• ই-পেপার

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ

  • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ

সালেক খোকন

মুক্তিযোদ্ধার চোখে রাজাকারের স্বরূপ

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিতে তৃণমূলে স্বাধীনতাবিরোধীদের অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনাগুলো এখনো হারিয়ে যায়নি; বরং তা সূর্যের মতোই জীবন্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে রাজাকারদের রূপটি কেমন? তা তুলে ধরতেই এই লেখার অবতারণা।

 

জুট মিলের লেবার সর্দার বাচ্চু রাজাকার

চাঁদপুরের মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো মো. শাহজাহান কবির (বীরপ্রতীক)। একাত্তরে রাজাকারদের কারণেই জীবন দিতে হয়েছে তাঁর বাবা ইব্রাহীম বিএবিটিকে। সবার কাছে তিনি বিটি সাহেব নামে পরিচিত ছিলেন। চাঁদপুর মহকুমার সংগ্রাম কমিটিরও সদস্য ছিলেন। একাত্তরে তাঁর কাজ ছিল ছাত্র ও যুবকদের ট্রেনিংয়ের জন্য চিঠি লিখে ভারতে পাঠানো।।

বাবার শহীদ হওয়ার ঘটনাটি শাহজাহান বললেন এভাবে : জ্যাকপট অপারেশনের আগে পুরো গ্রুপ নিয়ে প্রথম উঠেছিলাম বাড়িতে। এ খবর রাজাকারদের মাধ্যমে পেয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ওরা জানত বাবা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। তাই ওরা নৌ কমান্ডোদের খুঁজতে বাড়ি অ্যাটাক করে। ১৭ আগস্ট ১৯৭১, সকালবেলা। গোপনে চার-পাঁচটা নৌকায় বাড়ির চারপাশ ঘেরাও দেয়। এরপর ব্রাশফায়ার করতে থাকে। সেনাদের সঙ্গে ছিল রাজাকাররা। ওরা আমার সঙ্গে বাবাকেও বেঁধে পেটাতে থাকে। বাবাকে ওরা জিজ্ঞেস করে, নৌ কমান্ডোরা কোথায়?

মার খেয়েও তিনি মুখ খোলেন না। বলেন, এখানে কেউ আসে নাই। বাড়ি সার্চ করে ওরা কোনো অস্ত্র পায় না। ফলে আমাদের বেঁধে নৌকায় তুলে পেটাতে থাকে।

চার-পাঁচ শ গজ দূরে ছিল কামেলি সাহেবের লজ। বাড়িটি লুট করতে নামে ওরা। নৌকায় বাবাকে পাশেই ফেলে রেখেছে। জুট মিলের লেবার সর্দার ছিল বাচ্চু রাজাকার। সেও নৌকায়। বুড়ো মানুষ দেখে আরেক রাজাকারের দয়া হয়। সে বাবার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দেয়।

কামেলি লজে কেউ নেই। বাড়ির পাশের পাটক্ষেতে লুকিয়ে ছিল তাঁর মেয়ে ঝরনা। সঙ্গে সোনা ও টাকার ৮-৯টা ট্রাংক। কিভাবে যেন ওরা টের পেয়ে যায়। পাটক্ষেত থেকে ধরে এনে নৌকায় তোলে। তখন পাক সেনাদের কুদৃষ্টি পড়ে মেয়েটির দিকে। রাজাকাররাও ব্যস্ত থাকে ট্রাংকের টাকা ও সোনা-রুপা আনলোড করায়।

এই সুযোগে বাবা কানে কানে বলেন, তুই এখান থেকে পালা। বলি, আপনার অবস্থা কী হবে? বাবা বলেন, আমার চিন্তা করিস না। তোকে ধরে নিয়ে গেলে যদি জানে তুই নৌ কমান্ডো, তাহলে মেরে ফেলবে। পুরো গ্রুপটাই ধরা পড়ে যাবে। তোদেরকে দেশটা স্বাধীন করতে হবে। তুই পালা। এটা বলেই কৌশলে আমার হাত ও পায়ের বাঁধন খুলে দেন। বাবার সঙ্গে ওইটাই শেষ স্মৃতি।

অস্ত্রহাতে নৌকার দুই পাশে দুজন দাঁড়ানো। এক সাইডে একটাকে পা ধরে পানিতে ফেলে দিই। এর পরই আমি ঝাঁপ দিই। আমার দিকে ওরা ব্রাশফায়ার করে। কিন্তু তার আগেই ডুব দিয়ে অনেক দূরে চলে যাই।

ওরা বাবাকে ভীষণ টর্চার করে। তাঁকে গুলি করে ওরা ওই বাড়ির পাশে অর্ধেক পানিতে ও অর্ধেক রাস্তায় ফেলে যায়। গ্রামবাসী পরে লাশ উদ্ধার করে। ১৮ আগস্ট বিকেলে বাবাকে দাফন করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে।

 

ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত

গণহত্যা চালাইতে পারত না

আরেক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. জমির আলী। তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ৫ নম্বর সেক্টরে। তাঁর ভাষায়, আর্মি আসে সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা আর ছাতকে। ওগো সাহায্য করে শান্তি কমিটির লোকেরা। অনেক মাওলানা কাজ করে শান্তি কমিটিতে। আমাগো ওইখানে শান্তি কমিটির নেতা ছিল আসকর আলী মাস্টার, মাওলানা আবদুস সাত্তার ও রউস মৌলভি। পরে তো রেজাকারে (রাজাকার) লোকজন ভর্তি হইতে থাকে। ওরা অত্যাচার করছে বেশি। আর্মি আসত মাঝে মাঝে। রেজাকাররা ওগো বাড়ি চিনাইত। যুবতি মেয়ে আর খাসি সাপ্লাই দিত। হিন্দু বাড়িতে আক্রমণ করছে বেশি, লুটতরাজও করছে অনেক। ওরা না থাকলে পাকিস্তানিরা এত গণহত্যা চালাইতে পারত না।

ওইখানে নামকরা রেজাকার ছিল বুধাই। তবে ফকির চেয়ারম্যান ছিল তার চেয়েও ভয়ংকর। সুরমা নদীর উত্তরের ঘটনা। একবার ট্রেনিংয়ের লাইগা ১৩ জন ছাত্র বর্ডার পার হইতেছে। এ খবর ফকির চেয়ারম্যান পাঞ্জাবিগো দিয়া আসে। ওরা আইসা সবাইরে গুলি কইরা মারছে।

 

যুবক পেলেই বাধ্য করা হতো

রাজাকারে যেতে

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান। একটি ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন : ট্রেনিংয়ে যখন যাই, তখন অনেকেই সঙ্গে যেতে চেয়েছিল। তাদের বয়স ছিল কম। ফলে রেখে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। নবম শ্রেণিতে পড়ত আব্দুস সালাম ও বাবুল। ওদের বাড়ি পিপড়াছিটে। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা তাদের। যাওয়ার সময় বুঝিয়ে বলেছিলাম, ফিরে এসেই তোদের ট্রেনিং দিমু। গ্রামে থেকেও ওরা গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে কাজ করেছে।

শান্তি কমিটির লোকেরা ওই সময় গ্রামে গ্রামে হানা দিত। পরে অনেকে মিলে কালিয়াকৈরে রাজাকার বাহিনীও গড়ে তোলে। এরপর তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ও তরুণদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বলে। রাজাকারে যারা যায়নি, তাদের ওরা তুলে দিত পাকিস্তানি আর্মির হাতে। মেরেও ফেলেছে অনেককে।

রাজাকার বাহিনীতে না যাওয়ায় সালাম ও বাবুলের ওপরও চড়াও হয় শান্তি কমিটির লোকেরা। চলাচলের জন্য তখন আর্মি ক্যাম্প থেকে কার্ড দেওয়া হতো। ওই কার্ড করতে একদিন তারা যায় কালিয়াকৈরে। ওখানে তাদের পেয়ে রাজাকাররা তুলে নেয়। নির্মমভাবে হত্যা করে। আমাদের সঙ্গে নিয়ে গেলে হয়তো তারা লাশ হতো না। এমন অপরাধবোধ আজও জাগে মনে।

ওরা নিজের ছেলেমেয়েদের

রাজাকার বানায় নাই!

মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন। সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়াসহ ২ নম্বর সেক্টরের নির্ভয়পুর সাব-সেক্টরে এফএফদের (ফ্রিডম ফাইটার) পরিচালনায় বিশেষ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেন, একাত্তরের জুনের শেষ দিকে আমাদের গ্রুপগুলোর চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তখন অস্ত্রহাতে পথে পথে থাকত রাজাকাররা। ওরা পাকিস্তানি সেনাদের রসদ সরবরাহ করত। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা কাজ করত, তাদের ইনফরমেশনগুলো তারাই পাকিস্তানি সেনাদের দিয়ে আসত। শান্তি কমিটির নেতারা নিজের ছেলেমেয়েদের কিন্তু রাজাকার বানায় নাই! তারা এলাকার গরিব ছেলেদের বেশি রিক্রুট করত। ট্রেনিংয়ের লোভ দেখিয়ে বলত, লুটের মাল জায়েজ। সেটা তোমরা পাবা। ওরা ব্রিজ পাহারা দিত। ফলে গেরিলাদের সঙ্গে রাজাকারদের যুদ্ধ হয়েছে বেশি। যদি শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর আর আলশামস না থাকত, তাহলে একাত্তরে পাকিস্তানি সেনারা এত মানুষকে হত্যা করতে পারত না!

 

নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই

মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার আলীর গ্রামের বাড়ি খুলনার নালিয়ার চরে। ট্রেনিংয়ে যাওয়ার আগেই তিনি রাজাকারদের নির্যাতনের শিকার হন। ওই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন : যুদ্ধে যামু। ভেতরে ভেতরে খুঁজতেছি কারা যায়। এক গ্রুপের খবর পাই। কিন্তু ওরা আমারে নেয় না। কিছু খরচ তো সঙ্গে নিতে হইব। মারে বলছি, টাকা দাও। যুদ্ধে যামু। মা মানা করছে। বলে, যাওয়ার দরকার নাই বাপ। একসঙ্গে থাকব। পাঞ্জাবিরা যদি আইসা মারে, সবাই একসঙ্গেই মরমু।

আমার খুব রাগ হইল। বললাম, ওগো গুলি খাইয়া আমি মরমু না। তহনই ঘটল আরেক ঘটনা। আগস্ট মাস। বড় ভাই থাকত কালিয়া উপজেলা থেকে একটু দূরে, চাচরি কদমতলায়। একদিন ওখানে যাচ্ছিলাম। কালিয়াতে যে রাজাকার ও শান্তি কমিটির লোকেরা ক্যাম্প বসাইছে জানতাম না। ওরা আমারে আটকায়। কয়, তুই মুক্তিবাহিনীর লোক। তুই জানস মুক্তিবাহিনী কোথায়। সত্য কথা বললে ছাড়ি দিমু। মিথ্যা কইলে গুলি করমু।

আমি কই, সারা দিন কাজ করি মাঠে। আর সন্ধ্যা হলেই বাড়িত ঘুমাই। মুক্তিবাহিনী কখন আসে কখন যায় আমি তো দেহি নাই।

আমারে খুব মারে ওরা। মেজরের কাছে নিয়া যায়। সন্ধ্যায় আমারে একটা বাংকারের সামনে নিয়া বসায়। আমাকে শুনায়া ওরা প্রচণ্ড গালাগালি করে বঙ্গবন্ধুরে। সে গালির কোনো শেষ নাই। ওরা খেয়াল করে আমি উত্তেজিত হই কি না। উত্তেজিত হইলেই বুঝব মুক্তিযোদ্ধা।

সকালের দিকে কয়েকটা চড় মাইরা ছাইড়া দিল। আমার তহন জেদ চাইপা গেল। খালি খালি ওরা আমারে মারল। ওগো তো ছাড়া যাইব না। বাড়িত আইসাই যোগাযোগ হয় গ্রামের বুলু মোল্লার লগে। তাঁর নেতৃত্বেই এক সকালে ১৯ জনের লগে ট্রেনিংয়ে যাই। রাজাকারগো নির্যাতনের বদলা নিতেই যুদ্ধে যাই।

একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদ, আড়াই লাখ নির্যাতিত মা-বোন এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারসহ পাকিস্তানপন্থী সব বাহিনীর তালিকা চূড়ান্ত ও বিচার করা যুক্তিযুক্ত ছিল। কিন্তু সেটি করতে না পারার ব্যর্থতায় বাঙালি জাতিকে এখনো চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। তবু আমাদের শিকড়ের ইতিহাসে রাজাকার শব্দটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঘৃণিত হয়েই থাকবে।

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ

মাহবুব হাসান

প্রথম বাংলাদেশ আমার চেতনার আকাশ
শরণার্থী শিবিরে এক অসহায় মা । ছবি : রঘু রাই

রণাঙ্গন থেকে ফিরছি টাঙ্গাইল শহরের দিকে। হেঁটে। আমি সেদিন ছিলাম ধলাপাড়ায়। সেই ধলাপাড়া থেকে আমি আর আমার সঙ্গে ছিল আমার ভাগ্নে রফিক এবং দেওপাড়ার রিয়াজ কমান্ডারের তিনজন। তাদের হাতে ছিল একটি ব্রিটিশ এলএমজি ও এসএমজি। ধলাপাড়ার গায়ে লাগানো বংশী নদী পার হলে যে সড়কটি চলে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কালিহাতী থানায়, সামনে গা-ছমছম করা দেওহাটা জঙ্গল, অ্যামবুশ করার জন্য খুব উপযুক্ত, সেটা এড়ানোর জন্য ওই পথে গেলাম না। আমরা ধরলাম আরেকটি পাহাড়ি হালট, যেটা গেছে মধুপুরের দিকে, প্যাচার আটা হয়ে। কিন্তু মধুপুরের দিকেও যাব না। আমরা সরাসরি ঘাটাইল থানাবাড়িতে যাব ঠিক করলাম। ওই পথই ছিল আমাদের জন্য নিরাপদ। কেননা ওই পথ আমার চেনা। আমার মামার বাড়ি হাজিপুর, তাই চেনা এলাকা আমার।

হঠাৎই একটি গাড়ির ধেয়ে আসার শব্দে সচকিত হয়ে পেছনে তাকালাম। ড্রাইভার আমাদের পোশাক দেখেই গাড়ি থামাল। জিজ্ঞেস করল আমরা লতিফ সিদ্দিকীকে দেখেছি কি না। আমরা খবর জানতাম যে লতিফ সিদ্দিকী হেঁটেই রওনা হয়েছেন টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য। গাড়িটা এসেছিল লতিফ সিদ্দিকীকে নেওয়ার জন্য। টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে গতকাল ১১ ডিসেম্বর, আমরাও রওনা হয়েছি হেঁটে। জিপের ড্রাইভার বলল, গাড়িতে আসেন। আমরা সবাই উঠলাম। গাড়ি কিছুদূর যাওয়ার পর বিগড়ে গেল। সময় তখন পড়ন্ত বিকেল। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ড্রাইভার অনেক চেষ্টা করেও স্টার্ট দিতে ব্যর্থ হলে আবারও হাঁটতে থাকলাম আমরা। কিন্তু সেই পাহাড়ি রাস্তায় কত আর হাঁটা যায়? এর মধ্যেই খবর এলো, কিছু পাকিস্তানি আসছে। আমরা অ্যামবুশ করলাম। কিছুক্ষণ পর ধানি ক্ষেতের ওপারে গাছপালার ভেতর দিয়ে হেঁটে কোথাও যাচ্ছে একদল পাকিস্তানি সৈনিক। আমাদের সৈনিকদের একজন এলএমজি দিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করল। ওপাশ থেকেও একঝাঁক গুলি উড়ে এলো। আমরা গাছের গুঁড়ির আড়ালে, তাই কোনো অঘটন ঘটল না। আমরা গুলি করতে বারণ করলাম। ওরা চলে গেল। পাশের এক বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে জিরালাম। ঘণ্টাখানেক পর আবার রওনা হলাম। রাত ১০টার দিকে আমরা পৌঁছলাম ঘাটাইল থানায়। সেখানে পেলাম হেডকোয়ার্টার্সের কম্পানি কমান্ডার খোরশেদকে। তিনি  এক যুদ্ধে গুলি খেয়ে অনেকটাই অসুস্থ ছিলেন। সে কারণে তিনি হেডকোয়ার্টার্সে পোস্টিং পেয়েছিলেন। তিনি ঘাটাইল থানার দায়িত্ব পেয়েছিলেন আগের দিনই। রাত ১১টার দিকে ঝোড়ো বেগে জিপ চালিয়ে এলেন কাদের সিদ্দিকী। তিনি বললেনচলো।

আধাঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইল শহরে।

২.

টাঙ্গাইল স্বাধীন হয়েছে ১১ ডিসেম্বর। ওই দিনই ইন্ডিয়ান ছত্রীসেনারা যুদ্ধবিমান থেকে প্যারাশুট দিয়ে নামেন। তাঁরা প্যারাট্রুপার। তখন মনে হয়েছে অগণন তারা। পরের দিনই দেখলাম, এলেন কর্নেল শ্যাম সিং বাবাজি। তার পরের দিন এলেন জেনারেল অরোরা। সার্কিট হাউসে বসে তাঁরা প্ল্যান করলেন। বািচত হিন্দিতে হচ্ছে, তাই বুঝতে পারছিলাম না। যদিও হেডকোয়ার্টার্সের মুক্তিযোদ্ধা, তাই আমাদের পজিশন বেশ ওপরে ছিল। আমরা অনায়াসেই ওই প্ল্যানের অংশীদার হলাম। কাদের সিদ্দিকীই প্ল্যানের মূল হোতা, তিনি মিরপুরের আমিনবাজারের লোহার ব্রিজের কথা বলছিলেন।

 জেনারেল অরোরা, কর্নেল বাবাজি এবং আরো ভারতীয় উচ্চপদস্থ সেনারা সামনে, আমরা পেছনের সামরিক যানে উঠেছি। মিরপুরের লোহার পুলের কাছে ওরা যেতে পারলেন, আমরা পেছনেই পড়ে রইলাম। আমিনবাজারের লোহার পুলে পাকিস্তানিরা ছিল না। ওখান থেকেই ওয়্যারলেসে কথা বলছিলেন প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভারতীয় জেনারেল। ঠিক হয়েছিল কোথায় আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর হবে। রেসকোর্সে করা হয়েছিল আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করার আয়োজন। তা-ই হলো। কিন্তু না কাদের সিদ্দিকী, না মেজর জিয়া, না এ কে খন্দকার, না মেজর এ টি এম হায়দার, না মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানিকাউকেই সেই টেবিলে ডাকা হয়নি সেদিন। অথচ কলকাতা থেকে হেলিকপ্টারে করে বেসামরিক পোশাকে এ কে খন্দকারকে আনা হয়েছিল। আগরতলা বা সিলেটের সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ওসমানীকে আনা হয়নি। উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধাদের কাউকেই টেবিলের কাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। শুধু পাকিস্তানি জেনারেল ও ভারতীয় জেনারেল বসে স্বাক্ষর করলেন।

৪.

যুদ্ধটা আমরাই শুরু করেছিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের লক্ষ্যে; সেই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য। কেননা, মেজর জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিশন থেকে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডের নাইটাপাড়ায় মুক্তিসেনাদের প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে দখলদার পাকিস্তানি সেনারা। আমাদের অপটু যোদ্ধারা বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি বটে, তবে আমাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার দুর্বার বাসনা জাগিয়েছিল ওই নাইটাপাড়ার যুদ্ধ।

আমরা পাহাড়ি এলাকায় সংগঠিত হলাম। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যাঁরা ইপিআর ও সেনা সদস্য ছিলেন, সঙ্গে কাদের সিদ্দিকী ও খন্দকার ফজলুর রহমান (ব্রিগেডিয়ার ফজলু) ট্রেইনার হিসেবে বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁদের ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে সৈনিকজীবনের ট্রেনিং। নাম না-জানা আরো সৈনিক ছিলেন, যাঁরা কাদেরিয়া বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। ছিলেন ঝনঝনিয়া গ্রামের লাল্টু। তিনিও সেনাবাহিনীতে ছিলেন আর ওই গ্রামেরই দক্ষিণ পাড়ার রহম, ছিলেন দেওপাড়ার রিয়াজতাঁরা কম্পানি কমান্ডার পদে আসীন ছিলেন।

আর মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি ছিল একেবারে তরুণপ্রাণ স্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছাত্র আর চাষারা। আর ছিল কোটি কোটি উৎপাদক মানুষের সমর্থন। ছাত্র-শিক্ষক-কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ, যারা চেয়েছিল মুক্ত হতে শাসন ও শোষণের নাগপাশ থেকে।

৫.

জনযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল শাসনের নিগড় থেকে, শোষণের জাঁতাকল থেকে মেহনতি মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তির রাজপথের নাম গণতন্ত্র। ওই গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ। ধর্ষিত হয়েছে হাজার হাজার মা-বোন-জায়া। তাদের জীবন ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, তার লক্ষ্য কি পূরিত হয়েছে গত ৫৪ বছরে?

এর একটাই উত্তরনা, হয়নি।

কেন হয়নি?

শেখ মুজিবের মতো একজন নিরলস রাজনৈতিক নেতা, যিনি গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি কেন বিজয় অর্জনের পর ক্ষমতায় বসলেন পাকিস্তানি ও ব্রিটিশদের সৃষ্ট ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের শৃঙ্খল প্রশাসনে? ওই প্রশাসন ব্যবস্থায় তো গণতান্ত্রিক শাসনের ছোঁয়াও ছিল না। সেটা কি তিনি বুঝতে পারেননি?

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার

ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

বিজয় দিবসের অঙ্গীকার
প্রচ্ছদ : তানভীর মালেক

আজ ১৬ ডিসেম্বর জাতি আনন্দ-উল্লাসের সঙ্গে ৫৫তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে। বিজয় দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে অনেক কথাই স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে, এইতো সেদিন আমরা মুক্তিযুুদ্ধে অংশগ্রহণ করলাম। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে এলাম। একটি জাতির জীবনে অর্ধশতাব্দী কম সময় নয়। এই সময় দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট আমাদের সবার জানা। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করি। ওই বছরের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় এবং একই বছর ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করি। তাই ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস অত্যন্ত আনন্দের এবং উল্লাসের। প্রতিবছর দিনটি যখন ফিরে আসে, তখন আমরা এই দিনের তাৎপর্য নতুনভাবে অনুভব করার চেষ্টা করি। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ঘটনাবহুল বিজয় দিবসের কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

১৯৭১ সালে যখন দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন চলছিল, তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন তরুণ শিক্ষক। মাত্র কয়েক বছর আগেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়েছি। অসেহযোগ আন্দোলনের কারণে সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বন্ধ ছিল। আমি ঢাকা ছেড়ে নিজ শহর ফেনীতে চলে যাই। মার্চ মাসের ২৫ তারিখ রাতির বেলা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ঢাকায় ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে।

এমন এক অবস্থায় ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা ভেসে আসে। দিশাহারা জাতি যেন দিকনির্দেশনা খুঁজে পায়। মেজর জিয়ার সেই দিনের স্বাধীনতার ঘোষণা আমার মনে কী যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল, তা এখন বলে বোঝানো যাবে না। আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি, যেকোনো মূল্যেই হোক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেব। একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং সব শিক্ষককে কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শে আমি ঢাকা এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজ কর্মস্থলে যোগদান করি। কিন্তু এখানে বেশিদিন থাকা সম্ভব হয়নি। নানাভাবে হুমকি দেওয়া হতে থাকে। এক পর্যায়ে আমি ফেনী শহরে চলে যাই এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি ভারতে অবস্থান করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে কাজ করেছি।

ভারতে অবস্থানকালে আমরা দেশের স্বাধীনতার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম। ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিক থেকেই যুদ্ধের ফলাফলের চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় এবং পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারি বিজয় অতি সন্নিকটে। ১৬ ডিসেম্বর আমরা রেডিও মারফত পাকি বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ জানতে পারি। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী রেডিওতে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ঢাকা এখন মুক্ত এবং স্বাধীন দেশের রাজধানী। রেডিওতে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত বিজয় এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ শুনে সেদিন কী যে খুশি হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পাশের মিষ্টির দোকানে গিয়ে কয়েক প্যাকেট মিষ্টি কিনে আস্তানায় ফিরে আসি। তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমরা সত্যি সত্যি স্বাধীনতা অর্জন করেছি। মিষ্টি নিয়ে আমার আবাসস্থল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে গিয়ে এর বাসিন্দাদের মধ্যে বিতরণ করি। পরে আরো কয়েক প্যাকেট মিষ্টি কিনে বউবাজারে বিকাশদা ও ধ্রুবদার মেসে উপস্থিত হই। সবাই মিলে আনন্দ করে মিষ্টি খাই। এ সময় কেউ কেউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে থাকে। রাতের বেলাই আমাদের অনেক শরণার্থী শিক্ষকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিই। ডিসেম্বর মাসের ১৬ তারিখে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলেও আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারিনি। কারণ যে চাকরিতে নিয়োজিত ছিলাম, সেখান থেকে রিলিজ নিয়ে আসতে কয়েক দিন লেগে যায়। মন আর একমুহূর্ত সেখানে থাকতে চাইছিল না। কিন্তু নানা কারণেই আমাদের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন কিছুটা বিলম্বিত হয়। অবশেষে ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি কলকাতা থেকে বিমানে আগরতলা পৌঁছি। একই দিন আগরতলা থেকে একটি বাসযোগে বিলোনিয়া সীমান্তে এসে উপস্থিত হই। রাত তখন আনুমানিক ৯টা। আমার সঙ্গে ছিলেন শহীদ উদ্দিন আহমেদ। বিলোনিয়া পৌঁছে দেখি, সেখানকার অধিবাসীরাও আনন্দে আত্মহারা। আমি, শহীদ উদ্দিন আহমেদ এবং আরো কয়েকজন যাত্রী মিলে একটি জিপ ভাড়া করে রাত ১০টার দিকে ফেনীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করি। বিধ্বস্তপ্রায় রাস্তা দিয়ে ফেনী আসতে আমাদের প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে। রাত ১টা নাগাদ ফেনী শহরে উপনীত হই এবং অত্যন্ত দ্রুত বাড়িতে প্রবেশ করি। আমি বাড়িতে প্রবেশ করলে মা-বাবা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে আমি ফিরে এসেছি। তাঁরা ভেবেছিলেন, হয়তো আমি বেঁচে নেই। তাই তাঁরা আমাকে ফিরে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। মা-বাবাসহ পরিবারের সবাই বেঁচে আছেন, এটা জেনে আমি চিন্তামুক্ত হই এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমাদের পরিবারের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। বিশেষ করে আমি মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছি, এটা জানার পর রাজাকার বাহিনী আমার পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে। সেই ভীতিকর দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আমার বাবা বলেন, প্রতিদিন ভোরবেলা ফজরের নামাজ আদায় করার পর মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকতাম। আর এশার নামাজ আদায় করার পর হিসাব করতাম, তাহলে আরো একটা দিন বাঁচলাম। বাবার বলা এই একটিমাত্র কথা থেকেই মুক্তিযুদ্ধকালে আমার পরিবারের মনোযন্ত্রণার বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারি। কী দুঃসহ ছিল সেইসব দিনের স্মৃতি! এমন যন্ত্রণার বিষয় শুধু অনুভব করা যায়; বর্ণনা করা যায় না।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থানকালে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে অবাধে মেশার সুযোগ পাই। এ অবস্থায় আমি তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ও চাওয়া সম্পর্কে অবহিত হওয়ার চেষ্টা করি। যাঁরা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়া ছিল না। তাঁরা চেয়েছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হবে এবং এ দেশের মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বসবাস করবে। এখানে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না। সবাই ন্যায্যতার ভিত্তিতে স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারবে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন আত্মসমর্পণ করে, সারা দেশে আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেই নানা ধরনের অনিয়ম-অনাচার শুরু করে। তারা মানুষের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করা হয়। সারা দেশে শুরু হয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ব্যাপক লুটপাট। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, লাইসেন্স-পারমিটবাজি হয়ে দাঁড়ায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সারা দেশে ভয়াবহ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দলীয়করণ-আত্মীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় ১৯৭৪ সালে ঘটে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যাতে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। সেই সময়ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা খাদ্যসামগ্রী দেশের বাইরে পাচার করতে থাকে। শাসকদলের নেতাকর্মীরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শোষকে পরিণত হয়। আর দেশের মানুষ অসহায়ভাবে তাদের শোষণের শিকার হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের মধ্যে যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা ম্লান হয়ে যায়। জাতি বিভিন্ন গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে দেশকে একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা। কিন্তু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের সব রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করে। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার কারণে দেশে মারাত্মক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। একাধিক রাজনৈতিক দল সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট হয়। স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে দেশের জনগণকে বিভক্ত করে ফেলা হয়। সেই বিভক্তি পরে আর কখনোই দূর হয়নি। বেশ কয়েকবার জাতিকে ফের ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ এলেও রাজনীতিবিদদের অপরিণামদর্শিতার কারণে তা কাজে লাগানো যায়নি। বিশেষ করে ১৯৯০ সালে সামরিক স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতন ঘটলে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।  এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তিন জোটের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছিল, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে এত বিভক্তি ও হানাহানির আশঙ্কা সৃষ্টি হতো না।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য ছিল সব ধরনের বৈষম্যমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিষ্ঠা করা এবং বৃহত্তম জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে যে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে দেশ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা। এরই মধ্যে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছে। আগামী দিনে রাজনৈতিক দলগুলো যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে, তাহলে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রত্যাবর্তনের রাস্তা বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 ১৬ ডিসেম্বর আমাদের শিখিয়েছে, কিভাবে সম্মিলিত ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে হয়। তাই আজ আমাদের অঙ্গীকার হোক, দৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে সব সমস্যার সমাধান করব। কোনো কারণেই ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেব না। দেশ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে; আর মানুষ সুন্দরভাবে বাঁচাতে পারলেই সুন্দর ভবিষ্যৎ রচনা করা সম্ভব হবে। ১৬ ডিসেম্বরের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনাহীন এক নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়  ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

 

 

ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ | কালের কণ্ঠ