• ই-পেপার

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ

  • সালেক খোকন

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ

মাহবুব হাসান

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ
শরণার্থী শিবিরে এক অসহায় মা । ছবি : রঘু রাই

রণাঙ্গন থেকে ফিরছি টাঙ্গাইল শহরের দিকে। হেঁটে। আমি সেদিন ছিলাম ধলাপাড়ায়। সেই ধলাপাড়া থেকে আমি আর আমার সঙ্গে ছিল আমার ভাগ্নে রফিক এবং দেওপাড়ার রিয়াজ কমান্ডারের তিনজন। তাদের হাতে ছিল একটি ব্রিটিশ এলএমজি ও এসএমজি। ধলাপাড়ার গায়ে লাগানো বংশী নদী পার হলে যে সড়কটি চলে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কালিহাতী থানায়, সামনে গা-ছমছম করা দেওহাটা জঙ্গল, অ্যামবুশ করার জন্য খুব উপযুক্ত, সেটা এড়ানোর জন্য ওই পথে গেলাম না। আমরা ধরলাম আরেকটি পাহাড়ি হালট, যেটা গেছে মধুপুরের দিকে, প্যাচার আটা হয়ে। কিন্তু মধুপুরের দিকেও যাব না। আমরা সরাসরি ঘাটাইল থানাবাড়িতে যাব ঠিক করলাম। ওই পথই ছিল আমাদের জন্য নিরাপদ। কেননা ওই পথ আমার চেনা। আমার মামার বাড়ি হাজিপুর, তাই চেনা এলাকা আমার।

হঠাৎই একটি গাড়ির ধেয়ে আসার শব্দে সচকিত হয়ে পেছনে তাকালাম। ড্রাইভার আমাদের পোশাক দেখেই গাড়ি থামাল। জিজ্ঞেস করল আমরা লতিফ সিদ্দিকীকে দেখেছি কি না। আমরা খবর জানতাম যে লতিফ সিদ্দিকী হেঁটেই রওনা হয়েছেন টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য। গাড়িটা এসেছিল লতিফ সিদ্দিকীকে নেওয়ার জন্য। টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে গতকাল ১১ ডিসেম্বর, আমরাও রওনা হয়েছি হেঁটে। জিপের ড্রাইভার বলল, গাড়িতে আসেন। আমরা সবাই উঠলাম। গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর বিগড়ে গেল। সময় তখন পড়ন্ত বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও স্টার্ট দিতে ব্যর্থ হলে আবারও হাঁটতে থাকলাম আমরা। কিন্তু সেই পাহাড়ি রাস্তায় কত আর হাঁটা যায়? এর মধ্যেই খবর এলো, কিছু পাকিস্তানি আসছে। আমরা অ্যামবুশ করলাম। কিছুক্ষণ পর ধানি ক্ষেতের ওপারে গাছপালার ভেতর দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছে একদল পাকিস্তানি সৈনিক। আমাদের সৈনিকদের একজন এলএমজি দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করল। ওপাশ থেকেও একঝাঁক গুলি উড়ে এলো। আমরা গাছের গুঁড়ির আড়ালে, তাই কোনো অঘটন ঘটল না। আমরা গুলি করতে বারণ করলাম। ওরা চলে গেল। পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জিরালাম। ঘণ্টাখানেক পর আবার রওনা হলাম। রাত ১০টার দিকে আমরা পৌঁছলাম ঘাটাইল থানায়। সেখানে পেলাম হেডকোয়ার্টার্সের কম্পানি কমান্ডার খোরশেদকে। তিনি  এক যুদ্ধে গুলি খেয়ে অনেকটাই অসুস্থ ছিলেন। সে কারণে তিনি হেডকোয়ার্টার্সে পোস্টিং পেয়েছিলেন। তিনি ঘাটাইল থানার দায়িত্ব পেয়েছিলেন আগের দিনই। রাত ১১টার দিকে ঝোড়ো বেগে জিপ চালিয়ে এলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বললেনচলো।

আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইল শহরে।

২.

টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে ১১ ডিসেম্বর। ওই দিনই ইন্ডিয়ান ছত্রীসেনারা যুদ্ধবিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে নামেন। তাঁরা প্যারাট্রুপার। তখন মনে হয়েছে অগণন তারা। পরের দিনই দেখলাম, এলেন কর্নেল শ্যাম সিং বাবাজি। তার পরের দিন এলেন জেনারেল অরোরা। সার্কিট হাউসে বসে তাঁরা প্ল্যান করলেন। বািচত হিন্দিতে হচ্ছে, তাই বুঝতে পারছিলাম না। যদিও হেডকোয়ার্টার্সের মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের পজিশন বেশ ওপরে ছিল। আমরা অনায়াসেই ওই প্ল্যানের অংশীদার হলাম। কাদের সিদ্দিকীই প্ল্যানের মূল হোতা, তিনি মিরপুরের আমিনবাজারের লোহার ব্রিজের কথা বলছিলেন।

 জেনারেল অরোরা, কর্নেল বাবাজি এবং আরো ভারতীয় উচ্চপদস্থ সেনারা সামনে, আমরা পেছনের সামরিক যানে উঠেছি। মিরপুরের লোহার পুলের কাছে ওরা যেতে পারলেন, আমরা পেছনেই পড়ে রইলাম। আমিনবাজারের লোহার পুলে পাকিস্তানিরা ছিল না। ওখান থেকেই ওয়্যারলেসে কথা বলছিলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় জেনারেল। ঠিক হয়েছিল কোথায় আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হবে। রেসকোর্সে করা হয়েছিল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার আয়োজন। তা-ই হলো। কিন্তু না কাদের সিদ্দিকী, না মেজর জিয়া, না এ কে খন্দকার, না মেজর এ টি এম হায়দার, না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানিকাউকেই সেই টেবিলে ডাকা হয়নি সেদিন। অথচ কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে করে বেসামরিক পোশাকে এ কে খন্দকারকে আনা হয়েছিল। আগরতলা বা সিলেটের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ওসমানীকে আনা হয়নি। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকেই টেবিলের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। শুধু পাকিস্তানি জেনারেল ও ভারতীয় জেনারেল বসে স্বাক্ষর করলেন।

৪.

যুদ্ধটা আমরাই শুরু করেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের লক্ষ্যে; সেই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য। কেননা, মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন থেকে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের নাইটাপাড়ায় মুক্তিসেনাদের প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা। আমাদের অপটু যোদ্ধারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি বটে, তবে আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুর্বার বাসনা জাগিয়েছিল ওই নাইটাপাড়ার যুদ্ধ।

আমরা পাহাড়ি এলাকায় সংগঠিত হলাম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাঁরা ইপিআর ও সেনা সদস্য ছিলেন, সঙ্গে কাদের সিদ্দিকী ও খন্দকার ফজলুর রহমান (ব্রিগেডিয়ার ফজলু) ট্রেইনার হিসেবে বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁদের ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সৈনিকজীবনের ট্রেনিং। নাম না-জানা আরো সৈনিক ছিলেন, যাঁরা কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছিলেন ঝনঝনিয়া গ্রামের লাল্টু। তিনিও সেনাবাহিনীতে ছিলেন আর ওই গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার রহম, ছিলেন দেওপাড়ার রিয়াজতাঁরা কম্পানি কমান্ডার পদে আসীন ছিলেন।

আর মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল একেবারে তরুণপ্রাণ স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছাত্র আর চাষারা। আর ছিল কোটি কোটি উৎপাদক মানুষের সমর্থন। ছাত্র-শিক্ষক-কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ, যারা চেয়েছিল মুক্ত হতে শাসন ও শোষণের নাগপাশ থেকে।

৫.

জনযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনের নিগড় থেকে, শোষণের জাঁতাকল থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তির রাজপথের নাম গণতন্ত্র। ওই গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। ধর্ষিত হয়েছে হাজার হাজার মা-বোন-জায়া। তাদের জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তার লক্ষ্য কি পূরিত হয়েছে গত ৫৪ বছরে?

এর একটাই উত্তরনা, হয়নি।

কেন হয়নি?

শেখ মুজিবের মতো একজন নিরলস রাজনৈতিক নেতা, যিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি কেন বিজয় অর্জনের পর ক্ষমতায় বসলেন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের সৃষ্ট ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের শৃঙ্খল প্রশাসনে? ওই প্রশাসন ব্যবস্থায় তো গণতান্ত্রিক শাসনের ছোঁয়াও ছিল না। সেটা কি তিনি বুঝতে পারেননি?

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

আজ ১৬ ডিসেম্বর জাতি আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে ৫৫তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে। বিজয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে অনেক কথাই স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন আমরা মুক্তিযুুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এলাম। একটি জাতির জীবনে অর্ধশতাব্দী কম সময় নয়। এই সময় দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আমাদের সবার জানা। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করি। ওই বছরের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং একই বছর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। তাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস অত্যন্ত আনন্দের এবং উল্লাসের। প্রতিবছর দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমরা এই দিনের তাৎপর্য নতুনভাবে অনুভব করার চেষ্টা করি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ঘটনাবহুল বিজয় দিবসের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

১৯৭১ সালে যখন দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক। মাত্র কয়েক বছর আগেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়েছি। অসেহযোগ আন্দোলনের কারণে সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ ছিল। আমি ঢাকা ছেড়ে নিজ শহর ফেনীতে চলে যাই। মার্চ মাসের ২৫ তারিখ রাতির বেলা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে।

এমন এক অবস্থায় ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা ভেসে আসে। দিশাহারা জাতি যেন দিকনির্দেশনা খুঁজে পায়। মেজর জিয়ার সেই দিনের স্বাধীনতার ঘোষণা আমার মনে কী যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল, তা এখন বলে বোঝানো যাবে না। আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যেকোনো মূল্যেই হোক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং সব শিক্ষককে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে আমি ঢাকা এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ কর্মস্থলে যোগদান করি। কিন্তু এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি ফেনী শহরে চলে যাই এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি ভারতে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেছি।

ভারতে অবস্থানকালে আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক থেকেই যুদ্ধের ফলাফলের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় এবং পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি বিজয় অতি সন্নিকটে। ১৬ ডিসেম্বর আমরা রেডিও মারফত পাকি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ জানতে পারি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রেডিওতে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ঢাকা এখন মুক্ত এবং স্বাধীন দেশের রাজধানী। রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয় এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ শুনে সেদিন কী যে খুশি হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পাশের মিষ্টির দোকানে গিয়ে কয়েক প্যাকেট মিষ্টি কিনে আস্তানায় ফিরে আসি। তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমরা সত্যি সত্যি স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মিষ্টি নিয়ে আমার আবাসস্থল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে গিয়ে এর বাসিন্দাদের মধ্যে বিতরণ করি। পরে আরো কয়েক প্যাকেট মিষ্টি কিনে বউবাজারে বিকাশদা ও ধ্রুবদার মেসে উপস্থিত হই। সবাই মিলে আনন্দ করে মিষ্টি খাই। এ সময় কেউ কেউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে থাকে। রাতের বেলাই আমাদের অনেক শরণার্থী শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিই। ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারিনি। কারণ যে চাকরিতে নিয়োজিত ছিলাম, সেখান থেকে রিলিজ নিয়ে আসতে কয়েক দিন লেগে যায়। মন আর একমুহূর্ত সেখানে থাকতে চাইছিল না। কিন্তু নানা কারণেই আমাদের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন কিছুটা বিলম্বিত হয়। অবশেষে ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতা থেকে বিমানে আগরতলা পৌঁছি। একই দিন আগরতলা থেকে একটি বাসযোগে বিলোনিয়া সীমান্তে এসে উপস্থিত হই। রাত তখন আনুমানিক ৯টা। আমার সঙ্গে ছিলেন শহীদ উদ্দিন আহমেদ। বিলোনিয়া পৌঁছে দেখি, সেখানকার অধিবাসীরাও আনন্দে আত্মহারা। আমি, শহীদ উদ্দিন আহমেদ এবং আরো কয়েকজন যাত্রী মিলে একটি জিপ ভাড়া করে রাত ১০টার দিকে ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। বিধ্বস্তপ্রায় রাস্তা দিয়ে ফেনী আসতে আমাদের প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে। রাত ১টা নাগাদ ফেনী শহরে উপনীত হই এবং অত্যন্ত দ্রুত বাড়িতে প্রবেশ করি। আমি বাড়িতে প্রবেশ করলে মা-বাবা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে আমি ফিরে এসেছি। তাঁরা ভেবেছিলেন, হয়তো আমি বেঁচে নেই। তাই তাঁরা আমাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই বেঁচে আছেন, এটা জেনে আমি চিন্তামুক্ত হই এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের পরিবারের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। বিশেষ করে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছি, এটা জানার পর রাজাকার বাহিনী আমার পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। সেই ভীতিকর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আমার বাবা বলেন, প্রতিদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজ আদায় করার পর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকতাম। আর এশার নামাজ আদায় করার পর হিসাব করতাম, তাহলে আরো একটা দিন বাঁচলাম। বাবার বলা এই একটিমাত্র কথা থেকেই মুক্তিযুদ্ধকালে আমার পরিবারের মনোযন্ত্রণার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। কী দুঃসহ ছিল সেইসব দিনের স্মৃতি! এমন যন্ত্রণার বিষয় শুধু অনুভব করা যায়; বর্ণনা করা যায় না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অবাধে মেশার সুযোগ পাই। এ অবস্থায় আমি তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া সম্পর্কে অবহিত হওয়ার চেষ্টা করি। যাঁরা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না। তাঁরা চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে এবং এ দেশের মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করে, সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেই নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচার শুরু করে। তারা মানুষের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়। সারা দেশে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক লুটপাট। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লাইসেন্স-পারমিটবাজি হয়ে দাঁড়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সারা দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দলীয়করণ-আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় ১৯৭৪ সালে ঘটে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। সেই সময়ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খাদ্যসামগ্রী দেশের বাইরে পাচার করতে থাকে। শাসকদলের নেতাকর্মীরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শোষকে পরিণত হয়। আর দেশের মানুষ অসহায়ভাবে তাদের শোষণের শিকার হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের মধ্যে যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা ম্লান হয়ে যায়। জাতি বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে দেশকে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। কিন্তু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার কারণে দেশে মারাত্মক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। একাধিক রাজনৈতিক দল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হয়। স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে দেশের জনগণকে বিভক্ত করে ফেলা হয়। সেই বিভক্তি পরে আর কখনোই দূর হয়নি। বেশ কয়েকবার জাতিকে ফের ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ এলেও রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শিতার কারণে তা কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।  এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিন জোটের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে এত বিভক্তি ও হানাহানির আশঙ্কা সৃষ্টি হতো না।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ছিল সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং বৃহত্তম জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা। এরই মধ্যে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলো যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে, তাহলে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রত্যাবর্তনের রাস্তা বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 ১৬ ডিসেম্বর আমাদের শিখিয়েছে, কিভাবে সম্মিলিত ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে হয়। তাই আজ আমাদের অঙ্গীকার হোক, দৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সব সমস্যার সমাধান করব। কোনো কারণেই ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেব না। দেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে; আর মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচাতে পারলেই সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনা করা সম্ভব হবে। ১৬ ডিসেম্বরের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনাহীন এক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

 

 

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ছবি: লুৎফর রহমান

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমার অনুভূতিটা ছিল রোগমুক্তির। যেন একটা কঠিন রোগে পেয়েছিল, দুরারোগ্য ব্যাধি। রোগটা সমষ্টিগত, আবার ব্যক্তিগতও। আমরা সবাই ভুগছিলাম, একসঙ্গে এবং আলাদা। বোধটা সামান্য নয়। সাতচল্লিশে আমরা আরো একবার স্বাধীন হই, তখন স্বাধীনতা এসেছিল স্টিমারে করে। সাতচল্লিশ সালের ১৫ আগস্ট দুপুরবেলা যে জাহাজটি এসে থামে গোয়ালন্দ থেকে পদ্মাপারের ভাগ্যকূলে, সেটিকে আমাদের মনে হয়েছিল স্বাধীনতার জাহাজ। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের মস্ত একটা পতাকা পতপত করে উড়ছিল, সদম্ভে। সারা জাহাজ সুসজ্জিত ছিল ছোট ছোট অসংখ্য পতাকায়। স্টিমারঘাটে, পন্টুনে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে ওই জাহাজের প্রতীক্ষায়, যার মধ্যে আমিও ছিলাম। একটি কিশোর। আমার হাতেও নিশান। সেই নিশান নাড়িয়েছি আমরা, জিন্দাবাদ দিয়েছি। জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়ানো যাত্রীরাও দিয়েছে, সমান উৎসাহে। স্বাধীনতার জাহাজ পরে আটকা পড়ে গেছে, চরায়। পাকিস্তান একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে আমাদের জন্য, যার লক্ষণ ও পীড়া স্পষ্ট হচ্ছিল, ক্রমাগত। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ। বাঁচার প্রয়োজনে।

একাত্তরে রোগমুক্তি যে আসন্ন, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। আমরা জিতব কি জিতব নাএ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নিশ্চয়ই, কখনো কখনো, কারো কারো মনে। অনেকের মতো আমিও নিশ্চিত ছিলাম জিতবই। প্রশ্ন ছিল, কবে, কিভাবে, কতটা যন্ত্রণার ভেতর দিয় সেটা ঘটবে। হয়তো সময় লাগবে, ক্ষতি হবে, কে থাকবে কে থাকবে না কে জানে, কিন্তু রোগটা থাকবে না। যাবেই চলে।

পঁচিশে মার্চের পর থেকে আমার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না। নানা জায়গায় থাকতাম। আমি তখন সবার সঙ্গে সংলগ্ন, সব পীড়িত মানুষের সঙ্গেই একত্র; কিন্তু আবার বিচ্ছিন্নও, রোগীরা যেমন হয়। আমার বিচ্ছিন্ন ভাসমানতার কারণ ছিল একটি নয়, দুটি। প্রথম কারণ আমি বাঙালি, দ্বিতীয় কারণ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হানাদাররা বিশেষভাবে চটা ছিল, ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগের দরুন। আগের শাসকরা যেমনটা ভেবেছে, পাকিস্তানিরাও তার ব্যতিক্রম করেনি; ধরে নিয়েছে ছাত্রদের বিপথগামিতার পেছনে শিক্ষকদের উসকানি কাজ করেছে। সেটা আদৌ সত্য ছিল না। ছাত্ররা কারো উসকানির জন্য অপেক্ষা করেনি। নিজেরাই বের করে নিয়েছে নিজেদের পথ। প্রাণের দায়ে, বাঁচার প্রয়োজনে। হানাদাররা তাদের মোটা হিসাবে শিক্ষকদের মধ্যে যে কয়জনকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের মধ্যে আমিও একজন।

পঁচিশে মার্চের রাতেই সহকর্মীদের কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। ছাত্র এবং কর্মচারীও। সেসব খবর ২৬ তারিখের ভোরে একেকটি আতঙ্কের মতো এসে পৌঁছাচ্ছিল। পরের দিন সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সপরিবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা ছেড়ে বের হয়ে পড়ি। সেই যে বাসা ছেড়েছি, আর ফেরা হয়নি। দু-একবার যে এসেছি, সে শুধু জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য। ফেরারির মতো।

না ফেরার কারণ ছিল। সাধারণ কারণের অতিরিক্ত ওই বিশেষ কারণ। হানাদাররা যাঁদের খুঁজছে, তাঁদের মধ্যে আমার নাম যে রয়েছে, সেটা জানা হয়ে গিয়েছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই। আমার এক নিকটাত্মীয় ছিলেন পুলিশে, একেবারে গোয়েন্দা বিভাগেই। সামরিক দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য ওই বিভাগকে বলা হয়েছিল, সেই তালিকায় আমার নাম নিচে নয়, ওপরের দিকেই ছিল, তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন। এক বিকেলে অফিস সময়ের বাইরে তিনি ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর দপ্তরে, তালিকাটি দেখাতে। চক্ষু ও কর্ণের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব রইল না, আমি দেখলাম; এবং বুঝলাম যে এর পরে আমার পক্ষে কোনো একটি ঠিকানায় বেশিদিন থাকা নিরাপদ হবে না। তা-ই করেছি আমি। যাঁদের আবাসে থেকেছি, তাঁরাও যে সবাই খুশি হয়েছেন আমাকে পেয়ে, তেমনটা বলা যাবে না। রোগ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, হাসপাতালের রোগীরা যে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারে, তা নয়। আমি যে একটি নয়, দুটি রোগে আক্রান্ত, সেটা তাঁরা সঠিকভাবে না জানলেও আশঙ্কা তো করতেন। সেপ্টেম্বরে মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও গভর্নর টিক্কা খানের স্বাক্ষর করা চিঠি এসেছিল কয়েকজন শিক্ষকের নামে। ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে দিয়ে। প্রাপকদের মধ্যে নিজেকে দেখে আমি বিস্মিত হইনি, তালিকাটি তো আমার জানাই ছিল। আগেই।

আমার বন্ধু ও সহকর্মী জয়নুল আবেদীন চলে গেলেন সীমান্ত পার হয়ে। আমি যাব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না, নানা টানাপোড়েনে। আমাদের ধারণা হয়েছিল যে, যুদ্ধটা বেশ কিছু দিন চলবে, তাই দেশের ভেতরেও সুযোগ থাকবে কাজ করার।

ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে আমরা ঠিক করেছি, এবার ঢাকা ছেড়ে চলে যাব, লম্বা সময়ের জন্য। ব্যাংকে যার যা গচ্ছিত ছিল, আমরা তুলে নিয়েছি। কয়েকটি রিকশা নিয়ে রওনা দিয়েছি সদরঘাটের দিকে। গ্রামে চলে যাব। এবারও বোধ হয় স্বাধীনতাকে গ্রামে দাঁড়িয়েই দেখতে পাব, ২৩-২৪ বছর আগে একদিন যেমন দেখা পেয়েছিলাম। কথাটা তখন ভাবিনি, কিন্তু ঘটনা ওই রকমই দাঁড়াত, গ্রামে যদি যাওয়া হতো। যাওয়া হয়নি। সদরঘাট থেকে শহরে নিকটতম আত্মীয়বাড়ি কোনটা তার খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল, সেটি ওয়ারীতে। সেই বাসায়ই গিয়ে উঠলাম আমরা, বাকিরা। রাতের জন্য। কিন্তু সেই রাত বড় দীর্ঘ হয়েছিল। রাতেই জানা গেল, কারফিউ জারি করেছে একটানা। নাকি তারা প্রস্তুত হচ্ছে যাওয়ার আগে শেষ কামড়টি দিয়ে যাওয়ার জন্য। সেটি ভয়ংকরই হওয়ার কথা। বিদেশি রেডিও আশা দিল, কিন্তু ভরসা দিতে পারল না। ১৪-১৫-তে আমরা আটকা পড়ে আছি। যাঁদের বাসায় আছি, তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে কি না, বাসায় খাবারদাবার কতটা আছে বা নেই, সে নিয়ে কেউ ভাবছে না। সবাই একই উদ্বেগে উদ্বিগ্নবাঁচা যাবে কি যাবে না। দূরে মাইক্রোফোন দিয়ে কারা যেন কী বলে যাচ্ছে। অবাঙালি গলা। স্লোগানও শোনা যাচ্ছে মনে হয়, ওরা কি তাহলে মিছিল করে বের হচ্ছে, বাঙালি নিধনে? থেকে থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছে। কোন দিক থেকে বলা মুশকিল। শোনা গেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাবে। একজন শুনে এসেছে, পানির সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেবে। রাস্তায় রাস্তায় কি যুদ্ধ হবে, সামনাসামনি, মুখোমুখি, হাতাহাতি? কে জানে।

১৬ ডিসেম্বরের সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, পাকিস্তানিরা তেমন কিছুই করতে পারবে না, বরং তাদের নিজেদের আত্মসমর্পণই আসন্ন। ভারতীয় বেতারে বিভিন্ন ভাষায় পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। করলে কী কী সুবিধা তা জানাচ্ছে। না করলে কী কী ঘটবে তা-ও জানাতে বাকি রাখছে না। জলে স্থলে অন্তরীক্ষেসব দিক দিয়েই পাকিস্তানিরা যে অবরুদ্ধ, তারা বলছে সে কথা। বিদেশি বেতারও সমর্থন করছে সংবাদ। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন নতুন খবর পাওয়া যাচ্ছে।

একসময় শোনা গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত সংবাদ। হানাদাররা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে। জানা গেল, রেসকোর্সে ঘটবে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। খবর শুনে চারদিক থেকে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে। যেন এইমাত্র রাত কাটাল, সকাল হয়েছে। আমরা কেউ বের হইনি। কিন্তু মনে হয়েছে, আমরা আর আগের আমরা নেই। স্বাভাবিক হয়েছি, প্রশস্ত প্রসারিত দীর্ঘ হয়ে উঠেছি, তাই বলে জায়গার কোনো অভাব নেই, সমস্ত দেশই তখন আমাদের। এখন অনেক কিছু ঘটবে। অনেক কিছু পাওয়া যাবে। এখন কোনো অস্থিরতা নেই। বড় কথা, অসুখটা সেরে গেছে। আমরা নিরাময় হয়েছি।

বিকেলে বের হয়েছিলাম। ওই বাসারই এক তরুণের সঙ্গে। সে আমার বন্ধুস্থানীয়। ওই কদিনের আটককালে বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়েছে। রেললাইন পার হয়ে হাটখোলা রোড ধরে এগিয়েছি। দেখলাম লাশ পড়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। সৎকারের লোক নেই, তাকানোরও সময় নেই কারো। এখন যেটি বঙ্গভবন, তখন তা ছিল গভর্নর হাউস, সেই ভবনের কাছে আচমকা দেখি এক তরুণ প্রায় লাফ দিয়ে নামছে আমাকে দেখে। চিৎকার করে বলছে, আপনি বেঁচে আছেন? তার পরেই ভয়ংকর খবরটি দিল সেই তরুণ। বলল, অনেকেই নেই। ১৪ তারিখে ধরে নিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায় গিয়েছিল ওই তরুণ, তার প্রিয় অধ্যাপকের খোঁজে, ফুল নিয়ে গিয়েছিল, বিজয়ের শুভেচ্ছা জানাবে বলে। ফিরে যাচ্ছে অশ্রুসজল চোখে। তার শিক্ষকটি নেই। ১৪ তারিখে কাজের ভেতরে তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে আলবদর। একা তাঁকে নয়, আরো অনেককে। কয়জনকে কে জানে। বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায় তখন আহাজারি। আমাকে দেখা যায়নি, কারণ আমি ছিলাম না সেখানে, আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা ছিল না ওই ৯ মাস। না দেখে কারো কারো ধারণা হয়েছে, আমিও হয়তো বেঁচে নেই, আমাকেও হয়তো বা ধরে নিয়ে গেছে। যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের একটি তালিকা শুনিয়েছিল ওই তরুণ। পথের পাশে দাঁড়িয়ে। শুনে বিজয়ের আনন্দ যেটুকু ছিল, নিঃশেষ হয়ে গেল। শুধু বেঁচে যে আছিএই স্বার্থপর চিন্তাটা ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি সেই মুহূর্তে ছিল কি না আমার মনে পড়ে না। তবে স্মরণ করতে পারি যে মনে হয়েছিল, একটু আগে যে কয়েকটি লাশ দেখে এসেছি পথে, তারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে, আমার অত্যন্ত আপনজন হয়ে উঠেছে তারা।

বিজয় তো ঘটেছিল সেদিন। অত বড় পরাক্রমশালী, সুসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, চারদিকে আনন্দের ধ্বনি, ছুটছে গুলি, বন্ধু জড়িয়ে ধরছে বন্ধুকে। মস্ত বড় সত্য সেটা। কিন্তু ইতিহাসের আরেক ধারাও তো উপস্থিত ছিল। ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছে বহুজন। সেই ঘাতকরা অন্য কেউ নয়, এই বাংলাদেশেরই সন্তান। এবং বিজয় শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে লুণ্ঠন। সঙ্গে সঙ্গেই। এক অন্ধকার মিশে গেছে আরেক অন্ধকারের সঙ্গে। বিষণ্ন পায়ে ফিরে এসেছি ঘরে। নানা রকম খবর চারদিকে। পাড়ার ছেলেরা যুদ্ধে গেছিল, তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছে। তারা গল্প বলছে নানা রকম। বীরত্বের, কৌতুকের, কোনোমতে বেঁচে যাওয়ার। একটু পরে দেখি, মিছিল বের হয়েছে একটা। ঠিকই, সেই রাজাকাররাই। সত্যি সত্যি। জিন্দাবাদ দিচ্ছে। শেখ মুজিবের ছবি সংগ্রহ করেছে এরই মধ্যে। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীরও। গলায় তাদের জোরের অভাব নেই।

১৬ তারিখে চারদিকে গুলির শব্দ। থামছে না। সবটাই আনন্দের, উল্লাসের, বিজয়ের। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, রোগ কেটে যাওয়া মানেই স্বাস্থ্য ফিরে আসা নয়। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সময় লাগবে। নেতৃত্বও প্রয়োজন হবে। সেই নেতৃত্ব পাওয়া যাবে কি, যে নেতৃত্ব পারবে এতসব বিশৃঙ্খলা ও পরস্পরবিরোধী শক্তিকে একত্র করতে, মানুষ ও সম্পদের যে ক্ষতি এরই মধ্যে হয়ে গেছে, তা পূরণের ব্যবস্থা নিতে?

ওই প্রশ্নের জবাব অবশ্য পাওয়া গেছে। গত ২৭ বছর ধরেই।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ | কালের কণ্ঠ