বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারে দুর্যোগ পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে।
গত ৩৬ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১২ জন নিহত হয়েছেন। একই সঙ্গে ভারি বর্ষণে কক্সবাজার শহরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
সড়ক ও নৌযোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।
সবশেষ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে লিমা আক্তার (২৫) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন আহত হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে।
এর আগে সোমবার দিবাগত রাতে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় ১০ জন নিহত হন।
উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিনজন—মোহাম্মদ কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং ছেলে মোহাম্মদ আনাস (৪) নিহত হন। একই রাতে কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়। বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ নিহত হন।
অন্যদিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে আলী আকবর নামের এক ব্যক্তি নিহত হন। একই দিন পেকুয়া নিহত হয় মো. মিনহাজ উদ্দিন (৭)।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের জামবাগান এলাকায় টানা বর্ষণের কারণে একটি মাটির ঘরের দেয়াল ধসে মানিক (৪০) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ৬ জুলাই বিকেল ৫টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এরপরও বৃষ্টি অব্যাহত থাকে।
সর্বশেষ ৭ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত আরো ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। ভোর থেকে ভারি বৃষ্টি এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
টানা বর্ষণে কক্সবাজার শহরের অনেক সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। এতে মঙ্গলবার কিছুসময় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়।
কক্সবাজার সদর উপজেলার চৌফলদণ্ডী ইউনিয়ন ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়েছে। অনেক বসতঘর ও গ্রামীণ সড়কে পানি ওঠায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জেলার অন্যান্য নিম্নাঞ্চলেও জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, উপজেলার কাউয়ারখোপ, গর্জনিয়া, ঈদগড় ও খুনিয়া পালং ইউনিয়নের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসরত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে।
ভারি বৃষ্টির কারণে কুতুবদিয়ার লেমশীখালী-কৈয়ারবিল সংযোগ সেতুর একটি অংশ ধসে পড়েছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথে সি-ট্রাক ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রয়েছে। টানা চারদিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌযোগাযোগও বন্ধ রয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বর্ষণে মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় উখিয়া, কক্সবাজার সদরসহ জেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ ছেড়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থানের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কক্সবাজার সদর ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, টানা ভারি বর্ষণের কারণে বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি এখনও বেশি। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।




