ইসলাম মৌলিকভাবে প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার স্বীকার করে এবং কাউকে তার চেহারা, গায়ের রং, বংশ, জাতি বা সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড হলো তাকওয়া (পরহেজগারি)।
অতএব, ইসলামে ধনী-গরিব, শক্তিশালী-দুর্বল, শাসক-প্রজা—সব মানুষই সমান। কোরআনের বহু আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও কর্মে এই সাম্যের নীতি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে। তারপর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সর্ববিষয়ে অবহিত।’
(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এই আয়াতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে সব মানুষের উৎস এক—একজন পিতা ও একজন মাতা। তাই সবাই পরস্পরের ভাই-বোন এবং কারো সঙ্গে বংশ, জাতি বা বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের বহু ঘটনাও এই নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে আইনের দৃষ্টিতে কেউই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নয়। যদি তাঁর নিজের পরিবারের কেউ অপরাধ করত, তবু একই আইন প্রয়োগ করা হতো। তিনি বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত। আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম।’
(বুখারি, হাদিস : ৩৭৩৩)
মদিনায় সাহাবিদের জীবন ছিল জাতিগত ও বর্ণগত সাম্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। সেখানে আরব আবু বকর, হাবশি বিলাল, রোমান সুহাইব এবং পারসিক সালমান—সবাই ইসলামের ছায়াতলে সমান মর্যাদায় ভাই হিসেবে বসবাস করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘মানুষ সবাই চিরুনির দাঁতের মতো সমান। তাকওয়া ছাড়া কোনো আরবের ওপর অনারবের কিংবা অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ২২৯৭৮)
তবে ইসলাম মানুষের বংশ, জীবিকা, সম্পদ বা কর্মক্ষেত্রে পার্থক্যের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। বরং এটি স্বীকার করে যে মানবজীবনের ভারসাম্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা বজায় রাখার জন্য এই বৈচিত্র্য প্রয়োজন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের জীবিকা বণ্টন করেছি এবং তাদের কাউকে কারো ওপর মর্যাদায় উচ্চ করেছি।’ (সুরা : আয-যুখরুফ, আয়াত : ৩২)
মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সাম্য তাদের মৌলিক নীতিগুলোর একটি ছিল। মসজিদে নামাজের কাতারে শাসক ও সাধারণ মানুষ, ধনী ও গরিব, শক্তিশালী ও দুর্বল, বড় ও ছোট—সবাই একই সারিতে দাঁড়িয়ে এক আল্লাহর সামনে বিনম্রভাবে মাথা নত করতেন। এই দৃশ্য ইসলামের সাম্যের এক জীবন্ত প্রতীক।
এই নীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হলেন মহান সাহাবি বিলাল (রা.)। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে একজন দাস ছিলেন; কিন্তু ইসলাম তাঁকে এমন মর্যাদা দিয়েছিল যে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুয়াজ্জিন হওয়ার সম্মান লাভ করেন।
একবার আবু জর আল-গিফারি (রা.) বিলাল (রা.)-কে তাঁর গায়ের রঙের কারণে কটাক্ষ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন। তিনি আবু জরকে বলেন, ‘তোমার মধ্যে এখনো জাহেলিয়াতের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে।’
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০)
অর্থাৎ বর্ণবাদী আচরণ ইসলামের আদর্শ ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ইসলামে সাম্যের নীতি শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, অমুসলিমদের প্রতিও একই ন্যায় ও মানবিকতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে অমুসলিমদের প্রতিও ন্যায়, দয়া ও সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা। তাদের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের ওপর অন্যায় না করা মুসলমানের দায়িত্ব।