• ই-পেপার

দুর্ঘটনায় আহত শিক্ষার্থীরা অনুদান পাবে

বিজ্ঞান রহস্য

চাঁদ ছোট-বড় দেখায় কেন?

চাঁদ ছোট-বড় দেখায় কেন?

হাবিব তারেক

আকাশের দিকে তাকালে চাঁদকে কখনো বড় মনে হয়, আবার কখনো অনেক ছোট দেখায়। দিগন্তের কাছে ওঠা পূর্ণিমার চাঁদকে দেখলে মনে হবে বিশাল এক আলোকিত গোলক। অথচ আকাশের অনেক ওপরে উঠলে চাঁদকে তুলনামূলক ছোট মনে হয়। আবার বছরের বিভিন্ন সময়ে পূর্ণিমার চাঁদের আকারেও সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। এখন মনে প্রশ্ন আসতে পারে, চাঁদের আকার কি সত্যিই ছোট-বড় হয়? না, ব্যাপারটি এমন নয়। এর পেছনে আছে জ্যোতির্বিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান ও মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম।

 

দিগন্তে চাঁদ বড় দেখায় কেন

চাঁদ যখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকে, তখন এর চারপাশে থাকে গাছ, বাড়ি, পাহাড় কিংবা স্থলভাগের অন্যান্য বস্তু। এসব পরিচিত বস্তুর সঙ্গে তুলনা করে আমাদের মস্তিষ্ক চাঁদকে অনেক বড় হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু চাঁদ যখন মাথার ওপর আসে, তখন আশপাশে তুলনা করার মতো কোনো বস্তু থাকে না। ফলে একই আকারের চাঁদকেও তুলনামূলক ছোট মনে হয়। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে ‘মুন ইল্যুশন’ বা চাঁদের দৃষ্টিবিভ্রম নামে অভিহিত করেছেন। মনোবিজ্ঞান ও দৃষ্টিবিজ্ঞানের উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকেই বিষয়টিকে সামনে আনেন। মজার বিষয় হলো, ক্যামেরা দিয়ে দিগন্তের চাঁদ এবং আকাশের ওপরে থাকা চাঁদের ছবি একই জুমে তুললে দেখা যায়—দুই ক্ষেত্রেই চাঁদের প্রকৃত আকার প্রায় একই।

 

চাঁদ কি সত্যিই বড় হয়

হ্যাঁ, তবে সেই পরিবর্তন খুবই সামান্য এবং এর পেছনে রয়েছে পৃথিবীকে ঘিরে চাঁদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথ। চাঁদ পৃথিবীকে পুরোপুরি গোলাকার পথে নয়, বরং কিছুটা ডিম্বাকার বা উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করে। ফলে কোনো সময় চাঁদ পৃথিবীর কাছাকাছি আসে, আবার কোনো সময় দূরে সরে যায়। যখন চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে থাকে, তখন তাকে পেরিজি বলা হয়। এ সময় চাঁদের দৃশ্যমান ব্যাস কিছুটা বড় দেখায়। যদি ওই সময় পূর্ণিমা হয়, তাহলে সেটিকে জনপ্রিয়ভাবে ‘সুপারমুন’ বলা হয়। অন্যদিকে যখন চাঁদ পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করে, তখন তাকে অ্যাপোজি বলা হয়। এ সময় পূর্ণিমা হলে চাঁদ তুলনামূলক ছোট দেখায়, যাকে অনেকে ‘মাইক্রোমুন’ নামে উল্লেখ করেন। পেরিজি ও অ্যাপোজির কারণে চাঁদের দৃশ্যমান ব্যাসে প্রায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পার্থক্য হতে পারে। উজ্জ্বলতার পার্থক্যও প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে খালি চোখে এই পরিবর্তন সব সময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। বায়ুমণ্ডল চাঁদের আলোকে কিছুটা বিকৃত করতে পারে এবং দিগন্তের কাছে চাঁদকে সামান্য চ্যাপ্টা দেখাতে পারে। কিন্তু এটি চাঁদের আকার বড় করে না। বড় দেখার প্রধান কারণ মানুষের দৃষ্টিবিভ্রম।

 

পূর্ণিমার চাঁদকেই কেন বড় মনে হয়

পূর্ণিমায় চাঁদের পুরো আলোকিত অংশ পৃথিবী থেকে দেখা যায়। ফলে এটি স্বাভাবিকভাবেই বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় মনে হয়। আবার পূর্ণিমার চাঁদ সাধারণত সূর্যাস্তের সময় দিগন্ত থেকে ওঠে। তখন দেখার সময় আশপাশে বিভিন্ন স্থলবস্তুর উপস্থিতি থাকে। ফলে এ ক্ষেত্রে দৃষ্টিবিভ্রম আরো বেশি কাজ করে এবং চাঁদকে অস্বাভাবিক বড় মনে হয়।

 

নিজে নিজে পরীক্ষা

পূর্ণিমার রাতে দিগন্তের কাছে থাকা চাঁদের দিকে একটি চোখ বন্ধ করে বৃদ্ধাঙ্গুলির নখের ডগা ধরুন। কিছুক্ষণ পর চাঁদ যখন অনেক ওপরে উঠবে, তখন একইভাবে আবার তুলনা করুন। দেখবেন, আপনার আঙুলের তুলনায় চাঁদের প্রকৃত আকার প্রায় একই রয়েছে। অথচ খালি চোখে অনেক বড় মনে হচ্ছিল। আরেকটি সহজ উপায় হলো মোবাইল ফোন বা ক্যামেরায় একই জুমে দুটি ছবি তোলা। ছবিগুলো পাশাপাশি রাখলে বোঝা যাবে, চাঁদের প্রকৃত আকারে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। মূলত পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্বের সামান্য পরিবর্তনের কারণে দৃশ্যমান আকারে বাস্তব পরিবর্তন হয়। এ ছাড়া আমাদের দৃষ্টিবিভ্রমের কারণেও এই সামান্য পরিবর্তনকেই কিছুটা বড় পার্থক্য মনে হয়।

 

 

দ্য ক্যাডাভার সোসাইটি

আল সানি
দ্য ক্যাডাভার সোসাইটি

মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বা ডিসেকশন হলগুলোর পরিবেশ সাধারণ মানুষের কাছে সব সময়ই একটু গা-ছমছমে। সারি সারি ফরমালিনে ভেজানো মানুষের মরদেহ, চারদিকে ঝাঁজালো গন্ধ আর তার মধ্যেই অ্যানাটমির জটিল তত্ত্ব বোঝার চেষ্টায় মগ্ন থাকে হবু ডাক্তাররা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের পাতা ওল্টালে এই লাশ কাটা ঘরের আড়ালেই উঁকি দেয় এক রোমাঞ্চকর, রহস্যময় এবং কিছুটা ভীতি-জাগানিয়া নাম—দ্য ক্যাডাভার সোসাইটি। আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী ওয়াশিংটন অ্যান্ড লি ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে প্রথম গড়ে ওঠে এই গুপ্ত সংঘ বা ‘সিক্রেট সোসাইটি’। বিষয়টি নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে প্রচলিত আছে এক রূদ্ধশ্বাস ও গা-ছমছমে ইতিহাস। তবে সেই লোককথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আসল সত্যটা জানলে যে কেউ চমকে উঠবে। প্রচলিত আছে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের মানবদেহের ব্যবচ্ছেদ বা ‘ডিসেকশন’ শেখার জন্য প্রয়োজনীয় মৃতদেহের (ক্যাডাভার) সংকট দেখা দিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সামাজিক বিধি-নিষেধের কারণে গবেষণার জন্য মানুষের মৃতদেহ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। সাধারণত ফাঁসি হওয়া কয়েদিদের লাশ মেডিক্যাল কলেজগুলোকে দেওয়া হতো, যা প্রয়োজনের তুলনায় ছিল একেবারেই সামান্য। এমন চরম সংকট থেকেই জন্ম নেয় ক্যাডাভার সোসাইটি। লোকমুখে শোনা যায়, এর সদস্যরা ছিল মূলত মেডিক্যাল শিক্ষার্থী এবং অ্যানাটমি বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসাশাস্ত্রকে এগিয়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত ও মরিয়া তাড়না থেকেই তারা রাতের অন্ধকারে নতুন কবর খুঁড়ে কিংবা বেওয়ারিশ লাশ চুরি করে মেডিক্যাল কলেজের ডিসেকশন টেবিলে পৌঁছে দিত। সমাজ ও আইনের চোখে এটি জঘন্য অপরাধ। যদিও এর বিপরীত তথ্যও পাওয়া যায় বিভিন্ন বইপত্র ও নথিতে। কারো কারো মতে, ওয়াশিংটন অ্যান্ড লি ইউনিভার্সিটির এই ক্যাডাভার সোসাইটি আসলে গঠিত হয়েছিল ১৯৫৭ সালে (কোনো কোনো সূত্রে ১৯১৬ সালের কথাও বলা হয়)। এই সংঘের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অনেকে মানতে নারাজ। তাঁদের যুক্তি, বিংশ শতাব্দীতে এমন কোনো কাজের দরকারই ছিল না। তাহলে কেন ক্যাম্পাসজুড়ে তাদের নিয়ে এমন গা শিউরে ওঠা গল্প ছড়িয়ে পড়ল? এর মূল কারণ ছিল সংগঠনটির কঠোর গোপনীয়তা ও অদ্ভুত প্রতীক। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী বা শিক্ষকরাও জানতেন না এই সোসাইটির আসল সদস্যদের পরিচয়। গভীর রাতে যখন পুরো ক্যাম্পাস ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত, তখনই শুরু হতো তাদের কার্যক্রম। বলা হয়ে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটির নিচে থাকা প্রাচীন সুড়ঙ্গপথ বা গোপন টানেল ব্যবহার করে তারা গভীর রাতে ক্যাম্পাসে চলাফেরা করত, যাতে কেউ তাদের দেখে না ফেলে। আজও সেই ক্যাম্পাসের দেয়ালে, শতাব্দীপ্রাচীন ভবনের কোনায় কিংবা কোনো গোপন নথির ভাঁজে মাঝে মাঝে তাদের প্রতীকচিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। গভীর রাতে রহস্যময় চলাফেরার কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই গল্প ছড়িয়ে পড়ে। আজকের দিনেও ওয়াশিংটন অ্যান্ড লি ইউনিভার্সিটিতে এই ক্যাডাভার সোসাইটি একটি সুপরিচিত কিন্তু রহস্যময় পরোপকারী সংগঠন হিসেবেই টিকে আছে। সমাজকল্যাণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে তারা নিয়োজিত। বর্তমানে এই সোসাইটির মূল কাজ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে, গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তিতে কিংবা ক্যাম্পাসের জরুরি প্রয়োজনে গোপনে বিশাল অঙ্কের অর্থ অনুদান দেওয়া। তবে তাদের দেওয়ার এই তরিকাটি আজও সেই আগের মতোই রহস্যে ঘেরা। গভীর রাতে কালো পোশাক ও মাস্ক পরে এসে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট দপ্তরে অনুদানের খাম রেখে যায়। আর সেই খামের ওপর সিলমোহর হিসেবে আঁকা থাকে শতাব্দীপ্রাচীন প্রতীক। কে বা কারা এই টাকা দিয়ে গেল—এর কোনো রসিদ থাকে না, থাকে না দাতার নাম-ঠিকানা।

 

 

 

 

শিক্ষা সংবাদ

রোবোকাপ রেসকিউ লিগে ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিমের সাফল্য

রোবোকাপ রেসকিউ লিগে ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিমের সাফল্য

রোবোকাপ রেসকিউ লিগে (২০২৬) প্রথমবার অংশ নিয়েই উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে  ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ) সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবটিকসের (সিএআইআর) অধীনে পরিচালিত ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিম (ইউআরআরটি)। কোরিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব এআই রোবট ইন্ডাস্ট্রি (কেএআর) এবং ইনচন টেকনোপার্কের (আইটিপি) আয়োজনে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতা গত ২ থেকে ৬ জুলাই দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রেসকিউ রোবটিকস দল, খ্যাতনামা গবেষণাগার এবং শিল্প খাতের রোবটিকস প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিম অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। স্বায়ত্তশাসিত রেসকিউ রোবটিকসের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নবাগত ৯টি দলের মধ্যে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় স্থান, ট্র্যাকড রোবট ক্যাটাগরিতে ১১তম স্থান এবং অংশগ্রহণকারী ২৭টি আন্তর্জাতিক দলের মধ্যে সামগ্রিকভাবে ১৫তম স্থান অর্জন করে ইউআরআরটি। এবারের প্রতিযোগিতায় জার্মানি, জাপান, অস্ট্রিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, মেক্সিকো, চীন, থাইল্যান্ড, কলম্বিয়া, উরুগুয়েসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বনামধন্য দল অংশ নিয়েছে। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইউআইইউ দল তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে মূল্যায়নের সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বের খ্যাতনামা গবেষক, প্রকৌশলী এবং শিল্প বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে উন্নত রেসকিউ রোবটিকস প্রযুক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইউআইইউ রেসকিউ রোভার টিমের সদস্য নাজমুল হাসান আথিন প্রতিযোগিতার প্লেনারি রাউন্ডে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রেসকিউ রোবটিকস গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিচারক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে দলটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কারিগরি সক্ষমতা ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ রেখেছে। দলের সদস্যরা জানান, তাঁদের মূল লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগিতায় ভালো অবস্থান অর্জন নয়, বরং বিশ্বের সেরা রেসকিউ রোবটিকস বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে শেখা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের প্রযুক্তিকে যাচাই করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আরো উন্নত ও বুদ্ধিমান রেসকিউ রোবট তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করা। এ ছাড়া তাঁরা এই আন্তর্জাতিক অর্জনের জন্য ইউআইইউর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং উপদেষ্টা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, পৃষ্ঠপোষক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শুভানুধ্যায়ী ও সব সমর্থকের অব্যাহত সহযোগিতা, দিকনির্দেশনা এবং উৎসাহের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।

 

 

কানাডায় উচ্চশিক্ষার এটুজেড

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য কানাডা। তবে দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন, তহবিলের ব্যবস্থা, আবেদনপ্রক্রিয়া, স্টাডি পারমিট পাওয়াসহ বিভিন্ন ধাপে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। দেশটিতে উচ্চশিক্ষার প্রক্রিয়া ও করণীয় নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার পিএইচডি গবেষক মো. জয়নাল আবেদিন

কানাডায় উচ্চশিক্ষার এটুজেড
ছবি : সংগৃহীত

কেন কানাডা

উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, নিরাপদ জীবনযাত্রা এবং পড়াশোনা শেষে কাজ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কানাডা। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, ব্যবসা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করছে। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব অটোয়াসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে রয়েছে; বিশেষ করে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা অনুদান, বৃত্তি, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ), রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ), ফেলোশিপ ও মাসিক ভাতার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। বেশির ভাগ পিএইচডি প্রোগ্রামে ফুল ফান্ডিং সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া পড়াশোনা শেষে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর) হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়।

কানাডায় উচ্চশিক্ষার এটুজেড

প্রোগ্রাম বাছাই

কানাডায় মাস্টার্স সাধারণত দুই ধরনের—কোর্সভিত্তিক ও গবেষণাভিত্তিক (থিসিসভিত্তিক)।

কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স মূলত পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স গবেষণামূলক পেশায় আগ্রহীদের জন্য বেশি উপযোগী। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যাঁদের পিএইচডি করার লক্ষ্য, তাঁরাও গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্সে আগ্রহ দেখান। পিএইচডি সম্পূর্ণ গবেষণানির্ভর একটি ডিগ্রি। এখানে শিক্ষার্থীকে একজন সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট বিষয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা গবেষণাগত অবদান রাখতে হয়। গবেষণাপত্র প্রকাশও এই পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন

সফল ভর্তি ও স্টাডি পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু র‌্যাংকিং নয়; গবেষণার বিষয়, সুপারভাইজারের প্রাপ্যতা, অর্থায়নের সুযোগ, টিউশন ফি, অবস্থান, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে পিআর অর্জনের সুযোগ বিবেচনা করা উচিত। পিএইচডির ক্ষেত্রে সুপারভাইজারের সঙ্গে গবেষণার আগ্রহের মিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের গবেষণাকর্ম পর্যালোচনা করে সংক্ষিপ্ত ও পেশাদার ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা ভালো। এ ছাড়া অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটি কানাডার অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ডেজিগনেটেড লার্নিং ইনস্টিটিউশন বা ডিএলআই) কি না। তা না হলে স্টাডি পারমিট পাওয়া সম্ভব হবে না।

ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

কানাডার বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি আবেদনের জন্য সাধারণত যেসব কাগজপত্র বা নথির দরকার হয়—

♦ একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট

♦ ডিগ্রি সনদ

♦ আইইএলটিএস, টোফেল অথবা

ডুওলিঙ্গো পরীক্ষার ফল

♦ স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি)

♦ গবেষণা প্রস্তাব (বিশেষত পিএইচডির জন্য)

♦ সুপারিশপত্র

♦ জীবনবৃত্তান্ত

♦ পাসপোর্ট

♦ গবেষণাপত্র বা রাইটিং স্যাম্পল (প্রযোজ্য হলে)

♦ চাকরির অভিজ্ঞতার সনদ (প্রযোজ্য হলে)।

 

এসওপি লেখার সময় নিজের শিক্ষাগত পটভূমি, গবেষণার আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কেন কানাডাকে বেছে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।

অর্থায়ন ও বৃত্তির সুযোগ
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে মাস্টার্সের বার্ষিক টিউশন ফি সাধারণত ১৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কানাডিয়ান ডলারের মধ্যে হতে পারে। অন্যদিকে বেশির ভাগ গবেষণাভিত্তিক পিএইচডি কর্মসূচি ফুল ফান্ডেড। ফান্ড বা অর্থায়নের উৎসগুলোর মধ্যে আছে—

♦ ভর্তি বৃত্তি

♦ গ্র্যাজুয়েট বৃত্তি

♦ টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ

♦ রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ

♦ ফেলোশিপ।

সুপারভাইজারের গবেষণা অনুদান

স্টাডি পারমিটের জন্য টিউশন ফির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের সক্ষমতার প্রমাণও দেখাতে হয়। তাই পর্যাপ্ত ব্যাংক সঞ্চয়, আয়ের উৎস এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রমাণ প্রস্তুত রাখা জরুরি।

ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর করণীয়

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে তা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় টিউশন ফি জমা দিতে হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেটার অব অ্যাকসেপট্যান্স (এলওএ) দেওয়া হয়। স্টাডি পারমিট আবেদনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।

আরো যা যা দরকার—

♦ পাসপোর্টের মেয়াদ যাচাই

♦ আর্থিক নথি প্রস্তুত

♦ মেডিক্যাল পরীক্ষা

♦ বায়োমেট্রিকের প্রস্তুতি

♦ স্টাডি প্ল্যান বা ভিসার জন্য এসওপি তৈরি।

স্টাডি পারমিটের আবেদনের ধাপ

বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পড়তে যেতে হলে স্টাডি পারমিটের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হয়।

আবেদনের ধাপগুলো হলো—

♦ আইআরসিসি অ্যাকাউন্ট তৈরি

♦ যোগ্যতা যাচাই

♦ প্রয়োজনীয় নথি আপলোড

♦ আবেদন ফি প্রদান

♦ বায়োমেট্রিক নির্দেশনা গ্রহণ

♦ বায়োমেট্রিক সম্পন্ন

♦ মেডিক্যাল পরীক্ষা

♦ আবেদন মূল্যায়ন

♦ পাসপোর্ট জমার নির্দেশনা

♦ ভিসা অনুমোদন।

স্টাডি প্ল্যানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে কেন এই বিষয়, কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা কী। পড়াশোনা শেষে এই দেশে থাকবেন কি না, কেন থাকবেন—এ বিষয়গুলোও স্পষ্ট করতে হবে।

বায়োমেট্রিক, মেডিক্যাল ও ভিসা অনুমোদন

স্টাডি পারমিট আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদনকারীকে বায়োমেট্রিক দিতে হয়। এরপর আইআরসিসি অনুমোদিত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। ভিসা অনুমোদিত হলে পাসপোর্টে ভিসা সংযুক্ত করা হয় এবং পোর্ট অব এন্ট্রি লেটার অব ইন্ট্রোডাকশন দেওয়া হয়। কানাডায় পৌঁছার পর অভিবাসন কর্মকর্তা চূড়ান্ত স্টাডি পারমিট ইস্যু করেন।

কানাডায় পৌঁছার পর

কানাডায় পৌঁছার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। এ সময় করণীয়—

♦ সোশ্যাল ইনস্যুরেন্স নম্বর সংগ্রহ করা

♦ ব্যাংক হিসাব খোলা

♦ স্বাস্থ্য বীমা সক্রিয় করা

♦ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা

♦ শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা।

 

মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গবেষণাগার, সম্মেলন এবং একাডেমিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়াও জরুরি।

পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান ও পিআর

কানাডায় মাস্টার্স বা পিএইচডি সম্পন্ন করার পর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। পরবর্তী সময়ে এক্সপ্রেস এন্ট্রি, প্রভিনশিয়াল নমিনি প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন অভিবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, টেকসই উন্নয়ন, জননীতি, শিক্ষা প্রযুক্তি, ব্যবসা বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক, নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজেরও বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে।

সব মিলিয়ে কানাডায় মাস্টার্স বা পিএইচডি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, বৈশ্বিক কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যথাযথ পরিকল্পনা, মানসম্মত আবেদনপত্র, গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় নির্বাচন, পর্যাপ্ত আর্থিক প্রস্তুতি এবং সঠিক নথিপত্র থাকলে কানাডায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।