হাবিব তারেক
আকাশের দিকে তাকালে চাঁদকে কখনো বড় মনে হয়, আবার কখনো অনেক ছোট দেখায়। দিগন্তের কাছে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদকে দেখলে মনে হবে বিশাল এক আলোকিত গোলক। অথচ আকাশের অনেক ওপরে উঠলে চাঁদকে তুলনামূলক ছোট মনে হয়। আবার বছরের বিভিন্ন সময়ে পূর্ণিমার চাঁদের আকারেও সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। এখন মনে প্রশ্ন আসতে পারে, চাঁদের আকার কি সত্যিই ছোট-বড় হয়? না, ব্যাপারটি এমন নয়। এর পেছনে আছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম।
দিগন্তে চাঁদ বড় দেখায় কেন
চাঁদ যখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকে, তখন এর চারপাশে থাকে গাছ, বাড়ি, পাহাড় কিংবা স্থলভাগের অন্যান্য বস্তু। এসব পরিচিত বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে আমাদের মস্তিষ্ক চাঁদকে অনেক বড় হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু চাঁদ যখন মাথার ওপর আসে, তখন আশপাশে তুলনা করার মতো কোনো বস্তু থাকে না। ফলে একই আকারের চাঁদকেও তুলনামূলক ছোট মনে হয়। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে ‘মুন ইল্যুশন’ বা চাঁদের দৃষ্টিবিভ্রম নামে অভিহিত করেছেন। মনোবিজ্ঞান ও দৃষ্টিবিজ্ঞানের উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকেই বিষয়টিকে সামনে আনেন। মজার বিষয় হলো, ক্যামেরা দিয়ে দিগন্তের চাঁদ এবং আকাশের ওপরে থাকা চাঁদের ছবি একই জুমে তুললে দেখা যায়—দুই ক্ষেত্রেই চাঁদের প্রকৃত আকার প্রায় একই।
চাঁদ কি সত্যিই বড় হয়
হ্যাঁ, তবে সেই পরিবর্তন খুবই সামান্য এবং এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীকে ঘিরে চাঁদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথ। চাঁদ পৃথিবীকে পুরোপুরি গোলাকার পথে নয়, বরং কিছুটা ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে। ফলে কোনো সময় চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি আসে, আবার কোনো সময় দূরে সরে যায়। যখন চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, তখন তাকে পেরিজি বলা হয়। এ সময় চাঁদের দৃশ্যমান ব্যাস কিছুটা বড় দেখায়। যদি ওই সময় পূর্ণিমা হয়, তাহলে সেটিকে জনপ্রিয়ভাবে ‘সুপারমুন’ বলা হয়। অন্যদিকে যখন চাঁদ পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে, তখন তাকে অ্যাপোজি বলা হয়। এ সময় পূর্ণিমা হলে চাঁদ তুলনামূলক ছোট দেখায়, যাকে অনেকে ‘মাইক্রোমুন’ নামে উল্লেখ করেন। পেরিজি ও অ্যাপোজির কারণে চাঁদের দৃশ্যমান ব্যাসে প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। উজ্জ্বলতার পার্থক্যও প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে খালি চোখে এই পরিবর্তন সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। বায়ুমণ্ডল চাঁদের আলোকে কিছুটা বিকৃত করতে পারে এবং দিগন্তের কাছে চাঁদকে সামান্য চ্যাপ্টা দেখাতে পারে। কিন্তু এটি চাঁদের আকার বড় করে না। বড় দেখার প্রধান কারণ মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম।
পূর্ণিমার চাঁদকেই কেন বড় মনে হয়
পূর্ণিমায় চাঁদের পুরো আলোকিত অংশ পৃথিবী থেকে দেখা যায়। ফলে এটি স্বাভাবিকভাবেই বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় মনে হয়। আবার পূর্ণিমার চাঁদ সাধারণত সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত থেকে ওঠে। তখন দেখার সময় আশপাশে বিভিন্ন স্থলবস্তুর উপস্থিতি থাকে। ফলে এ ক্ষেত্রে দৃষ্টিবিভ্রম আরো বেশি কাজ করে এবং চাঁদকে অস্বাভাবিক বড় মনে হয়।
নিজে নিজে পরীক্ষা
পূর্ণিমার রাতে দিগন্তের কাছে থাকা চাঁদের দিকে একটি চোখ বন্ধ করে বৃদ্ধাঙ্গুলির নখের ডগা ধরুন। কিছুক্ষণ পর চাঁদ যখন অনেক ওপরে উঠবে, তখন একইভাবে আবার তুলনা করুন। দেখবেন, আপনার আঙুলের তুলনায় চাঁদের প্রকৃত আকার প্রায় একই রয়েছে। অথচ খালি চোখে অনেক বড় মনে হচ্ছিল। আরেকটি সহজ উপায় হলো মোবাইল ফোন বা ক্যামেরায় একই জুমে দুটি ছবি তোলা। ছবিগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যাবে, চাঁদের প্রকৃত আকারে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। মূলত পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্বের সামান্য পরিবর্তনের কারণে দৃশ্যমান আকারে বাস্তব পরিবর্তন হয়। এ ছাড়া আমাদের দৃষ্টিবিভ্রমের কারণেও এই সামান্য পরিবর্তনকেই কিছুটা বড় পার্থক্য মনে হয়।





