• ই-পেপার

কোরআন থেকে শিক্ষা

  • পর্ব-১১৭৪

মনীষীর কথা

মনীষীর কথা

আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ যথাযথভাবে মেনে চলাই দ্বিনের ওপর দৃঢ় থাকা।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

তীব্র দাবদাহে মক্কা ও মদিনায় সতর্কবার্তা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তীব্র দাবদাহে মক্কা ও মদিনায় সতর্কবার্তা

সৌদি আরবের আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ধূলিঝড় ও বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন সতর্কতা জারি করেছে, বিশেষ করে মক্কা ও মদিনা অঞ্চলের কিছু অংশে দিনের বেলায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বাসিন্দা ও ভ্রমণকারীদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মক্কা ও মদিনার পাশাপাশি আল-জাওফ, উত্তর সীমান্ত অঞ্চল, হাইল, আল-কাসিম, রিয়াদ, পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চল এবং নাজরানের কিছু এলাকায় ধুলা ও বালুবাহী প্রবল বাতাস বয়ে যেতে পারে। এসব এলাকায় দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দৈনন্দিন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটতে পারে।

এদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলেও আবহাওয়া অস্থিতিশীল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাজান, আসির ও আল-বাহা অঞ্চলের কিছু অংশ এবং মক্কার দক্ষিণাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় সক্রিয় বাতাসের সঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

ইসলামে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
ইসলামে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ

জুয়া কোরআন ও হাদিসে কিমার/মাইসির নামে পরিচিত। ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।

ইসলামিক স্কলাররা জুয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবেদুই পক্ষের এমন প্রতিযোগিতা বা লেনদেন, যেখানে প্রত্যেক পক্ষই লাভ বা ক্ষতির অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে এবং প্রবল ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ জুয়াড়ি জানে না সে লাভ করবে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এই অনিশ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনই জুয়ার মূল বৈশিষ্ট্য।

সুতরাং জুয়া তার সব ধরনের রূপ নিয়ে হারাম। অনলাইন, অফলাইন, আধুনিক কিংবা প্রাচীন সব ধরনের জুয়া হারাম। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই এটিকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা বিধান করেন এবং তাঁর বিধানই চূড়ান্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদাররা! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীরএসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়। সুতরাং, তোমরা কি এখনো বিরত হবে না?

(সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৯০-৯১)

জুয়া হারাম হওয়ার হিকমত ও কারণ

বিবেকবান মানুষ সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন যে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে বহু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো

পরিবার ও সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে : জুয়া সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে, মানুষের সম্পদ অবৈধ পথে নষ্ট করে, ধনী পরিবারকে নিঃস্ব করে এবং সম্মানিত মানুষকে অপমান ও লাঞ্ছনার মুখে ফেলে।

শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে : জুয়ার মাধ্যমে মানুষ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে। এর ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা জন্ম নেয়।

আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত

রাখে : জুয়া মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে নিকৃষ্ট চরিত্র ও জঘন্য অভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়।

সময় ও শ্রমের অপচয় ঘটায় : জুয়া এমন একটি পাপপূর্ণ বিনোদন, যা মানুষের মূল্যবান সময় ও শক্তিকে গ্রাস করে। এটি অলসতা ও কর্মবিমুখতা সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তি ও জাতিকে উৎপাদনশীল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

অপরাধের দিকে ধাবিত করে : যে ব্যক্তি জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, সে অর্থের জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করতে পারেযেমন চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, আত্মসাৎ ইত্যাদি।

মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি করে : জুয়া উদ্বেগ, মানসিক চাপ, স্নায়বিক দুর্বলতা ও নানা রোগের কারণ হয়। এটি মানুষের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ, আত্মহত্যা, উন্মাদনা বা কঠিন রোগের দিকেও ঠেলে দেয়।

জুয়া অন্য পাপের দরজা খুলে দেয় : জুয়ার আসরে প্রায়ই মদ, মাদক, ধূমপান, অশ্লীলতা, প্রতারণা ও অসৎ সঙ্গের প্রচলন থাকে। সেখানে খেলোয়াড়রা পরস্পরের বন্ধু নয়; বরং একে অপরের ক্ষতির অপেক্ষায় থাকে। প্রতারণা, ষড়যন্ত্র ও অন্যায় কৌশল সেখানে সাধারণ বিষয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়কেউ অর্থ হারায়, কেউ চরিত্র, কেউ সম্মান, কেউ বা পরিবার।

রাত শেষে তারা হতাশা, লজ্জা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে আসে। বিজয়ীও প্রকৃত অর্থে লাভবান হয় না; কারণ নানা ব্যয় ও পাপের মাধ্যমে তার লাভও প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর পরাজিত ব্যক্তি হারায় তার সম্পদ, মানসিক শান্তি ও আত্মসম্মান।

জুয়া শুধু অর্থের ক্ষতি করে না; বরং এটি মদ, ধূমপান, অসৎ সঙ্গ, প্রতারণা, অন্ধকার পরিবেশ, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, আত্মসাৎ এবং নানা ধরনের অনৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

এ ছাড়া জুয়া মানুষকে অর্থহীন কাজে ব্যস্ত রাখে। এতে সালাতের সময় নষ্ট হয়, ইবাদতের প্রতি উদাসীনতা আসে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। জুয়াড়ি ব্যক্তি জিতুক বা হারুকতার মন সর্বদা জুয়াকেই ঘিরে থাকে। হারলে দুশ্চিন্তায় থাকে, আর জিতলে আরো বেশি জেতার লোভে বিভোর হয়ে পড়ে। ফলে সে আল্লাহমুখী হতে পারে না।

জুয়া এমন উপার্জনের পথ, যা সমাজের কোনো উপকার করে না। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের উপার্জন এমন কাজের মাধ্যমে হওয়া উচিত, যা নিজের পাশাপাশি সমাজ ও অর্থনীতিরও কল্যাণ সাধন করে। কিন্তু জুয়া মানুষের কর্মস্পৃহা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে কোনো সম্মানজনক পেশা বা উৎপাদনশীল কাজে আগ্রহী থাকে না।

আল্লাহ সবাইকে হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

মৌলিক অধিকারে ইসলামের চোখে সব মানুষ সমান

উম্মে আহমাদ ফারজানা
মৌলিক অধিকারে ইসলামের চোখে সব মানুষ সমান

ইসলাম মৌলিকভাবে প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার স্বীকার করে এবং কাউকে তার চেহারা, গায়ের রং, বংশ, জাতি বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া (পরহেজগারি)।

অতএব, ইসলামে ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, শাসক-প্রজাসব মানুষই সমান। কোরআনের বহু আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও কর্মে এই সাম্যের নীতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। তারপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।

(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে সব মানুষের উৎস একএকজন পিতা ও একজন মাতা। তাই সবাই পরস্পরের ভাই-বোন এবং কারো সঙ্গে বংশ, জাতি বা বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের বহু ঘটনাও এই নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে আইনের দৃষ্টিতে কেউই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নয়। যদি তাঁর নিজের পরিবারের কেউ অপরাধ করত, তবু একই আইন প্রয়োগ করা হতো। তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।

(বুখারি, হাদিস : ৩৭৩৩)

মদিনায় সাহাবিদের জীবন ছিল জাতিগত ও বর্ণগত সাম্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেখানে আরব আবু বকর, হাবশি বিলাল, রোমান সুহাইব এবং পারসিক সালমানসবাই ইসলামের ছায়াতলে সমান মর্যাদায় ভাই হিসেবে বসবাস করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, মানুষ সবাই চিরুনির দাঁতের মতো সমান। তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের ওপর অনারবের কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ২২৯৭৮)

তবে ইসলাম মানুষের বংশ, জীবিকা, সম্পদ বা কর্মক্ষেত্রে পার্থক্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। বরং এটি স্বীকার করে যে মানবজীবনের ভারসাম্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার জন্য এই বৈচিত্র্য প্রয়োজন। মহান আল্লাহ বলেন, আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি এবং তাদের কাউকে কারো ওপর মর্যাদায় উচ্চ করেছি। (সুরা : আয-যুখরুফ, আয়াত : ৩২)

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সাম্য তাদের মৌলিক নীতিগুলোর একটি ছিল। মসজিদে নামাজের কাতারে শাসক ও সাধারণ মানুষ, ধনী ও গরিব, শক্তিশালী ও দুর্বল, বড় ও ছোটসবাই একই সারিতে দাঁড়িয়ে এক আল্লাহর সামনে বিনম্রভাবে মাথা নত করতেন। এই দৃশ্য ইসলামের সাম্যের এক জীবন্ত প্রতীক।

এই নীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন মহান সাহাবি বিলাল (রা.)। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে একজন দাস ছিলেন; কিন্তু ইসলাম তাঁকে এমন মর্যাদা দিয়েছিল যে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুয়াজ্জিন হওয়ার সম্মান লাভ করেন।

একবার আবু জর আল-গিফারি (রা.) বিলাল (রা.)-কে তাঁর গায়ের রঙের কারণে কটাক্ষ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। তিনি আবু জরকে বলেন, তোমার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াতের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে।

(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)

অর্থাৎ বর্ণবাদী আচরণ ইসলামের আদর্শ ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

ইসলামে সাম্যের নীতি শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অমুসলিমদের প্রতিও একই ন্যায় ও মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।

(সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে অমুসলিমদের প্রতিও ন্যায়, দয়া ও সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা। তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের ওপর অন্যায় না করা মুসলমানের দায়িত্ব।