জুয়া কোরআন ও হাদিসে ‘কিমার/মাইসির’ নামে পরিচিত। ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া সম্পূর্ণরূপে হারাম।
ইসলামিক স্কলাররা জুয়ার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে—দুই পক্ষের এমন প্রতিযোগিতা বা লেনদেন, যেখানে প্রত্যেক পক্ষই লাভ বা ক্ষতির অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকে এবং প্রবল ঝুঁকি বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ জুয়াড়ি জানে না সে লাভ করবে, নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; এই অনিশ্চিত ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেনই জুয়ার মূল বৈশিষ্ট্য।
সুতরাং জুয়া তার সব ধরনের রূপ নিয়ে হারাম। অনলাইন, অফলাইন, আধুনিক কিংবা প্রাচীন সব ধরনের জুয়া হারাম। কারণ আল্লাহ তাআলা নিজেই এটিকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি যা ইচ্ছা বিধান করেন এবং তাঁর বিধানই চূড়ান্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব, তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। শয়তান তো মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়। সুতরাং, তোমরা কি এখনো বিরত হবে না?’
(সুরা : আল-মায়িদা, আয়াত : ৯০-৯১)
জুয়া হারাম হওয়ার হিকমত ও কারণ
বিবেকবান মানুষ সহজেই উপলব্ধি করতে পারেন যে জুয়া নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে বহু গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
পরিবার ও সম্পদের ধ্বংস ডেকে আনে : জুয়া সুখী পরিবারকে ধ্বংস করে, মানুষের সম্পদ অবৈধ পথে নষ্ট করে, ধনী পরিবারকে নিঃস্ব করে এবং সম্মানিত মানুষকে অপমান ও লাঞ্ছনার মুখে ফেলে।
শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে : জুয়ার মাধ্যমে মানুষ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে। এর ফলে খেলোয়াড়দের মধ্যে হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা জন্ম নেয়।
আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত
রাখে : জুয়া মানুষকে আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং তাকে নিকৃষ্ট চরিত্র ও জঘন্য অভ্যাসের দিকে ঠেলে দেয়।
সময় ও শ্রমের অপচয় ঘটায় : জুয়া এমন একটি পাপপূর্ণ বিনোদন, যা মানুষের মূল্যবান সময় ও শক্তিকে গ্রাস করে। এটি অলসতা ও কর্মবিমুখতা সৃষ্টি করে এবং ব্যক্তি ও জাতিকে উৎপাদনশীল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অপরাধের দিকে ধাবিত করে : যে ব্যক্তি জুয়ায় সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, সে অর্থের জন্য যেকোনো পথ অবলম্বন করতে পারে—যেমন চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, আত্মসাৎ ইত্যাদি।
মানসিক ও শারীরিক ক্ষতি করে : জুয়া উদ্বেগ, মানসিক চাপ, স্নায়বিক দুর্বলতা ও নানা রোগের কারণ হয়। এটি মানুষের মনে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ, আত্মহত্যা, উন্মাদনা বা কঠিন রোগের দিকেও ঠেলে দেয়।
জুয়া অন্য পাপের দরজা খুলে দেয় : জুয়ার আসরে প্রায়ই মদ, মাদক, ধূমপান, অশ্লীলতা, প্রতারণা ও অসৎ সঙ্গের প্রচলন থাকে। সেখানে খেলোয়াড়রা পরস্পরের বন্ধু নয়; বরং একে অপরের ক্ষতির অপেক্ষায় থাকে। প্রতারণা, ষড়যন্ত্র ও অন্যায় কৌশল সেখানে সাধারণ বিষয়। শেষ পর্যন্ত প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়—কেউ অর্থ হারায়, কেউ চরিত্র, কেউ সম্মান, কেউ বা পরিবার।
রাত শেষে তারা হতাশা, লজ্জা ও অনুশোচনা নিয়ে ফিরে আসে। বিজয়ীও প্রকৃত অর্থে লাভবান হয় না; কারণ নানা ব্যয় ও পাপের মাধ্যমে তার লাভও প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর পরাজিত ব্যক্তি হারায় তার সম্পদ, মানসিক শান্তি ও আত্মসম্মান।
জুয়া শুধু অর্থের ক্ষতি করে না; বরং এটি মদ, ধূমপান, অসৎ সঙ্গ, প্রতারণা, অন্ধকার পরিবেশ, বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র, আত্মসাৎ এবং নানা ধরনের অনৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
এ ছাড়া জুয়া মানুষকে অর্থহীন কাজে ব্যস্ত রাখে। এতে সালাতের সময় নষ্ট হয়, ইবাদতের প্রতি উদাসীনতা আসে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষ দূরে সরে যায়। জুয়াড়ি ব্যক্তি জিতুক বা হারুক—তার মন সর্বদা জুয়াকেই ঘিরে থাকে। হারলে দুশ্চিন্তায় থাকে, আর জিতলে আরো বেশি জেতার লোভে বিভোর হয়ে পড়ে। ফলে সে আল্লাহমুখী হতে পারে না।
জুয়া এমন উপার্জনের পথ, যা সমাজের কোনো উপকার করে না। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের উপার্জন এমন কাজের মাধ্যমে হওয়া উচিত, যা নিজের পাশাপাশি সমাজ ও অর্থনীতিরও কল্যাণ সাধন করে। কিন্তু জুয়া মানুষের কর্মস্পৃহা ধ্বংস করে দেয়। ফলে সে কোনো সম্মানজনক পেশা বা উৎপাদনশীল কাজে আগ্রহী থাকে না।
আল্লাহ সবাইকে হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।