনা প্রায়ই আমাদের সমাজে ঘটছে। অন্যান্য সামাজিক অপরাধের মতো আত্মহত্যার প্রবণতাকে আমরা কোনোভাবেই অবহেলা কিংবা ছোট করে দেখতে পারি না। যে শিশু কিংবা কিশোরটি আজ আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেল, তার সম্ভাবনাকে আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলছি। শিশুটি ইংরেজিতে একটি সুন্দর এবং বুদ্ধিদীপ্ত সুইসাইড নোট লিখে গেছে, যা তার মেধার বহিঃপ্রকাশ বটে। মোটাদাগে আমরা বলতে পারি, এমন একটি পরিবেশ আমরা তাদের জন্য তৈরি করি, যেখানে তারা বাধ্য হয়ে, আবেগে আক্রান্ত হয়ে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছে। তাদের আত্মহত্যার জন্য আমরা তাদের কোনোভাবেই দায়ী করতে পারি না। কেননা শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় নজর দিনতারা নিরপরাধ এবং তাদের ব্যক্তিগত কোনো অপর্যাপ্ততার জন্য তারা এ কাজ করতে পারে না। দুটি দৃষ্টিভঙ্গিতে শিশু-কিশোরদের আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এক. বিদ্যালয়কেন্দ্রিক আর দুই. পরিবারকেন্দ্রিক। শিশুরা একটি নির্দিষ্ট এবং বড় সময় বিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। এখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা এবং আড্ডায় সময় কাটে। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার একটি প্রক্রিয়া, যেখানে একটি কারিকুলাম থাকে, থাকে নির্দিষ্ট কাজ, ক্লাসে অংশগ্রহণ, পড়ালেখা বিনিময় এবং এর ভিত্তিতে একাডেমিক মূল্যায়ন। পাশাপাশি তার আচার-আচরণেরও মূল্যায়ন হয়। এ কাজের মধ্যে রয়েছে সম্পর্ক, যেটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রধানত আনুষ্ঠানিকভাবে হয়ে থাকে। পড়ালেখার জন্য এই সম্পর্ক যদি কোনো ঘাটতি কিংবা মনোমালিন্য তৈরি করে এবং তা যদি তিক্ততায় রূপান্তরিত হয়, তখন তার প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষার্থীদের মন কোমল এবং অনেক কিছুই তারা সহজভাবে নিতে পারে না। শিশুদের মনোজগৎ বুঝতে পারা হলো শিক্ষকের বড় কাজ। তাদের প্রতি যেমন খুব কঠোর হওয়া যাবে না, তেমনি হেলায় গা ভাসিয়েও দেওয়া যাবে না। কোমল মনে তাদের উপযোগী ব্যবহার তাদের সঙ্গে করতে হবে। আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকায় অবসর সময়ে শিক্ষার্থীরা হয়তো ক্লাসে বসেই বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। আড্ডার ছলে হয়তো কারো সঙ্গে কোনো বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি কিংবা ঝগড়া হতে পারে। কিন্তু শিক্ষকদের উচিত এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা এবং সমাধানের চেষ্টা করা।

একটি নির্দিষ্ট সময় আমাদের শিশুরা বিদ্যালয়ে থাকলেও তাদের বেশি সময় কাটে পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের ধরন এবং পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবর্তিত সমাজকাঠামোর কারণে আমাদের পরিবারের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই বিভিন্ন ধরনের পরিবারে শিশুদের বসবাস। কেউ একক, কেউ যৌথ, কেউ সিঙ্গল মা-বাবা, আবার অনেকে সত্বাবা কিংবা মা দ্বারা পরিবারে মানুষ হচ্ছে। একেক ধরনের পরিবারে শিশুদের বিকাশ একেক রকম হয়। আবার এমনও হয়, যেখানে সবকিছুই স্বাভাবিক, কিন্তু অযত্ন আর অবহেলার কারণে আমাদের শিশুরা মানসিক কষ্ট অনুভব করে। বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ কোনোটির জন্য শিশু-কিশোরদের আমরা দায়ী করতে পারি না। আমরা যেখানেই যে পরিবেশ দেব, তারা সেই পরিবেশেই মানুষ হবে। কাজেই শিশুদের একটি উন্নত ও সুন্দর পরিবেশ দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। অনেক ক্ষেত্রে আমরাই তাদের আত্মহত্যার জন্য দায়ী। আমাদের এ ক্ষেত্রে করণীয় রয়েছে। শিশুদের জন্য একটি ভালো বিদ্যালয়ের পরিবেশ তৈরি করা আমাদের দায়িত্ব, যেখানে শিক্ষকরা হবেন প্রতিটি শিশুর অভিভাবক। শিক্ষার্থীদের পরম মমতা ও স্নেহ দিয়ে মানুষ করতে হবে। সঙ্গে শাসনও থাকতে হবে, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই শিশুর মনোজগতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ভালোভাবে বোঝা একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত দুইবার অভিভাবক-শিক্ষক সমাবেশ করতে হবে। এর বাইরেও প্রয়োজন মনে করলে শ্রেণিশিক্ষক অভিভাবকদের ডেকে কথা বলতে পারেন। খোলামেলা কথা বললে অনেক সমাধান বের হয়ে আসবে। শিক্ষার্থীদের শাসনের পাশাপাশি কাউন্সেলিং করতে হবে। তাদের নিয়মিত পড়াশোনা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আচার-আচরণও পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনোভাবেই তাদের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা যাবে না। পরিবার হলো সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। পরিবারে থাকবে অনেক ধরনের সমস্যা। কিছু সমস্যা আর্থিক, আবার অনেক সমস্যা সামাজিক ও মানসিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত। কিছুতেই শিশুদের পরিবারের কোনো সংকট এবং টানাপড়েনে যুক্ত করা যাবে না। নিজেদের মধ্যে যতই সমস্যা থাকুক না কেন, শিশুরা থাকবে তা থেকে মুক্ত। একটি সুন্দর পরিবার ও পারিবারিক পরিবেশ শিশুদের দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের নিজেদের সমস্যার জন্য শিশুদের জীবন নষ্ট করার অধিকার কারো নেই। শিশুদের চাহিদা ও প্রয়োজন, তা প্রাত্যহিক হোক কিংবা গুণগত সময় কাটানো হোক, অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। আমাদের শিশুরা প্রতিনিয়ত অবহেলার শিকার হচ্ছে। আবার আমাদের কারণেই তারা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। আমরা চাই প্রতিরোধ, আর এর জন্য আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। 

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবে

ইকরামউজ্জমান

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবে

বিশ্বের কয়েক শ কোটি মানুষের চোখ এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নিবদ্ধ। আমাদের সময় অনুযায়ী আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায় ভরপুর ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপা দখলের জন্য নামবে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপীয় দেশ স্পেন। দুটি দেশই বিশ্ব ফুটবলে পরাশক্তি। স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়ন বিজয়ী, আর আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। এবারই প্রথম ফাইনালে পরস্পর পরস্পরের মুখোমুখি হবে ফুটবলে রোমাঞ্চ ছড়ানোর জন্য। ১৯৭০, ১৯৮৬ ও ১৯৯৪ সালে উত্তর আমেরিকায় যখন বিশ্বকাপের আসর বসেছে, তখন লাতিন দেশ ছাড়া কেউ জিততে পারেনি। এবার আবার উত্তর আমেরিকায় খেলা। লাতিন দেশ আর্জেন্টিনা আছে ফাইনালে, তাহলে কি আবার লাতিন দেশকে ট্রফি হাতে দেখা যাবে?

মাঠের লড়াই দর্শন এবং ফুটবল ক্যারেক্টার প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আছে উভয় দেশের মধ্যে বেশ পার্থক্য। স্পেন তার খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসার পর সত্যি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। তাদের মাথা আর ফুটবলের কৌশলে অন্য পরাশক্তিগুলোর চেয়ে অন্য রকম। এটি তারা প্রমাণ দিয়েছে আবার এই বিশ্বকাপে। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার মানসিক শক্তি ভীষণ। তারা ভেঙে পড়তে জানে না। আর তাই পেছনে পড়েও এগিয়ে আসার লড়াই ওদের বড় বেশি। ভীষণভাবে আত্মবিশ্বাসী। স্পেন জিততে চায়, তবে তারা ব্যাকরণের বাইরে আসতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। এই দুটি দেশের ফুটবল নিয়ে যত গল্প আর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, অন্য কোনো দেশের ফুটবল নিয়ে তেমনটি হয়নি। কেননা তাদের ফুটবলে গল্পের উপাদান যে সবচেয়ে বেশি। তারা ফুটবলকে দেখে অন্য চোখে। তাই বলা মুশকিল নিউজার্সিতে কে জিতবে? কে ট্রফির সঙ্গে জিতে নিয়ে যাবে বাংলাদেশের টাকায় ৬১৫ কোটি টাকা।

বিশ্বকাপে কে চ্যাম্পিয়ন হবেআর্জেন্টিনার দখলে আছে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি। এটি তারা জয় করেছে ২০২২ বিশ্বকাপে। ৩৬ বছর পর। তারা চাইছে কাপটি রিটেইন করতে। অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের অবশ্য সেই সামর্থ্য আছে। যদি তারা এবার দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তারা ব্রাজিলের পাশে তাদের নাম লেখাতে পারবে। ব্রাজিল ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালে পর পর দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেছে। আর্জেন্টিনাও তো লাতিন আমেরিকার দেশ।

স্পেন তাদের প্রথম গ্রুপ ম্যাচে প্রথম খেলায় নবাগত এবং দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করেছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সৌদি আরবের কাছে প্রথম খেলায় পরাজিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে আগাম কিছু বলা যাবে না। ফুটবল তার নিজস্ব মতে চলে। স্পেন যদি প্রথমে ধাক্কা খেয়ে শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়, তাহলে ফুটবল ইতিহাস বলবে সময়মতো জ্বলে ওঠার বিকল্প নেই। ফুটবল চলে সব সময় এমন সব আশা-নিরাশার মধ্য দিয়ে।

এবার আমরা দেখলাম, যে চারটি দেশ বিগত বছরগুলোতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারাই আবার সেমিফাইনালে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। এতে ফুটবল আকর্ষণীয় হয়েছে। পাশাপাশি ভুগতে হয়েছে অনিশ্চয়তায়। সবাই দেখেছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড কিভাবে সেমিফাইনালে বিদায় নিয়েছে যথাক্রমে স্পেন আর আর্জেন্টিনার কাছে হেরে। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড কিন্তু কেউই দৃঢ়চেতা আক্রমণাত্মক এবং গোছানো ফুটবল খেলতে পারেনি। তারা চেষ্টা করেছে, তবে এটি যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিয়তি তাদের সঙ্গে ছিল না। ইংল্যান্ড সেই ১৯৬৬ সালে জয়ের পর আর এই শতাব্দীতে ফাইনাল খেলতে পারেনি। শক্তিশালী এবং ভারসাম্যপূর্ণ দল নিয়েও ফ্রান্স বিদায় নিয়েছে সেমিফাইনালে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে ঘিরে অনেক আলোচনা, প্রত্যাশা আর স্বপ্ন দেখা হয়েছেসব চুরমার করে দিয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক গ্রেটরা অনেক কথাই বলেছেনতবে বাস্তবতা হলো, ফ্রান্সের তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। আর ইংল্যান্ড তো এই শতাব্দীতে এসে আর জয়ের মুখ দেখেনি, যেটি আগেই উল্লেখ করেছি। ফ্রান্সের অর্থনীতিবিদ এবং অন্যরা এখন কী বলবেন?

বিশ্বকাপের ইতিহাসটিকে নাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে আর্জেন্টিনা। তারা বিগত বছরগুলোতে তিনবার চ্যাম্পিয়ন আর তিনবার রানার্স আপ। যদি আর্জেন্টিনা এবার মেসির নেতৃত্বে শিরোপা জিততে পারে, তাহলে তারা জার্মানি ও ইতালির চারবার বিজয়ের পাশে তাদের নাম লেখাতে পারবে। জার্মানি এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে মোট আটবার। আর আর্জেন্টিনার এবার নিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলা হবে সাতবার। আর্জেন্টিনা শুধু এবার নয়, এর আগে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালে ফাইনালে খেলেছে। অর্থাৎ এবার নিয়ে পর পর ফাইনাল খেলা (২০২২ ও ২০২৬) হবে তাদের দ্বিতীয়বার। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা জিতলেও ১৯৯০ সালে জিতেছে জার্মানি। স্পেনের বিশ্বকাপ জয় ২০১০ সালে। এই ২০১৯ সালের পর আর কোনো নতুন দেশ বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। স্পেনের সামনে এখন সুযোগ এসেছে। এবার যদি তারা জিততে পারে, তাহলে এটি হবে তাদের দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা বিজয়, যেটি জেতার সামর্থ্য তাদের আছে।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে ফুটবল পণ্ডিতরা ছিলেন ভীষণ সতর্ক। তাঁরা বলেছেন, কাউকে ফেভারিট বলা মুশকিল। তবে তাঁদের বেশির ভাগের মতামত কিন্তু ফ্রান্স ও স্পেনের দিকেই ঝুঁকে ছিল। আর্জেন্টিনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে অনেক পরে, সতর্কতার সঙ্গে। তাঁরা স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিগত বছরগুলোতে যে আটটি দেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে, তারা ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপে অন্য কোনো দেশকে কাপ উঁচু করে ওপরে তুলে ধরতে দেখা যাবে না। অর্থাৎ ২০১০ সালে স্পেনের পর আর এবার কোনো নতুন দেশকে দেখার সম্ভাবনা নেই। এটি সঠিক হয়েছে। তবে তাঁদের কারো কারো সেমিফাইনালের প্রেডিকশন সঠিক হয়নি। ফুটবলের ভবিষ্যৎ বলা হয় অনেক তথ্য এবং বিভিন্ন বিষয় ঘাঁটাঘাঁটি করে। ফ্রান্সের অর্থনীতিবিদরা তো সোজাসুজি বলেছেন, ফ্রান্স এবার তৃতীয়বারের চ্যাম্পিয়ন হবে। সেই ফ্রান্স তো তাদের জার্নি শেষ করেছে সেমিফাইনালেই। ঘটনাবহুল এবং বহু আলোচিত বিশ্বকাপে যেটি দেখলাম, সেটি হলো সেমিফাইনালে যে চারটি দেশ কোয়ালিফাই করেছে, এই চারটি দেশ ফিফার র‌্যাংকিংয়ের ওপরে আছেএই ধরনের অবস্থা কিন্তু বিশ্বকাপে আগে কখনো হয়নি। এতে সেমিফাইনাল দুটি ছিল টান টান উত্তেজনায় ভরপুর।

৪৮টি দেশ নিয়ে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, কিন্তু কোনো স্তরেই মাঠের খেলা ঝুলে যায়নি। আর তাই পুরো বিশ্বকাপ ঘিরে ফুটবলের আকর্ষণ ছিল অনেক বেশি। একে একে বিদায় নিয়েছে উরুগুয়ে, জার্মানি ও ব্রাজিলের মতো বিশ্বকাপ বিজয়ী দল। এটির কারণ হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দিনের খেলা। নক আউটে তো সাধ্যমতো যুদ্ধ করা ছাড়া উপায় ছিল না। দিনের খেলায় দুর্বলতা মানেই বিদায়। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, নরওয়ে ও মরক্কো কেন এগিয়ে আসতে পারেনি, এটি তো দেখা গেল।

বিশ্ব ফুটবল ডমিনেট করছে ইউরোপ। পরিসংখ্যানের এখন যে অবস্থা, এবার যদি লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা কাপ জেতে, এর পরও পিছিয়ে থাকতে হবে। সেমিফাইনালে চারটি দেশের মধ্যে একমাত্র আর্জেন্টিনা ছিল লাতিন আমেরিকার দেশ। কোয়ার্টার ফাইনালে আফ্রিকান দেশ মরক্কো ছিল।

সবচেয়ে বেশি মানবসম্পদ নিয়ে এশিয়া মহাদেশের ৯টি দেশ বিশ্বকাপ থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপে এশিয়ার দেশগুলোর পারফরম্যান্স হতাশাজনক। ৪৭টি দেশ নিয়ে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন। বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান এবার চোখে পড়ার মতো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলে এএফসি দেশগুলোর গুরুত্ব কিন্তু অন্য জায়গায়। সেটি হলো ভোট। আফ্রিকান দেশগুলোর মেধা চলে যাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এটি এবার লক্ষ করা গেছে মাঠে প্রকটভাবে। আফ্রিকা মহাদেশ কী ভাবছে? ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ তো হবে মরক্কো, স্পেন ও পর্তুগালে। আর ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপের স্বাগতিক দেশ সৌদি আরব। আরববিশ্বে তো লক্ষণীয় হচ্ছে ফুটবলের ক্ষেত্রে অনেক বড় বিনিয়োগ, বিশেষ করে ক্লাবগুলোতে। তবে তাদের বিনিয়োগ হতে হবে পরিকল্পনামাফিক।

ফুটবল অর্থই সব। স্পন্সর ছাড়া উপায় নেই। বিভিন্ন প্রসিদ্ধ ব্র্যান্ড তো বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দেশের জাতীয় দলকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এবার ফাইনালে দুটি দেশ আর্জেন্টিনা ও স্পেন লড়বে। এই দুটি দেশের ফুটবল স্পন্সর তো অ্যাডিডাস। তারা পরাজিত করেছে সেমিফাইনালে নাইকির স্পন্সর করা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী খেলায় আবার নাইকির স্পন্সর করা দুটি দেশ (ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড) লড়বে। ফুটবল চত্বরে অ্যাডিডাসের দলের জয় মানে তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু অনেকাংশে বেড়ে যাওয়া। ব্র্যান্ডের এই যুদ্ধে আবার লক্ষ করতে হচ্ছে গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল, সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং সেরা তরুণ খেলোয়াড় কোন ব্র্যান্ডের এনডোর্সমেন্টের আওতায় খেলোয়াড়রা পেতে যাচ্ছেন।

ফুটবল শুধু খেলা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পদে পদে ব্যবসা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বর্ণবৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব আর ফিফার প্রচণ্ড ভণ্ডামি। ফিফা কখনো নিরপেক্ষ ছিল না, এখনো নয়। ইরানের বিষয় ফিফা কিছুই করতে পারেনি। কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রকে তারা চটাতে চায়নি নিজ স্বার্থের কথা ভেবে। বাজে রেফারিং এবং পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কথা উঠেছে। ফিফা তাদের সুন্দর সুন্দর বয়ান শুনিয়েছে লিখিতভাবে। দুর্বল এবং পিছিয়ে পড়া দেশগুলো ফুটবল বিশ্বকাপে বিভিন্নভাবে অবহেলিত হয়েছে। তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হয়নি। বড় কথা হলো, খেলার চেয়ে ব্যবসাকে এখন বড় করে দেখা হয়েছে। চড়া মূল্যে টিকিট কেটে খেলা দেখেছে মানুষ, কিন্তু এটি তো ফিফার দর্শন নয়। বিশ্বজুড়ে ফুটবল কাদের খেলা? এবার বিশ্বকাপে এই প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা ভীষণ ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে। উত্তর দেওয়ার সময় কোথায়? তাদের তো বাংলাদেশের টাকায় প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিজনেস এস্টিমেট। এটি তো অ্যাচিভ করতেই হবে, যেভাবেই হোক। শেষে এসে সান্ত্বনা একটিই, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ফুটবল সাঙ্গ হতে যাচ্ছে। কয়েক শ কোটি মানুষ খেলা উপভোগ করেছে ফুটবলকে ভালোবেসে। একটি মিথ আবার সত্য হলো, বিদেশি পেশাদার কোচ কখনো দেশকে জেতাতে পারেন না।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া