কেন কানাডা
উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়, নিরাপদ জীবনযাত্রা এবং পড়াশোনা শেষে কাজ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কানাডা। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, ব্যবসা, স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাম অর্জন করছে। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব অটোয়াসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে শীর্ষে রয়েছে; বিশেষ করে মাস্টার্স ও পিএইচডি পর্যায়ে গবেষণা অনুদান, বৃত্তি, টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (টিএ), রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ (আরএ), ফেলোশিপ ও মাসিক ভাতার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। বেশির ভাগ পিএইচডি প্রোগ্রামে ফুল ফান্ডিং সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া পড়াশোনা শেষে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে এক থেকে তিন বছর পর্যন্ত কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে স্থায়ী বাসিন্দা (পিআর) হওয়ারও সুযোগ তৈরি হয়।

প্রোগ্রাম বাছাই
কানাডায় মাস্টার্স সাধারণত দুই ধরনের—কোর্সভিত্তিক ও গবেষণাভিত্তিক (থিসিসভিত্তিক)।
কোর্সভিত্তিক মাস্টার্স মূলত পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী। অন্যদিকে গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্স গবেষণামূলক পেশায় আগ্রহীদের জন্য বেশি উপযোগী। এ ছাড়া ভবিষ্যতে যাঁদের পিএইচডি করার লক্ষ্য, তাঁরাও গবেষণাভিত্তিক মাস্টার্সে আগ্রহ দেখান। পিএইচডি সম্পূর্ণ গবেষণানির্ভর একটি ডিগ্রি। এখানে শিক্ষার্থীকে একজন সুপারভাইজারের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট বিষয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা গবেষণাগত অবদান রাখতে হয়। গবেষণাপত্র প্রকাশও এই পর্যায়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন
সফল ভর্তি ও স্টাডি পারমিট পাওয়ার ক্ষেত্রে সঠিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু র্যাংকিং নয়; গবেষণার বিষয়, সুপারভাইজারের প্রাপ্যতা, অর্থায়নের সুযোগ, টিউশন ফি, অবস্থান, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে পিআর অর্জনের সুযোগ বিবেচনা করা উচিত। পিএইচডির ক্ষেত্রে সুপারভাইজারের সঙ্গে গবেষণার আগ্রহের মিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট অধ্যাপকের গবেষণাকর্ম পর্যালোচনা করে সংক্ষিপ্ত ও পেশাদার ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা ভালো। এ ছাড়া অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানটি কানাডার অনুমোদিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (ডেজিগনেটেড লার্নিং ইনস্টিটিউশন বা ডিএলআই) কি না। তা না হলে স্টাডি পারমিট পাওয়া সম্ভব হবে না।
ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
কানাডার বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ও পিএইচডি আবেদনের জন্য সাধারণত যেসব কাগজপত্র বা নথির দরকার হয়—
♦ একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট
♦ ডিগ্রি সনদ
♦ আইইএলটিএস, টোফেল অথবা
ডুওলিঙ্গো পরীক্ষার ফল
♦ স্টেটমেন্ট অব পারপাস (এসওপি)
♦ গবেষণা প্রস্তাব (বিশেষত পিএইচডির জন্য)
♦ সুপারিশপত্র
♦ জীবনবৃত্তান্ত
♦ পাসপোর্ট
♦ গবেষণাপত্র বা রাইটিং স্যাম্পল (প্রযোজ্য হলে)
♦ চাকরির অভিজ্ঞতার সনদ (প্রযোজ্য হলে)।
এসওপি লেখার সময় নিজের শিক্ষাগত পটভূমি, গবেষণার আগ্রহ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কেন কানাডাকে বেছে নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরা জরুরি।
অর্থায়ন ও বৃত্তির সুযোগ
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক পরিকল্পনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভেদে মাস্টার্সের বার্ষিক টিউশন ফি সাধারণত ১৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার কানাডিয়ান ডলারের মধ্যে হতে পারে। অন্যদিকে বেশির ভাগ গবেষণাভিত্তিক পিএইচডি কর্মসূচি ফুল ফান্ডেড। ফান্ড বা অর্থায়নের উৎসগুলোর মধ্যে আছে—
♦ ভর্তি বৃত্তি
♦ গ্র্যাজুয়েট বৃত্তি
♦ টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ
♦ রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ
♦ ফেলোশিপ।
সুপারভাইজারের গবেষণা অনুদান
স্টাডি পারমিটের জন্য টিউশন ফির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বহনের সক্ষমতার প্রমাণও দেখাতে হয়। তাই পর্যাপ্ত ব্যাংক সঞ্চয়, আয়ের উৎস এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার প্রমাণ প্রস্তুত রাখা জরুরি।
ভর্তি নিশ্চিত হওয়ার পর করণীয়
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ে তা গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় টিউশন ফি জমা দিতে হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেটার অব অ্যাকসেপট্যান্স (এলওএ) দেওয়া হয়। স্টাডি পারমিট আবেদনের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ নথি।
আরো যা যা দরকার—
♦ পাসপোর্টের মেয়াদ যাচাই
♦ আর্থিক নথি প্রস্তুত
♦ মেডিক্যাল পরীক্ষা
♦ বায়োমেট্রিকের প্রস্তুতি
♦ স্টাডি প্ল্যান বা ভিসার জন্য এসওপি তৈরি।
স্টাডি পারমিটের আবেদনের ধাপ
বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পড়তে যেতে হলে স্টাডি পারমিটের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হয়।
আবেদনের ধাপগুলো হলো—
♦ আইআরসিসি অ্যাকাউন্ট তৈরি
♦ যোগ্যতা যাচাই
♦ প্রয়োজনীয় নথি আপলোড
♦ আবেদন ফি প্রদান
♦ বায়োমেট্রিক নির্দেশনা গ্রহণ
♦ বায়োমেট্রিক সম্পন্ন
♦ মেডিক্যাল পরীক্ষা
♦ আবেদন মূল্যায়ন
♦ পাসপোর্ট জমার নির্দেশনা
♦ ভিসা অনুমোদন।
স্টাডি প্ল্যানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে কেন এই বিষয়, কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা কী। পড়াশোনা শেষে এই দেশে থাকবেন কি না, কেন থাকবেন—এ বিষয়গুলোও স্পষ্ট করতে হবে।
বায়োমেট্রিক, মেডিক্যাল ও ভিসা অনুমোদন
স্টাডি পারমিট আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদনকারীকে বায়োমেট্রিক দিতে হয়। এরপর আইআরসিসি অনুমোদিত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হয়। ভিসা অনুমোদিত হলে পাসপোর্টে ভিসা সংযুক্ত করা হয় এবং পোর্ট অব এন্ট্রি লেটার অব ইন্ট্রোডাকশন দেওয়া হয়। কানাডায় পৌঁছার পর অভিবাসন কর্মকর্তা চূড়ান্ত স্টাডি পারমিট ইস্যু করেন।
কানাডায় পৌঁছার পর
কানাডায় পৌঁছার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হয়। এ সময় করণীয়—
♦ সোশ্যাল ইনস্যুরেন্স নম্বর সংগ্রহ করা
♦ ব্যাংক হিসাব খোলা
♦ স্বাস্থ্য বীমা সক্রিয় করা
♦ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করা
♦ শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা।
মাস্টার্স ও পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে গবেষণাগার, সম্মেলন এবং একাডেমিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়াও জরুরি।
পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান ও পিআর
কানাডায় মাস্টার্স বা পিএইচডি সম্পন্ন করার পর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের মাধ্যমে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। পরবর্তী সময়ে এক্সপ্রেস এন্ট্রি, প্রভিনশিয়াল নমিনি প্রোগ্রামসহ বিভিন্ন অভিবাসন কর্মসূচির মাধ্যমে স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমানে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, স্বাস্থ্যসেবা, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, টেকসই উন্নয়ন, জননীতি, শিক্ষা প্রযুক্তি, ব্যবসা বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক বিজ্ঞানের গবেষক, নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে কাজেরও বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে কানাডায় মাস্টার্স বা পিএইচডি শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, বৈশ্বিক কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নয়নের একটি শক্তিশালী ভিত্তি। যথাযথ পরিকল্পনা, মানসম্মত আবেদনপত্র, গবেষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয় নির্বাচন, পর্যাপ্ত আর্থিক প্রস্তুতি এবং সঠিক নথিপত্র থাকলে কানাডায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেকটাই বেড়ে যায়।