• ই-পেপার

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার

  • ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ

সালেক খোকন

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে তৃণমূলে স্বাধীনতাবিরোধীদের অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনাগুলো এখনো হারিয়ে যায়নি; বরং তা সূর্যের মতোই জীবন্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে রাজাকারদের রূপটি কেমন? তা তুলে ধরতেই এই লেখার অবতারণা।

 

জুট মিলের লেবার সর্দার বাচ্চু রাজাকার

চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক)। একাত্তরে রাজাকারদের কারণেই জীবন দিতে হয়েছে তাঁর বাবা ইব্রাহীম বিএবিটিকে। সবার কাছে তিনি বিটি সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। চাঁদপুর মহকুমার সংগ্রাম কমিটিরও সদস্য ছিলেন। একাত্তরে তাঁর কাজ ছিল ছাত্র ও যুবকদের ট্রেনিংয়ের জন্য চিঠি লিখে ভারতে পাঠানো।।

বাবার শহীদ হওয়ার ঘটনাটি শাহজাহান বললেন এভাবে : জ্যাকপট অপারেশনের আগে পুরো গ্রুপ নিয়ে প্রথম উঠেছিলাম বাড়িতে। এ খবর রাজাকারদের মাধ্যমে পেয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ওরা জানত বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। তাই ওরা নৌ কমান্ডোদের খুঁজতে বাড়ি অ্যাটাক করে। ১৭ আগস্ট ১৯৭১, সকালবেলা। গোপনে চার-পাঁচটা নৌকায় বাড়ির চারপাশ ঘেরাও দেয়। এরপর ব্রাশফায়ার করতে থাকে। সেনাদের সঙ্গে ছিল রাজাকাররা। ওরা আমার সঙ্গে বাবাকেও বেঁধে পেটাতে থাকে। বাবাকে ওরা জিজ্ঞেস করে, নৌ কমান্ডোরা কোথায়?

মার খেয়েও তিনি মুখ খোলেন না। বলেন, এখানে কেউ আসে নাই। বাড়ি সার্চ করে ওরা কোনো অস্ত্র পায় না। ফলে আমাদের বেঁধে নৌকায় তুলে পেটাতে থাকে।

চার-পাঁচ শ গজ দূরে ছিল কামেলি সাহেবের লজ। বাড়িটি লুট করতে নামে ওরা। নৌকায় বাবাকে পাশেই ফেলে রেখেছে। জুট মিলের লেবার সর্দার ছিল বাচ্চু রাজাকার। সেও নৌকায়। বুড়ো মানুষ দেখে আরেক রাজাকারের দয়া হয়। সে বাবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়।

কামেলি লজে কেউ নেই। বাড়ির পাশের পাটক্ষেতে লুকিয়ে ছিল তাঁর মেয়ে ঝরনা। সঙ্গে সোনা ও টাকার ৮-৯টা ট্রাংক। কিভাবে যেন ওরা টের পেয়ে যায়। পাটক্ষেত থেকে ধরে এনে নৌকায় তোলে। তখন পাক সেনাদের কুদৃষ্টি পড়ে মেয়েটির দিকে। রাজাকাররাও ব্যস্ত থাকে ট্রাংকের টাকা ও সোনা-রুপা আনলোড করায়।

এই সুযোগে বাবা কানে কানে বলেন, তুই এখান থেকে পালা। বলি, আপনার অবস্থা কী হবে? বাবা বলেন, আমার চিন্তা করিস না। তোকে ধরে নিয়ে গেলে যদি জানে তুই নৌ কমান্ডো, তাহলে মেরে ফেলবে। পুরো গ্রুপটাই ধরা পড়ে যাবে। তোদেরকে দেশটা স্বাধীন করতে হবে। তুই পালা। এটা বলেই কৌশলে আমার হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেন। বাবার সঙ্গে ওইটাই শেষ স্মৃতি।

অস্ত্রহাতে নৌকার দুই পাশে দুজন দাঁড়ানো। এক সাইডে একটাকে পা ধরে পানিতে ফেলে দিই। এর পরই আমি ঝাঁপ দিই। আমার দিকে ওরা ব্রাশফায়ার করে। কিন্তু তার আগেই ডুব দিয়ে অনেক দূরে চলে যাই।

ওরা বাবাকে ভীষণ টর্চার করে। তাঁকে গুলি করে ওরা ওই বাড়ির পাশে অর্ধেক পানিতে ও অর্ধেক রাস্তায় ফেলে যায়। গ্রামবাসী পরে লাশ উদ্ধার করে। ১৮ আগস্ট বিকেলে বাবাকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

 

ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত

গণহত্যা চালাইতে পারত না

আরেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. জমির আলী। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ৫ নম্বর সেক্টরে। তাঁর ভাষায়, আর্মি আসে সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা আর ছাতকে। ওগো সাহায্য করে শান্তি কমিটির লোকেরা। অনেক মাওলানা কাজ করে শান্তি কমিটিতে। আমাগো ওইখানে শান্তি কমিটির নেতা ছিল আসকর আলী মাস্টার, মাওলানা আবদুস সাত্তার ও রউস মৌলভি। পরে তো রেজাকারে (রাজাকার) লোকজন ভর্তি হইতে থাকে। ওরা অত্যাচার করছে বেশি। আর্মি আসত মাঝে মাঝে। রেজাকাররা ওগো বাড়ি চিনাইত। যুবতি মেয়ে আর খাসি সাপ্লাই দিত। হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ করছে বেশি, লুটতরাজও করছে অনেক। ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত গণহত্যা চালাইতে পারত না।

ওইখানে নামকরা রেজাকার ছিল বুধাই। তবে ফকির চেয়ারম্যান ছিল তার চেয়েও ভয়ংকর। সুরমা নদীর উত্তরের ঘটনা। একবার ট্রেনিংয়ের লাইগা ১৩ জন ছাত্র বর্ডার পার হইতেছে। এ খবর ফকির চেয়ারম্যান পাঞ্জাবিগো দিয়া আসে। ওরা আইসা সবাইরে গুলি কইরা মারছে।

 

যুবক পেলেই বাধ্য করা হতো

রাজাকারে যেতে

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান। একটি ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন : ট্রেনিংয়ে যখন যাই, তখন অনেকেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। তাদের বয়স ছিল কম। ফলে রেখে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। নবম শ্রেণিতে পড়ত আব্দুস সালাম ও বাবুল। ওদের বাড়ি পিপড়াছিটে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের। যাওয়ার সময় বুঝিয়ে বলেছিলাম, ফিরে এসেই তোদের ট্রেনিং দিমু। গ্রামে থেকেও ওরা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করেছে।

শান্তি কমিটির লোকেরা ওই সময় গ্রামে গ্রামে হানা দিত। পরে অনেকে মিলে কালিয়াকৈরে রাজাকার বাহিনীও গড়ে তোলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ও তরুণদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বলে। রাজাকারে যারা যায়নি, তাদের ওরা তুলে দিত পাকিস্তানি আর্মির হাতে। মেরেও ফেলেছে অনেককে।

রাজাকার বাহিনীতে না যাওয়ায় সালাম ও বাবুলের ওপরও চড়াও হয় শান্তি কমিটির লোকেরা। চলাচলের জন্য তখন আর্মি ক্যাম্প থেকে কার্ড দেওয়া হতো। ওই কার্ড করতে একদিন তারা যায় কালিয়াকৈরে। ওখানে তাদের পেয়ে রাজাকাররা তুলে নেয়। নির্মমভাবে হত্যা করে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়তো তারা লাশ হতো না। এমন অপরাধবোধ আজও জাগে মনে।

ওরা নিজের ছেলেমেয়েদের

রাজাকার বানায় নাই!

মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়াসহ ২ নম্বর সেক্টরের নির্ভয়পুর সাব-সেক্টরে এফএফদের (ফ্রিডম ফাইটার) পরিচালনায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, একাত্তরের জুনের শেষ দিকে আমাদের গ্রুপগুলোর চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন অস্ত্রহাতে পথে পথে থাকত রাজাকাররা। ওরা পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ করত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা কাজ করত, তাদের ইনফরমেশনগুলো তারাই পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে আসত। শান্তি কমিটির নেতারা নিজের ছেলেমেয়েদের কিন্তু রাজাকার বানায় নাই! তারা এলাকার গরিব ছেলেদের বেশি রিক্রুট করত। ট্রেনিংয়ের লোভ দেখিয়ে বলত, লুটের মাল জায়েজ। সেটা তোমরা পাবা। ওরা ব্রিজ পাহারা দিত। ফলে গেরিলাদের সঙ্গে রাজাকারদের যুদ্ধ হয়েছে বেশি। যদি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর আর আলশামস না থাকত, তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা এত মানুষকে হত্যা করতে পারত না!

 

নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই

মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার আলীর গ্রামের বাড়ি খুলনার নালিয়ার চরে। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগেই তিনি রাজাকারদের নির্যাতনের শিকার হন। ওই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন : যুদ্ধে যামু। ভেতরে ভেতরে খুঁজতেছি কারা যায়। এক গ্রুপের খবর পাই। কিন্তু ওরা আমারে নেয় না। কিছু খরচ তো সঙ্গে নিতে হইব। মারে বলছি, টাকা দাও। যুদ্ধে যামু। মা মানা করছে। বলে, যাওয়ার দরকার নাই বাপ। একসঙ্গে থাকব। পাঞ্জাবিরা যদি আইসা মারে, সবাই একসঙ্গেই মরমু।

আমার খুব রাগ হইল। বললাম, ওগো গুলি খাইয়া আমি মরমু না। তহনই ঘটল আরেক ঘটনা। আগস্ট মাস। বড় ভাই থাকত কালিয়া উপজেলা থেকে একটু দূরে, চাচরি কদমতলায়। একদিন ওখানে যাচ্ছিলাম। কালিয়াতে যে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা ক্যাম্প বসাইছে জানতাম না। ওরা আমারে আটকায়। কয়, তুই মুক্তিবাহিনীর লোক। তুই জানস মুক্তিবাহিনী কোথায়। সত্য কথা বললে ছাড়ি দিমু। মিথ্যা কইলে গুলি করমু।

আমি কই, সারা দিন কাজ করি মাঠে। আর সন্ধ্যা হলেই বাড়িত ঘুমাই। মুক্তিবাহিনী কখন আসে কখন যায় আমি তো দেহি নাই।

আমারে খুব মারে ওরা। মেজরের কাছে নিয়া যায়। সন্ধ্যায় আমারে একটা বাংকারের সামনে নিয়া বসায়। আমাকে শুনায়া ওরা প্রচণ্ড গালাগালি করে বঙ্গবন্ধুরে। সে গালির কোনো শেষ নাই। ওরা খেয়াল করে আমি উত্তেজিত হই কি না। উত্তেজিত হইলেই বুঝব মুক্তিযোদ্ধা।

সকালের দিকে কয়েকটা চড় মাইরা ছাইড়া দিল। আমার তহন জেদ চাইপা গেল। খালি খালি ওরা আমারে মারল। ওগো তো ছাড়া যাইব না। বাড়িত আইসাই যোগাযোগ হয় গ্রামের বুলু মোল্লার লগে। তাঁর নেতৃত্বেই এক সকালে ১৯ জনের লগে ট্রেনিংয়ে যাই। রাজাকারগো নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই।

একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ নির্যাতিত মা-বোন এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারসহ পাকিস্তানপন্থী সব বাহিনীর তালিকা চূড়ান্ত ও বিচার করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি করতে না পারার ব্যর্থতায় বাঙালি জাতিকে এখনো চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তবু আমাদের শিকড়ের ইতিহাসে রাজাকার শব্দটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঘৃণিত হয়েই থাকবে।

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ

মাহবুব হাসান

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ
শরণার্থী শিবিরে এক অসহায় মা । ছবি : রঘু রাই

রণাঙ্গন থেকে ফিরছি টাঙ্গাইল শহরের দিকে। হেঁটে। আমি সেদিন ছিলাম ধলাপাড়ায়। সেই ধলাপাড়া থেকে আমি আর আমার সঙ্গে ছিল আমার ভাগ্নে রফিক এবং দেওপাড়ার রিয়াজ কমান্ডারের তিনজন। তাদের হাতে ছিল একটি ব্রিটিশ এলএমজি ও এসএমজি। ধলাপাড়ার গায়ে লাগানো বংশী নদী পার হলে যে সড়কটি চলে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কালিহাতী থানায়, সামনে গা-ছমছম করা দেওহাটা জঙ্গল, অ্যামবুশ করার জন্য খুব উপযুক্ত, সেটা এড়ানোর জন্য ওই পথে গেলাম না। আমরা ধরলাম আরেকটি পাহাড়ি হালট, যেটা গেছে মধুপুরের দিকে, প্যাচার আটা হয়ে। কিন্তু মধুপুরের দিকেও যাব না। আমরা সরাসরি ঘাটাইল থানাবাড়িতে যাব ঠিক করলাম। ওই পথই ছিল আমাদের জন্য নিরাপদ। কেননা ওই পথ আমার চেনা। আমার মামার বাড়ি হাজিপুর, তাই চেনা এলাকা আমার।

হঠাৎই একটি গাড়ির ধেয়ে আসার শব্দে সচকিত হয়ে পেছনে তাকালাম। ড্রাইভার আমাদের পোশাক দেখেই গাড়ি থামাল। জিজ্ঞেস করল আমরা লতিফ সিদ্দিকীকে দেখেছি কি না। আমরা খবর জানতাম যে লতিফ সিদ্দিকী হেঁটেই রওনা হয়েছেন টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য। গাড়িটা এসেছিল লতিফ সিদ্দিকীকে নেওয়ার জন্য। টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে গতকাল ১১ ডিসেম্বর, আমরাও রওনা হয়েছি হেঁটে। জিপের ড্রাইভার বলল, গাড়িতে আসেন। আমরা সবাই উঠলাম। গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর বিগড়ে গেল। সময় তখন পড়ন্ত বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও স্টার্ট দিতে ব্যর্থ হলে আবারও হাঁটতে থাকলাম আমরা। কিন্তু সেই পাহাড়ি রাস্তায় কত আর হাঁটা যায়? এর মধ্যেই খবর এলো, কিছু পাকিস্তানি আসছে। আমরা অ্যামবুশ করলাম। কিছুক্ষণ পর ধানি ক্ষেতের ওপারে গাছপালার ভেতর দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছে একদল পাকিস্তানি সৈনিক। আমাদের সৈনিকদের একজন এলএমজি দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করল। ওপাশ থেকেও একঝাঁক গুলি উড়ে এলো। আমরা গাছের গুঁড়ির আড়ালে, তাই কোনো অঘটন ঘটল না। আমরা গুলি করতে বারণ করলাম। ওরা চলে গেল। পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জিরালাম। ঘণ্টাখানেক পর আবার রওনা হলাম। রাত ১০টার দিকে আমরা পৌঁছলাম ঘাটাইল থানায়। সেখানে পেলাম হেডকোয়ার্টার্সের কম্পানি কমান্ডার খোরশেদকে। তিনি  এক যুদ্ধে গুলি খেয়ে অনেকটাই অসুস্থ ছিলেন। সে কারণে তিনি হেডকোয়ার্টার্সে পোস্টিং পেয়েছিলেন। তিনি ঘাটাইল থানার দায়িত্ব পেয়েছিলেন আগের দিনই। রাত ১১টার দিকে ঝোড়ো বেগে জিপ চালিয়ে এলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বললেনচলো।

আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইল শহরে।

২.

টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে ১১ ডিসেম্বর। ওই দিনই ইন্ডিয়ান ছত্রীসেনারা যুদ্ধবিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে নামেন। তাঁরা প্যারাট্রুপার। তখন মনে হয়েছে অগণন তারা। পরের দিনই দেখলাম, এলেন কর্নেল শ্যাম সিং বাবাজি। তার পরের দিন এলেন জেনারেল অরোরা। সার্কিট হাউসে বসে তাঁরা প্ল্যান করলেন। বািচত হিন্দিতে হচ্ছে, তাই বুঝতে পারছিলাম না। যদিও হেডকোয়ার্টার্সের মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের পজিশন বেশ ওপরে ছিল। আমরা অনায়াসেই ওই প্ল্যানের অংশীদার হলাম। কাদের সিদ্দিকীই প্ল্যানের মূল হোতা, তিনি মিরপুরের আমিনবাজারের লোহার ব্রিজের কথা বলছিলেন।

 জেনারেল অরোরা, কর্নেল বাবাজি এবং আরো ভারতীয় উচ্চপদস্থ সেনারা সামনে, আমরা পেছনের সামরিক যানে উঠেছি। মিরপুরের লোহার পুলের কাছে ওরা যেতে পারলেন, আমরা পেছনেই পড়ে রইলাম। আমিনবাজারের লোহার পুলে পাকিস্তানিরা ছিল না। ওখান থেকেই ওয়্যারলেসে কথা বলছিলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় জেনারেল। ঠিক হয়েছিল কোথায় আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হবে। রেসকোর্সে করা হয়েছিল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার আয়োজন। তা-ই হলো। কিন্তু না কাদের সিদ্দিকী, না মেজর জিয়া, না এ কে খন্দকার, না মেজর এ টি এম হায়দার, না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানিকাউকেই সেই টেবিলে ডাকা হয়নি সেদিন। অথচ কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে করে বেসামরিক পোশাকে এ কে খন্দকারকে আনা হয়েছিল। আগরতলা বা সিলেটের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ওসমানীকে আনা হয়নি। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকেই টেবিলের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। শুধু পাকিস্তানি জেনারেল ও ভারতীয় জেনারেল বসে স্বাক্ষর করলেন।

৪.

যুদ্ধটা আমরাই শুরু করেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের লক্ষ্যে; সেই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য। কেননা, মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন থেকে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের নাইটাপাড়ায় মুক্তিসেনাদের প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা। আমাদের অপটু যোদ্ধারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি বটে, তবে আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুর্বার বাসনা জাগিয়েছিল ওই নাইটাপাড়ার যুদ্ধ।

আমরা পাহাড়ি এলাকায় সংগঠিত হলাম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাঁরা ইপিআর ও সেনা সদস্য ছিলেন, সঙ্গে কাদের সিদ্দিকী ও খন্দকার ফজলুর রহমান (ব্রিগেডিয়ার ফজলু) ট্রেইনার হিসেবে বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁদের ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সৈনিকজীবনের ট্রেনিং। নাম না-জানা আরো সৈনিক ছিলেন, যাঁরা কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছিলেন ঝনঝনিয়া গ্রামের লাল্টু। তিনিও সেনাবাহিনীতে ছিলেন আর ওই গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার রহম, ছিলেন দেওপাড়ার রিয়াজতাঁরা কম্পানি কমান্ডার পদে আসীন ছিলেন।

আর মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল একেবারে তরুণপ্রাণ স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছাত্র আর চাষারা। আর ছিল কোটি কোটি উৎপাদক মানুষের সমর্থন। ছাত্র-শিক্ষক-কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ, যারা চেয়েছিল মুক্ত হতে শাসন ও শোষণের নাগপাশ থেকে।

৫.

জনযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনের নিগড় থেকে, শোষণের জাঁতাকল থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তির রাজপথের নাম গণতন্ত্র। ওই গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। ধর্ষিত হয়েছে হাজার হাজার মা-বোন-জায়া। তাদের জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তার লক্ষ্য কি পূরিত হয়েছে গত ৫৪ বছরে?

এর একটাই উত্তরনা, হয়নি।

কেন হয়নি?

শেখ মুজিবের মতো একজন নিরলস রাজনৈতিক নেতা, যিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি কেন বিজয় অর্জনের পর ক্ষমতায় বসলেন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের সৃষ্ট ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের শৃঙ্খল প্রশাসনে? ওই প্রশাসন ব্যবস্থায় তো গণতান্ত্রিক শাসনের ছোঁয়াও ছিল না। সেটা কি তিনি বুঝতে পারেননি?

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ
১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫ ছবি: লুৎফর রহমান

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর আমার অনুভূতিটা ছিল রোগমুক্তির। যেন একটা কঠিন রোগে পেয়েছিল, দুরারোগ্য ব্যাধি। রোগটা সমষ্টিগত, আবার ব্যক্তিগতও। আমরা সবাই ভুগছিলাম, একসঙ্গে এবং আলাদা। বোধটা সামান্য নয়। সাতচল্লিশে আমরা আরো একবার স্বাধীন হই, তখন স্বাধীনতা এসেছিল স্টিমারে করে। সাতচল্লিশ সালের ১৫ আগস্ট দুপুরবেলা যে জাহাজটি এসে থামে গোয়ালন্দ থেকে পদ্মাপারের ভাগ্যকূলে, সেটিকে আমাদের মনে হয়েছিল স্বাধীনতার জাহাজ। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের মস্ত একটা পতাকা পতপত করে উড়ছিল, সদম্ভে। সারা জাহাজ সুসজ্জিত ছিল ছোট ছোট অসংখ্য পতাকায়। স্টিমারঘাটে, পন্টুনে বহু মানুষ দাঁড়িয়ে ওই জাহাজের প্রতীক্ষায়, যার মধ্যে আমিও ছিলাম। একটি কিশোর। আমার হাতেও নিশান। সেই নিশান নাড়িয়েছি আমরা, জিন্দাবাদ দিয়েছি। জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়ানো যাত্রীরাও দিয়েছে, সমান উৎসাহে। স্বাধীনতার জাহাজ পরে আটকা পড়ে গেছে, চরায়। পাকিস্তান একটি ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে আমাদের জন্য, যার লক্ষণ ও পীড়া স্পষ্ট হচ্ছিল, ক্রমাগত। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ। বাঁচার প্রয়োজনে।

একাত্তরে রোগমুক্তি যে আসন্ন, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। আমরা জিতব কি জিতব নাএ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নিশ্চয়ই, কখনো কখনো, কারো কারো মনে। অনেকের মতো আমিও নিশ্চিত ছিলাম জিতবই। প্রশ্ন ছিল, কবে, কিভাবে, কতটা যন্ত্রণার ভেতর দিয় সেটা ঘটবে। হয়তো সময় লাগবে, ক্ষতি হবে, কে থাকবে কে থাকবে না কে জানে, কিন্তু রোগটা থাকবে না। যাবেই চলে।

পঁচিশে মার্চের পর থেকে আমার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না। নানা জায়গায় থাকতাম। আমি তখন সবার সঙ্গে সংলগ্ন, সব পীড়িত মানুষের সঙ্গেই একত্র; কিন্তু আবার বিচ্ছিন্নও, রোগীরা যেমন হয়। আমার বিচ্ছিন্ন ভাসমানতার কারণ ছিল একটি নয়, দুটি। প্রথম কারণ আমি বাঙালি, দ্বিতীয় কারণ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হানাদাররা বিশেষভাবে চটা ছিল, ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগের দরুন। আগের শাসকরা যেমনটা ভেবেছে, পাকিস্তানিরাও তার ব্যতিক্রম করেনি; ধরে নিয়েছে ছাত্রদের বিপথগামিতার পেছনে শিক্ষকদের উসকানি কাজ করেছে। সেটা আদৌ সত্য ছিল না। ছাত্ররা কারো উসকানির জন্য অপেক্ষা করেনি। নিজেরাই বের করে নিয়েছে নিজেদের পথ। প্রাণের দায়ে, বাঁচার প্রয়োজনে। হানাদাররা তাদের মোটা হিসাবে শিক্ষকদের মধ্যে যে কয়জনকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের মধ্যে আমিও একজন।

পঁচিশে মার্চের রাতেই সহকর্মীদের কয়েকজন শহীদ হয়েছেন। ছাত্র এবং কর্মচারীও। সেসব খবর ২৬ তারিখের ভোরে একেকটি আতঙ্কের মতো এসে পৌঁছাচ্ছিল। পরের দিন সকালে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সপরিবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা ছেড়ে বের হয়ে পড়ি। সেই যে বাসা ছেড়েছি, আর ফেরা হয়নি। দু-একবার যে এসেছি, সে শুধু জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য। ফেরারির মতো।

না ফেরার কারণ ছিল। সাধারণ কারণের অতিরিক্ত ওই বিশেষ কারণ। হানাদাররা যাঁদের খুঁজছে, তাঁদের মধ্যে আমার নাম যে রয়েছে, সেটা জানা হয়ে গিয়েছিল এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই। আমার এক নিকটাত্মীয় ছিলেন পুলিশে, একেবারে গোয়েন্দা বিভাগেই। সামরিক দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকজন শিক্ষক সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য ওই বিভাগকে বলা হয়েছিল, সেই তালিকায় আমার নাম নিচে নয়, ওপরের দিকেই ছিল, তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন। এক বিকেলে অফিস সময়ের বাইরে তিনি ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর দপ্তরে, তালিকাটি দেখাতে। চক্ষু ও কর্ণের মধ্যে আর কোনো দূরত্ব রইল না, আমি দেখলাম; এবং বুঝলাম যে এর পরে আমার পক্ষে কোনো একটি ঠিকানায় বেশিদিন থাকা নিরাপদ হবে না। তা-ই করেছি আমি। যাঁদের আবাসে থেকেছি, তাঁরাও যে সবাই খুশি হয়েছেন আমাকে পেয়ে, তেমনটা বলা যাবে না। রোগ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, হাসপাতালের রোগীরা যে পরস্পরকে সাহায্য করতে পারে, তা নয়। আমি যে একটি নয়, দুটি রোগে আক্রান্ত, সেটা তাঁরা সঠিকভাবে না জানলেও আশঙ্কা তো করতেন। সেপ্টেম্বরে মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও গভর্নর টিক্কা খানের স্বাক্ষর করা চিঠি এসেছিল কয়েকজন শিক্ষকের নামে। ভবিষ্যতের জন্য সাবধান করে দিয়ে। প্রাপকদের মধ্যে নিজেকে দেখে আমি বিস্মিত হইনি, তালিকাটি তো আমার জানাই ছিল। আগেই।

আমার বন্ধু ও সহকর্মী জয়নুল আবেদীন চলে গেলেন সীমান্ত পার হয়ে। আমি যাব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না, নানা টানাপোড়েনে। আমাদের ধারণা হয়েছিল যে, যুদ্ধটা বেশ কিছু দিন চলবে, তাই দেশের ভেতরেও সুযোগ থাকবে কাজ করার।

ডিসেম্বর মাসের ১২ তারিখে আমরা ঠিক করেছি, এবার ঢাকা ছেড়ে চলে যাব, লম্বা সময়ের জন্য। ব্যাংকে যার যা গচ্ছিত ছিল, আমরা তুলে নিয়েছি। কয়েকটি রিকশা নিয়ে রওনা দিয়েছি সদরঘাটের দিকে। গ্রামে চলে যাব। এবারও বোধ হয় স্বাধীনতাকে গ্রামে দাঁড়িয়েই দেখতে পাব, ২৩-২৪ বছর আগে একদিন যেমন দেখা পেয়েছিলাম। কথাটা তখন ভাবিনি, কিন্তু ঘটনা ওই রকমই দাঁড়াত, গ্রামে যদি যাওয়া হতো। যাওয়া হয়নি। সদরঘাট থেকে শহরে নিকটতম আত্মীয়বাড়ি কোনটা তার খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল, সেটি ওয়ারীতে। সেই বাসায়ই গিয়ে উঠলাম আমরা, বাকিরা। রাতের জন্য। কিন্তু সেই রাত বড় দীর্ঘ হয়েছিল। রাতেই জানা গেল, কারফিউ জারি করেছে একটানা। নাকি তারা প্রস্তুত হচ্ছে যাওয়ার আগে শেষ কামড়টি দিয়ে যাওয়ার জন্য। সেটি ভয়ংকরই হওয়ার কথা। বিদেশি রেডিও আশা দিল, কিন্তু ভরসা দিতে পারল না। ১৪-১৫-তে আমরা আটকা পড়ে আছি। যাঁদের বাসায় আছি, তাঁদের অসুবিধা হচ্ছে কি না, বাসায় খাবারদাবার কতটা আছে বা নেই, সে নিয়ে কেউ ভাবছে না। সবাই একই উদ্বেগে উদ্বিগ্নবাঁচা যাবে কি যাবে না। দূরে মাইক্রোফোন দিয়ে কারা যেন কী বলে যাচ্ছে। অবাঙালি গলা। স্লোগানও শোনা যাচ্ছে মনে হয়, ওরা কি তাহলে মিছিল করে বের হচ্ছে, বাঙালি নিধনে? থেকে থেকে গোলাগুলির আওয়াজ আসছে। কোন দিক থেকে বলা মুশকিল। শোনা গেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যাবে। একজন শুনে এসেছে, পানির সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেবে। রাস্তায় রাস্তায় কি যুদ্ধ হবে, সামনাসামনি, মুখোমুখি, হাতাহাতি? কে জানে।

১৬ ডিসেম্বরের সকাল থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, পাকিস্তানিরা তেমন কিছুই করতে পারবে না, বরং তাদের নিজেদের আত্মসমর্পণই আসন্ন। ভারতীয় বেতারে বিভিন্ন ভাষায় পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছে। করলে কী কী সুবিধা তা জানাচ্ছে। না করলে কী কী ঘটবে তা-ও জানাতে বাকি রাখছে না। জলে স্থলে অন্তরীক্ষেসব দিক দিয়েই পাকিস্তানিরা যে অবরুদ্ধ, তারা বলছে সে কথা। বিদেশি বেতারও সমর্থন করছে সংবাদ। ঘণ্টায় ঘণ্টায় নতুন নতুন খবর পাওয়া যাচ্ছে।

একসময় শোনা গেল সেই বহু প্রতীক্ষিত সংবাদ। হানাদাররা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে। জানা গেল, রেসকোর্সে ঘটবে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। খবর শুনে চারদিক থেকে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে। যেন এইমাত্র রাত কাটাল, সকাল হয়েছে। আমরা কেউ বের হইনি। কিন্তু মনে হয়েছে, আমরা আর আগের আমরা নেই। স্বাভাবিক হয়েছি, প্রশস্ত প্রসারিত দীর্ঘ হয়ে উঠেছি, তাই বলে জায়গার কোনো অভাব নেই, সমস্ত দেশই তখন আমাদের। এখন অনেক কিছু ঘটবে। অনেক কিছু পাওয়া যাবে। এখন কোনো অস্থিরতা নেই। বড় কথা, অসুখটা সেরে গেছে। আমরা নিরাময় হয়েছি।

বিকেলে বের হয়েছিলাম। ওই বাসারই এক তরুণের সঙ্গে। সে আমার বন্ধুস্থানীয়। ওই কদিনের আটককালে বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হয়েছে। রেললাইন পার হয়ে হাটখোলা রোড ধরে এগিয়েছি। দেখলাম লাশ পড়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। সৎকারের লোক নেই, তাকানোরও সময় নেই কারো। এখন যেটি বঙ্গভবন, তখন তা ছিল গভর্নর হাউস, সেই ভবনের কাছে আচমকা দেখি এক তরুণ প্রায় লাফ দিয়ে নামছে আমাকে দেখে। চিৎকার করে বলছে, আপনি বেঁচে আছেন? তার পরেই ভয়ংকর খবরটি দিল সেই তরুণ। বলল, অনেকেই নেই। ১৪ তারিখে ধরে নিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায় গিয়েছিল ওই তরুণ, তার প্রিয় অধ্যাপকের খোঁজে, ফুল নিয়ে গিয়েছিল, বিজয়ের শুভেচ্ছা জানাবে বলে। ফিরে যাচ্ছে অশ্রুসজল চোখে। তার শিক্ষকটি নেই। ১৪ তারিখে কাজের ভেতরে তাঁকে ধরে নিয়ে গেছে আলবদর। একা তাঁকে নয়, আরো অনেককে। কয়জনকে কে জানে। বিশ্ববিদ্যালয়পাড়ায় তখন আহাজারি। আমাকে দেখা যায়নি, কারণ আমি ছিলাম না সেখানে, আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা ছিল না ওই ৯ মাস। না দেখে কারো কারো ধারণা হয়েছে, আমিও হয়তো বেঁচে নেই, আমাকেও হয়তো বা ধরে নিয়ে গেছে। যাঁদের পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের একটি তালিকা শুনিয়েছিল ওই তরুণ। পথের পাশে দাঁড়িয়ে। শুনে বিজয়ের আনন্দ যেটুকু ছিল, নিঃশেষ হয়ে গেল। শুধু বেঁচে যে আছিএই স্বার্থপর চিন্তাটা ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি সেই মুহূর্তে ছিল কি না আমার মনে পড়ে না। তবে স্মরণ করতে পারি যে মনে হয়েছিল, একটু আগে যে কয়েকটি লাশ দেখে এসেছি পথে, তারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে, আমার অত্যন্ত আপনজন হয়ে উঠেছে তারা।

বিজয় তো ঘটেছিল সেদিন। অত বড় পরাক্রমশালী, সুসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে, চারদিকে আনন্দের ধ্বনি, ছুটছে গুলি, বন্ধু জড়িয়ে ধরছে বন্ধুকে। মস্ত বড় সত্য সেটা। কিন্তু ইতিহাসের আরেক ধারাও তো উপস্থিত ছিল। ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছে বহুজন। সেই ঘাতকরা অন্য কেউ নয়, এই বাংলাদেশেরই সন্তান। এবং বিজয় শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে লুণ্ঠন। সঙ্গে সঙ্গেই। এক অন্ধকার মিশে গেছে আরেক অন্ধকারের সঙ্গে। বিষণ্ন পায়ে ফিরে এসেছি ঘরে। নানা রকম খবর চারদিকে। পাড়ার ছেলেরা যুদ্ধে গেছিল, তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছে। তারা গল্প বলছে নানা রকম। বীরত্বের, কৌতুকের, কোনোমতে বেঁচে যাওয়ার। একটু পরে দেখি, মিছিল বের হয়েছে একটা। ঠিকই, সেই রাজাকাররাই। সত্যি সত্যি। জিন্দাবাদ দিচ্ছে। শেখ মুজিবের ছবি সংগ্রহ করেছে এরই মধ্যে। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীরও। গলায় তাদের জোরের অভাব নেই।

১৬ তারিখে চারদিকে গুলির শব্দ। থামছে না। সবটাই আনন্দের, উল্লাসের, বিজয়ের। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, রোগ কেটে যাওয়া মানেই স্বাস্থ্য ফিরে আসা নয়। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সময় লাগবে। নেতৃত্বও প্রয়োজন হবে। সেই নেতৃত্ব পাওয়া যাবে কি, যে নেতৃত্ব পারবে এতসব বিশৃঙ্খলা ও পরস্পরবিরোধী শক্তিকে একত্র করতে, মানুষ ও সম্পদের যে ক্ষতি এরই মধ্যে হয়ে গেছে, তা পূরণের ব্যবস্থা নিতে?

ওই প্রশ্নের জবাব অবশ্য পাওয়া গেছে। গত ২৭ বছর ধরেই।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার | কালের কণ্ঠ