শুধু ঘড়ি ধরে বেশি সময় নিয়ে পড়লেই হবে না, এর সঙ্গে দরকার নিয়মানুবর্তিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, সময় ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। পড়ার টেবিলে বসে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখাই অনেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। বই খুলে বসার কয়েক মিনিট পরই দেখা যায় স্মার্টফোন হাতে নেয়। এরপর ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতেই ঘণ্টা পার হয়ে যায়। পড়াশোনার মুড নষ্ট হয়ে গেলে জোর করে মন বসানো কঠিন। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে দৈনিক পড়ার সময় ও বিষয় নির্ধারণ থাকে। তাই পরিকল্পনার বাইরে অন্য কোথাও সময় নষ্ট করলে পরে পরিকল্পনা অনুযায়ী পাঠ শেষ করা সম্ভব হয় না। অনিয়মকেই নিয়মে পরিণত করলে সিলেবাস শেষ করা সম্ভব হয় না। সব শেষে পরীক্ষা খারাপ হয়।
পড়ার সময় শুধুই পড়া
মানুষের মস্তিষ্ক একসঙ্গে অনেক কাজ দক্ষতার সঙ্গে করতে পারে—এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আমরা যখন একই সময়ে পড়াশোনা ও মোবাইল ব্যবহার করি, তখন মস্তিষ্ক আসলে এক কাজ থেকে আরেক কাজে দ্রুত সরে যায়। এই ‘টাস্ক সুইচিং’ প্রক্রিয়ায় মনোযোগ ভেঙে যায় এবং শেখার দক্ষতা কমে যায়। তাই পড়ার সময় শুধুই পড়ার দিকে মন দিতে হবে। পড়ার বাইরে অন্য কোনো কিছুই খেয়াল করা যাবে না। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি মানসিকভাবে চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। সুন্দর পড়ার পরিবেশ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, দীর্ঘ পড়াশোনার মাঝখানে বিরতি—এগুলোও জরুরি।
লক্ষ্য নির্ধারণ
‘আজ অনেক পড়ব’—এর চেয়ে ‘আজ এই বিষয়ের এই অধ্যায়টি এত ঘণ্টা পড়ব’—এটা বেশি কার্যকর। পরিকল্পনা ছোট হলেও লক্ষ্য যদি সুনির্দিষ্ট হয়, সেখানে সফল হওয়া সহজ। তাই পড়তে হবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে। যেমন—‘পরবর্তী ৯০ মিনিটে ইতিহাসের দুটি অধ্যায় পড়ব’ বা ‘২০টি গণিতের সমস্যা সমাধান করব’। এ ছাড়া ছোট ছোট লক্ষ্যের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ তৈরি হয় না।
সময় ভাগ করে পড়ুন
একটানা কয়েক ঘণ্টা পড়ার বদলে নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে পড়ুন। এটা ফলপ্রসূ। অনেকেই ‘পোমোডোরো পদ্ধতি’ অনুসরণ করে। যেমন—২৫ মিনিট মনোযোগ দিয়ে পড়ার পর পাঁচ মিনিট বিরতি। চারটি সেশন শেষ হলে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের বড় বিরতি নেওয়া যায়। এভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে ক্লান্তিহীন পড়া যায়। ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা যায়।
পড়ার পরিবেশ
মনোযোগ দিয়ে পড়ার সঙ্গে পড়াশোনার পরিবেশও বড় ভূমিকা রাখে। পরিচ্ছন্ন ও নিরিবিলি পরিবেশ মনোযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পড়ার টেবিলে অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র না রাখাই ভালো। পর্যাপ্ত আলো, আরামদায়ক চেয়ার এবং সঠিক বসার ভঙ্গিও পড়াশোনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। যদি সম্ভব হয়, প্রতিদিন একই জায়গায় পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। তাহলে পড়ার উপযোগী মাইন্ডসেট বা মানসিকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে।
স্মার্টফোনের ব্যবহার
আজকাল মনোযোগ নষ্টের অন্যতম বড় কারণ স্মার্টফোন। একটি নোটিফিকেশনও মনোযোগ ভেঙে দিতে পারে। পড়ার সময় মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ মোডে রাখুন। চোখের আড়ালেও সরিয়ে রাখতে পারেন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আনার অ্যাপও ব্যবহার করা যেতে পারে। পরীক্ষার সময়ে ফেসবুক বা এ ধরনের অ্যাপ সম্ভব হলে সাময়িকভাবে আন-ইনস্টল করেও রাখতে পারেন।
পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নেই
রাত জেগে পড়ার অভ্যাস অনেকের; কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, পর্যাপ্ত ঘুম স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুমের সময় মস্তিষ্ক সারা দিন শেখা তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে। তাই নিয়মিত সাত থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও নিয়মিত ব্যায়াম
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে শরীরের সুস্থতার ওপর। পর্যাপ্ত পানি পান, পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল, শাক-সবজি, ডিম, মাছ ও বাদাম নিয়মিত খাওয়া মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। এ ছাড়া প্রতিদিন অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। ফলে একাগ্রতাও বাড়ে। অতিরিক্ত উদ্বেগ ও মানসিক চাপ মনোযোগ কমিয়ে দেয়। পরীক্ষার আগে ভয় বা অযথা আতঙ্কিত না হয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা উচিত। প্রয়োজনে কয়েক মিনিট গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, হাঁটাহাঁটি মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মুখস্থ নয়, বুঝুন আর রিভাইস দিন
কোনো বিষয় মুখস্থ না করে আগে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। একটি বিষয় নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করা, অন্য কাউকে শেখানো বা বাস্তব উদাহরণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার মাধ্যমে বিষয়টি দীর্ঘদিন মনে রাখা সহজ হয়। এই পদ্ধতিকে বলা হয় ‘অ্যাক্টিভ লার্নিং’ বা ‘সক্রিয় শেখা’।
একবার পড়লেই সব মনে থাকবে—এটা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। নির্দিষ্ট বিরতিতে রিভাইস বা পুনরায় পড়লে সেই তথ্য বা বিষয়বস্তু দীর্ঘদিন মনে থাকে। একে ‘স্পেসড রিপিটিশন’ বলা হয়, যা আধুনিক শিক্ষা গবেষণায় অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃত।
অগ্রগতি মূল্যায়ন
প্রতিদিনের পড়াশোনা শেষে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ভাবুন—আজ কী শিখলাম, কোথায় দুর্বলতা রয়ে গেল এবং আগামীকাল কী পড়ব। এর মাধ্যমে নিজের অগ্রগতি বোঝা সহজ হয়। নিজের অবস্থার উন্নতি নিজেই শনাক্ত করতে পারলে পড়াশোনায় আত্মবিশ্বাস বাড়বে। আর দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারলে পরীক্ষার আগেই সেই বিষয়ে দুর্বলতা কাটানো যাবে। অর্থাৎ ‘অগ্রগতি মূল্যায়ন’ দুই দিক থেকেই ফলপ্রসূ। অগ্রগতি মূল্যায়নের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে মূল্যায়ন পরীক্ষা বা মডেল টেস্ট। কোনো অধ্যায় পড়ার পর সেই অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নপত্রের আলোকে নিজে নিজে পরীক্ষা দিতে পারেন। অথবা কোনো বিষয়ের সম্পূর্ণ অধ্যায় বা নির্দিষ্ট অধ্যায়ের ওপরও ঘড়ি ধরে পরীক্ষা দিতে পারেন। পরীক্ষা শেষে বই দেখে উত্তর মিলিয়ে দেখুন কোথায় ভুল হয়েছে।