• ই-পেপার

দেয়ালে নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি

  • মাহবুব আলম

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হোক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন আশার আলো

হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হোক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের নতুন আশার আলো

নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ফোনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যথাক্রমে দিল্লি ও বেইজিং সফরের আমন্ত্রণ জানান। নানা জল্পনাকল্পনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন। আগামী ২১ ও ২২ জুন দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে তিনি মালয়েশিয়ায় অবস্থান করবেন। আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং ভারত-চীন প্রতিযোগিতার বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। পরীক্ষিত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য, শ্রমবাজার, অর্থনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা-সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তাই সামগ্রিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রথম বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক।

ভারত ও চীনের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর বিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রেখে এগিয়ে চলাটা জরুরি। তাই মালয়েশিয়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফর শুরুর বিষয়টিকে বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক কূটনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। আলোচ্যসূচি এখনো চূড়ান্ত না হলেও আসন্ন সফরে অভিবাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে বন্ধ থাকা এই বিশাল শ্রমবাজারটি উচ্চ পর্যায়ের এই সরকারি সফরের মাধ্যমে পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। আশা করা যায়, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে অত্যন্ত ইতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের দ্বার উন্মোচিত হলে দুই দেশের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হবে। বর্তমান সরকার তাদের মেয়াদকালের পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের বৈদেশিক কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ পুনরায় শুরু হলে নতুন সরকারের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের শুভ সূচনা হবে।

মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শুরুর দিকে যে কয়টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, মালয়েশিয়া তার অন্যতম। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী মালয়েশিয়ায় ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন কর্মী প্রেরণের মাধ্যমে অভিবাসন কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি নিয়োগের চুক্তি হয়। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ বাংলাদেশি শ্রমিক। এ ছাড়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। মালয়েশিয়া বাংলাদেশে পাম অয়েল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানি করে এবং বাংলাদেশ থেকে পোশাক, চামড়া ও ওষুধ আমদানি করে। এ ছাড়া পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কারণে বাংলাদেশের মানুষের জন্য মালয়েশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে মালয়েশিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, রপ্তানি, শ্রমবাজার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে চলমান সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। তবে এই সফরে সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে অভিবাসন, বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ককে প্রাধান্য দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ৯ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত। নিজস্ব কর্মী চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হওয়ায় মালয়েশীয় সরকার বিদেশি কর্মী নেওয়া স্থগিত করার আগ পর্যন্ত ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চার লাখ ৭৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। সে সময় বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা না থাকায় মালয়েশীয় সরকার বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়াসহ ১৫টি সোর্স কান্ট্রি থেকে নতুন করে কর্মী নেওয়া স্থগিত করে। কিন্তু সম্প্রতি কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির সরকার অন্য কয়েকটি সোর্স কান্ট্রি থেকে কর্মী নেওয়া শুরু করলেও বাংলাদেশ এখনো কর্মী প্রেরণ শুরু করতে পারেনি। জানা গেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ নিয়ে বাংলাদেশে নানা অসংগতিপূর্ণ মামলার কারণে সেখানে কর্মী প্রেরণের জট খুলছে না। আশা করা যাচ্ছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে কর্মী প্রেরণের এই জট পুরোপুরি খুলে যাবে।

চলতি অর্থবছরের মে পর্যন্ত মালয়েশিয়া থেকে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলার প্রবাস আয় আমাদের রিজার্ভে যুক্ত হয়েছে। সেই বিবেচনায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুনভাবে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার পাশাপাশি আনডকুমেন্টেড কর্মীদের আইনি প্রক্রিয়ায় বৈধ করা এবং কর্মীদের ন্যায্য মজুুরি, নিরাপদ অভিবাসন ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে এই সফরে ফলপ্রসূ আলোচনা হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া নির্ভর। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোতে কর্মী যাওয়া একেবারেই কমে এসেছে। অন্যদিকে নানা আইনি জটিলতায় বন্ধ রয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ। এই প্রেক্ষাপটে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং নতুন আশার আলো হয়ে উঠতে পারে।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের সুনাম দীর্ঘদিনের। অন্যান্য দেশের কর্মীদের তুলনায় বাংলাদেশি কর্মীরা কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারেন। তাই মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের কাছেও বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা সব সময়ই বেশি। এটি বাংলাদেশের কর্মঠ ও পরিশ্রমী যুবসমাজের জন্য একটি বিশাল সুযোগ। এ ছাড়া মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুতগতির। দেশটির উৎপাদন, নির্মাণ, কৃষি, প্ল্যান্টেশন এবং সেবা খাতে বিপুল পরিমাণ বিদেশি শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার এই বিশাল শ্রমবাজারের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আমাদের অতীতের ভুলত্রুটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সফলভাবে কর্মী প্রেরণ করতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো ‘দক্ষতা’। বর্তমান বিশ্ববাজার শুধু সাধারণ শ্রমিকের নয়, বরং দক্ষ জনশক্তির খোঁজ করছে। মালয়েশিয়াও এখন প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিল্পায়নের দিকে ঝুঁকছে। তাই আমাদের পুরনো ধারার অদক্ষ কর্মী পাঠানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মালয়েশিয়ার কোন কোন খাতে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে, তা আগে থেকেই নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী আমাদের অভিবাসী ইচ্ছুকদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কনস্ট্রাকশন, ড্রাইভিংসহ বিভিন্ন আধুনিক মেশিনারিজ পরিচালনার ওপর প্রশিক্ষণ ও ভাষাজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে কর্মী পাঠাতে পারলে তাঁদের বেতন যেমন বেশি হবে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে তাঁদের মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার শুধু রেমিট্যান্স প্রবাহই বাড়াবে না, বরং এটি দেশের বেকারত্ব দূরীকরণেও এক বিশাল ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি সঠিক কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া না যায়, তবে তা জনমিতিক লভ্যাংশ না হয়ে জনবিস্ফোরণে রূপ নিতে পারে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হতে পারে এই তরুণদের জন্য একটি সম্মানজনক জীবিকার উৎস। পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন মালয়েশিয়া সফর বাংলাদেশের জন্য একটি স্বর্ণালি সুযোগ। এই সুযোগ মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের দীর্ঘস্থায়ী নতুন আশায় পরিণত করতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেই আশার আলো জাগিয়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা।

 

লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রা

হাসান আলী

প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য মানে অন্ধকারে যাত্রা

মানুষের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ের জন্য আমরা কমবেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করি। শিশুর জন্মের আগে পরিবার প্রস্তুতি নেয়, শিক্ষাজীবনের জন্য পরিকল্পনা করা হয়, কর্মজীবনের জন্য প্রশিক্ষণ নেওয়া হয়, এমনকি অবসরজীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও অনেকে সঞ্চয় করেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ অধ্যায়—বার্ধক্যের জন্য আমাদের প্রস্তুতি খুবই সীমিত। ফলে অনেকের কাছে বার্ধক্য যেন অন্ধকারে যাত্রার শামিল হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ বার্ধক্যকে নিয়তির ওপর ছেড়ে দেন। কেউ মনে করেন, পর্যাপ্ত অর্থ-সম্পদ থাকলেই বার্ধক্যের সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। আবার কেউ সন্তানদের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে থাকেন। বাস্তবতা হলো, অর্থ কিংবা পারিবারিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলো বার্ধক্যের সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার নিশ্চয়তা নয়। সুস্থ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি এবং সক্রিয় জীবনযাপনের মানসিকতা।

সক্রিয় বার্ধক্যের অন্যতম শর্ত হলো শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। আমরা শারীরিক অসুস্থতার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে যতটা আগ্রহী, মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ততটাই উদাসীন। অথচ বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একাকিত্ব, অবসাদ, উদ্বেগ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মসম্মানবোধের সংকট অনেক প্রবীণের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। এসব বিষয়ে সচেতনতা ও প্রস্তুতির অভাব তাঁদের জীবনকে আরো কঠিন করে তোলে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি শিশুকে আমরা ছোটবেলা থেকেই নানা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করি। তাকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজ একযোগে কাজ করে। কিন্তু একজন মানুষ যখন বার্ধক্যে প্রবেশ করেন, তখন তাঁর জন্য কোনো নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং বা প্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি প্রায় নেই বললেই চলে। কিভাবে বয়সজনিত পরিবর্তন মেনে নিতে হবে, কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে, কিভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে কিংবা কিভাবে একাকিত্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে—এসব বিষয়ে খুব কম মানুষই কোনো দিকনির্দেশনা পান।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বার্ধক্য একটি ব্যক্তিগত যাত্রা। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে, কিন্তু বার্ধক্যের অনেক বাস্তবতা একজন মানুষকে নিজেকেই মোকাবেলা করতে হয়। তাই বার্ধক্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বিলাসিতা নয়, বরং জীবনের অপরিহার্য দায়িত্ব।

সম্প্রতি মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই তাঁর সন্তানদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এবং শাস্তির দাবি জানিয়েছে। প্রবীণদের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতনের ঘটনা অবশ্যই উদ্বেগজনক এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে মা-বাবার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ বিদ্যমান। আইন অনুযায়ী কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার বিচার হওয়া উচিত। তবে কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সব পক্ষের বক্তব্য শোনার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া সমাজের জন্য ইতিবাচক নয়। যদি প্রতিটি পারিবারিক সংকটকে আমরা শুধু সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখি, তাহলে পরিবার নামক প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হলে তার প্রভাব সমাজের ওপরও পড়ে, যা দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষ পরিবারে বসবাস করেন। অন্যদিকে বৃদ্ধাশ্রম ও প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারী প্রবীণের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে আমাদের সমাজে পরিবার এখনো প্রবীণদের প্রধান আশ্রয়স্থল। তাই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার কারণে পারিবারিক সম্পর্ককে সার্বিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না করে পরিবারকে আরো সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।

সময়ের দাবি হলো বার্ধক্যকে শুধু বয়সের বিষয় হিসেবে না দেখে জীবনব্যাপী প্রস্তুতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। আর্থিক সঞ্চয়ের পাশাপাশি প্রয়োজন স্বাস্থ্যসচেতনতা, মানসিক প্রস্তুতি, সামাজিক সম্পৃক্ততা এবং পারিবারিক সম্পর্কের যত্ন। আজকের প্রস্তুতিই আগামী দিনের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের ভিত্তি। কারণ প্রস্তুতিহীন বার্ধক্য সত্যি অন্ধকারে যাত্রার শামিল।

 

লেখক : প্রবীণ বিষয়ে লেখক ও সংগঠক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়ন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

এ কে এম শামসুদ্দিন

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়ন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। ভৌগোলিক নৈকট্য, ঐতিহাসিক সংযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বহুস্তরীয় ও কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। অতীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতাও কমবেশি হয়েছে। দেখা গেছে, বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে ভারতের একচোখা নীতিই সম্পর্কের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গভীর সম্পর্ক ছিল ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত। এ সময়ে বাংলাদেশের জনগণ কিংবা অপরাপর রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভারতের যত না সম্পর্ক ছিল, তার চেয়ে বেশি গভীর সম্পর্ক তারা গড়ে তুলেছিল ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। এতে অবশ্য ভারত বাংলাদেশ থেকে তার শতভাগ স্বার্থ আদায় করে নিতে পেরেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর এই সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভারত নিজ থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার আভাস দিয়ে আসছে। সর্বশেষ এ মাসের গোড়ার দিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের ২৬ সদস্যের গণমাধ্যমের একটি প্রতিনিধিদলের সফরকালে সে দেশের সরকারসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

কিন্তু সম্প্রতি ভোটের মাধ্যমে বিজেপির কট্টর বাংলাদেশবিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি নতুন সমীকরণের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়ন : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জঅনেকে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে প্রভাব ফেলতে পারে। ইদানীং এর কিছু নমুনা লক্ষ করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সম্পর্কিত তাঁর কিছু পদক্ষেপ ও বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে, যেগুলো দুই দেশের সম্পর্ককে শীতল বা উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলতে পারে। এগুলো অনেকটাই এখনো রাজনৈতিক ঘোষণা বা প্রশাসনিক নির্দেশনার পর্যায়ে আছে, তবে এর বাস্তব প্রয়োগ ও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে হয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত, ভোটার তালিকা থেকে বাদ এবং তাদের ভারতছাড়া করা হবে তাঁর প্রাথমিক কাজ এবং সে মোতাবেক তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন। যারা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে শনাক্ত হবে, তাদের আদালতে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের হাতে হস্তান্তর করতে নির্দেশও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের

(CAA) আওতায় শুধু হিন্দু শরণার্থীরা সুরক্ষা পাবে, কিন্তু এর বাইরে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। গ্রাম-গঞ্জ-শহরে তল্লাশি চালিয়ে এসব অভিবাসীকে খুঁজে বের করতেও বলেছেন তিনি। এমনকি রেলওয়ে স্টেশনগুলোতে সন্দেহভাজন অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করতে রেলওয়ে প্রটেকশন ফোর্সকে

 (RPF) নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া ও নিরাপত্তা অবকাঠামো জোরদারের জন্য বিএসএফের সঙ্গে বৈঠক করে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়াও শুরু করেছেন।

এ ধরনের পদক্ষেপকে সংবেদনশীল হিসেবে দেখা বাংলাদেশের পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। কারণ পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ভোটার সংশোধন তালিকা করতে গিয়ে যে ৩১ লাখ বাঙালি মুসলিমকে ভোটদান থেকে বিরত রাখা হয়েছিল, তাঁদের বিষয়ে সে দেশের সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এত বিপুলসংখ্যক নাগরিককে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে যদি পুশ ব্যাকের চেষ্টা করা হয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ব্যাপক ক্ষতি হবে। এটি মানবাধিকার ও কূটনৈতিক দিক থেকে বিতর্ক তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি বাংলাদেশ এসব ব্যক্তিকে নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার না করে।

সীমান্ত নিরাপত্তা বাড়ানো ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এটি সীমান্তবর্তী মানুষের চলাচল, বাণিজ্য ও স্থানীয় সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ মনে করে, সে দেশের নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করে বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে কথায় কথায় সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য অস্বস্তিকর। এতে সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠী ও বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে। শুভেন্দু বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই ‘বাংলাদেশ ইস্যু’কে রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করে আসছেন। অতীতে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন, অবৈধ অভিবাসন ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর

মন্তব্যও করেছেন। এ ধরনের বক্তব্য জনমতকে যেমন প্রভাবিত করে, পাশাপাশি কূটনৈতিক পরিবেশকেও উত্তপ্ত করতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর নির্ভর করে না। পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নির্ধারণ করে। তাই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কঠোর অবস্থান রাজনৈতিক চাপ তৈরি করলেও দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি শীতল হবে কি না, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পদক্ষেপ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ওপর।

আশার কথা, সম্প্রতি বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের ভারত সফরকালে যে আলোচনা হয়েছে, তাতে ভারতের তরফ থেকে কিছু ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে। ভারত এখন পারস্পরিক স্বার্থ ও বাস্তববাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়, যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা হবে মূলভিত্তি। ৪ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মতবিনিময়কালে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, তা বাস্তবায়নে তাঁরা যদি আন্তরিক হন, তাহলে ভালো কিছু হতে পারে বলে আশা করা যায়। মোটাদাগে বিষয়গুলো হলো, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থে স্পর্শকাতর বিষয়গুলো বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া, দেশের স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, সেটি বাংলাদেশই ঠিক করবে। যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে, সেটি হলো অতীতের মতো একটিমাত্র রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে বাংলাদেশকে না দেখে ‘জনগণের সঙ্গে  সংযোগ’ বৃদ্ধি করা। তবে এতকিছুর পরও ভারত আজ পর্যন্ত পলাতক শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার না করে সন্দেহের বীজ বপন করে রেখেছে।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণও এই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলেছেন। বর্তমানে পঙ্কজ শরণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, কৌশলগত বিষয় এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণের কাজ করেন এবং চাহিদামতো ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য, কৌশল ও নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পঙ্কজ শরণ বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদলের সদস্যদের বলেছেন, জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসায় বিএনপির এই সরকারের সময় আগের তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের শাসনামলে তিক্ত সম্পর্কের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন, ওই সময় ভারত মনে করত, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম চালাত। অথচ বাংলাদেশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। ফলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল। এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, পঙ্কজ শরণ দুই দেশের তিক্ত সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে শুধু ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের কথাই উল্লেখ করেছেন। অথচ ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ভারত যে শান্তিবাহিনীকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার কার্যক্রম চালিয়েছিল, সে কথা সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে গেছেন। তবে পঙ্কজ শরণ ভারত যে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে এমন ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের অপরাপর রাজনৈতিক দলের প্রতি আগ্রহ না দেখিয়ে ভারত যে শুধু একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে গেছে এমন ধারণার কথাও বলেছেন। ফলে দুই দেশের সম্পর্কে যে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, তিনি তা-ও উল্লেখ করেছেন।

ভারত সুসম্পর্কের বিষয়ে যতই আন্তরিকতা দেখাক না কেন, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা, সমতা, জনগণের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। এই দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সংবেদনশীল বিষয়গুলো রয়েছে, সে ব্যাপারে উভয় পক্ষ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও নির্ভর করবে। এই দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত করতে হলে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন ব্যবস্থাপনার সুষ্ঠু সমাধান, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভারতের উত্তর-পূূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মোকাবেলায় একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং ভারতের ক্ষমতাসীন দলের অভিবাসনসংক্রান্ত রাজনীতি বন্ধ করা জরুরি। বিশেষ করে ওপারের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্য এবং নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বন্ধে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। তাহলেই পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। অতঃপর উভয় দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ কথা বলা যায়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কোন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা যেমন দেখা দিয়েছে, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে জটিল সমস্যাও আছে।

 

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল

ও কলাম লেখক

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : আস্থা ও অহংকারের প্রতীক

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মনির-উজ-জামান, বিজিওএম, পিএসসি

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : আস্থা ও অহংকারের প্রতীক

মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি স্বাধীন দেশের সূচনালগ্নে যে সাহসিকতা, উদ্দীপ্ত ও চৌকস মনোভাব এবং পেশাদারির পরিচয় দিয়েছিল, তা অহংকার করার মতো। চির উন্নত মম শির, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে তাঁর ব্যক্তিত্বের মর্যাদাকে সাহসী, অকুতোভয় এবং নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য যেকোনো প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারকারী একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে তৈরি করা হয়। এভাবেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্য হয়ে ওঠেন সংস্থার সম্পদ, যা পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রয়োজনে তাঁর পেশাদারি হয়ে ওঠে অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা, যা এই বাহিনীকে অন্য যেকোনো বাহিনী থেকে নিঃসন্দেহে আলাদা করে রেখেছে। এই বাহিনী বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য তার প্রতিটি সদস্যকে যেমন গড়ে তুলছে এবং প্রতিনিয়ত সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তেমনি শান্তিকালে তাঁদের সর্বোচ্চ নিয়োগ ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে সব সময় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সেনাবাহিনী দেশের শিক্ষা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, অবকাঠামো, যোগাযোগ, দক্ষ জনশক্তি ইত্যাদি উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে, যার অনুধাবন আমাদের প্রত্যেককে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আজকের এই অবস্থানে আনার ক্ষেত্রে যে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে এবং অনুপ্রাণিত করেছে, তা হচ্ছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিশাল অংশের খেতাব প্রাপ্যতা প্রমাণ করে দেশের প্রতি তার দেশপ্রেম ও অবদানের কথা, যা সব সময় আমাদের উৎসাহিত এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তরে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু ইতিহাস নয়, তা এই বাহিনীর জন্য একটি নৈতিক দৃষ্টিকোণ। ১৯৭১-এ অস্ত্র প্রশিক্ষণের অসমতা সত্ত্বেও মানুষ-জনতা-যোদ্ধার অসামান্য ঐক্য যে বিজয় এনেছিল, তার শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো বাহিনী দীর্ঘস্থায়ী গৌরব পায় না। জাতি গঠনে সেনাবাহিনীর বর্তমান ভূমিকা বারবার ১৯৭১-এর অঙ্গীকারকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রত্যেকের পাশে সর্বপ্রথম অবস্থান নেওয়া, দেশে ও বিদেশে শান্তি রক্ষায় মানবিক আচরণ বজায় রাখা এবং মর্যাদা রক্ষায় সংযম দেখানোর ধারাবাহিকতার মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্বিত অবস্থানে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নেতৃত্বের রয়েছে এক অনবদ্য চেষ্টা এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার বাস্তবায়ন। নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রত্যেককে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, প্রতিটি সদস্য দেশের সম্পদ এবং পেশাদারির সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা ও উন্নয়নই মূল লক্ষ্য। মূলধারার দুটি প্রশিক্ষণ হচ্ছে শান্তিকালীন এবং বিপৎকালীন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। প্রতিটি সদস্যকেই সব সময় প্রস্তুত ও পুরো বছর ধরে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যোগ্য এবং সর্বোচ্চ ত্যাগের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তৈরি করা হয়। এর বিকল্প নেই। এ ছাড়া শান্তিকালের জন্য প্রতিটি সদস্যকে এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ভাগ্যোন্নয়নে, অর্থনীতির গতিশীলতা আনয়ন, প্রগতিশীল চিন্তা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও স্বাবলম্বীকরণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবভিত্তিক ভূমিকা পালন করতে পারেন। নিচের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করলে আমাদের দেশের উন্নয়নে সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং সক্ষমতার প্রয়োগে সবার আস্থা অর্জনে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে। 

শিক্ষা : জাতির উন্নয়নে শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষাকে একটি জাতির অগ্রগতি ও সার্বিক কল্যাণের ভিত্তিমূল ধরা হয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা ও নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটায় এবং একজন শিক্ষার্থীকে ভবিষ্যতে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। একটি দেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার জনগণের শিক্ষার মান, নৈতিকতা ও দেশপ্রেমের ওপর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই জাতিকে সুশিক্ষিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ, সুসংগঠিত ও নীতিতে অটল প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলে দেশকে উন্নয়নের শিখরে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শিক্ষার মানোন্নয়নে এই বাহিনী ক্যাডেট কলেজ, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল এবং কলেজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করছে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে বিগত তিন বছরে ক্যাডেট কলেজের শতভাগ সফলতা অন্যতম উদাহরণ। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়নে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (বাউস্ট) ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সামরিক সদস্যদের সন্তানাদি ছাড়াও সর্বোচ্চসংখ্যক বেসামরিক সন্তানের জন্য সুযোগ-সুবিধা থাকায় প্রতিবছর ভালো ও ঈর্ষণীয় ফল অর্জনের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সর্বোপরি স্বায়ত্তশাসিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) এরই মধ্যে তার শিক্ষার মান ও সাফল্য বিবেচনায় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছে।

চিকিৎসা : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিচয় শুধু সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সেবায় এই বাহিনীর ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকার প্রমাণ দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। প্রতিটি সেনানিবাসে অবস্থিত সামরিক হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে সেনাবাহিনী কর্তৃক স্থাপিত ও পরিচালিত মেডিক্যাল কলেজগুলো যেমন নতুন ও পেশাদার ডাক্তার তৈরি করছে, তেমনি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশিক্ষণের মান ও যন্ত্রপাতি অত্যাধুনিক হওয়ায় এখন অনেক জটিল রোগের চিকিৎসা সামরিক হাসপাতালগুলো করতে সক্ষম, যা একজন রোগীর আর্থিক সাশ্রয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিছু ক্ষেত্রে বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ তাদের রোগের ধরন অনুযায়ী সামরিক হাসপাতালগুলো থেকে অত্যন্ত উন্নতমানের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছে, যা দেশের প্রতি সেনাবাহিনীর অকৃত্রিম শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ। এ ছাড়া সেনাবাহিনী দুর্গম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা প্রদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় জরুরি মেডিক্যাল টিম গঠন, মোবাইল ইউনিট ও স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে দ্রুততার সঙ্গে চিকিৎসা সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সেনাবাহিনীর প্রতিটি ডিভিশন কর্তৃক প্রতিবছরের বিভিন্ন সময়ের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় মেডিক্যাল ক্যাম্পেইন আয়োজন করে উন্নত চিকিৎসা ও সার্জিক্যাল কার্যক্রম গ্রহণ করার মাধ্যমে এরই মধ্যে চিকিৎসাসেবায় মানবিক সেনাবাহিনী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। 

অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবেলায় দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ প্রতিটি সদস্য সব সময় প্রস্তুত। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় একটি নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠান আয়োজন একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা রাখা প্রতিটি সদস্য তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সুষ্ঠুভাবে পালন করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি অন্যান্য বাহিনী, প্রশাসন এবং সংস্থার আস্থা ও বিশ্বাস। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর প্রতিটি স্তরের নেতৃত্ব কর্তৃক নির্বাচন আয়োজনকারী সংস্থা, বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণকে একটি সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন আয়োজন এবং নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট প্রদানে প্রত্যেককে উৎসাহ ও সাহসী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রয়েছে এক গর্বিত অর্জন। বাংলাদেশের মানুষ দেখেছে এই বাহিনী কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেছে এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের ক্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা হয়ে উঠেছে প্রশ্নাতীত গর্ব ও অহংকার করার মতো।

বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা : জাতিসংঘে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা, অবদান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় সেনাসংখ্যা মোতায়েনের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকবার প্রথম স্থান অর্জন নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো, যা একটি বাহিনীর অনেক উঁচু মানের পেশাদারির বহিঃপ্রকাশ। আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে নিজেদের প্রমাণ করেছি আমরাই সেরা। আমরা যেমন দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছি, তেমনি মানবসেবায় সেনাবাহিনী তৈরি করেছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, জনশক্তি ও স্বাবলম্বীকরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা, যা আমাদের করেছে সেই দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু এবং আস্থা অর্জনে সৃষ্টি করেছি মাইলফলক। সিয়েরা লিওনের মতো দেশের দ্বিতীয় ভাষা হচ্ছে বাংলা, যা সেনাবাহিনীর প্রচেষ্টায় অর্জিত সম্মান অহংকার করার মতো। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সমস্যা সমাধান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে অনুরোধ করা বলে দেয় বিশ্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারি ও গ্রহণযোগ্যতা। এ ছাড়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক রাজস্ব আনার ক্ষেত্রে দেশের অর্থনীতির অন্যতম সঞ্চালক হিসেবে সেনাবাহিনী নিজেকে শ্রেষ্ঠত্বের অংশ হিসেবে প্রমাণ করেছে।

যোগাযোগ : বিশ্বব্যাংকের মতে, সড়ক/যোগাযোগব্যবস্থা হলো সেই ধমনি, যার মাধ্যমে অর্থনীতি স্পন্দিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার যোগ্যতা, পেশাদারি ও সরঞ্জামাদি দিয়ে এ দেশের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নীতকরণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত খাড়া ও দুর্গম ভূখণ্ডে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তার কৌশল ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত টেকসই সড়ক নির্মাণ করছে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে পর্যটনশিল্প একটি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। এ ছাড়া যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী কর্তৃক উৎপাদিত ফল, সবজি ও কৃষিজ সামগ্রী খুব সহজেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যাচ্ছে, যা জীবিকার মানোন্নয়নে অত্যন্ত সহায়ক হিসেবে কাজ করছে। যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি ব্রিজ, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ সেনাবাহিনীর সক্ষমতাকে বারবার প্রমাণ করে, তারাই সেরা। এই সেরাটা প্রমাণ করে সেনাবাহিনীর ওপর দেশের জনগণের আস্থা। চৌকস নেতৃত্ব এবং সুকৌশল পরিকল্পনায় সেনাবাহিনী দেশের যোগাযোগব্যবস্থাকে করেছে উন্নত থেকে উন্নততর এবং দেশের প্রত্যেকেই তার সুফল উপভোগ করছে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে করেছে আরো সুসংহত ও অপ্রতিরোধ্য।

সক্ষমতা ও আধুনিকায়ন : মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণায় প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের দেশের বৈদেশিক নীতিকে সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয় শ্রদ্ধা রেখে নিজেকে স্বাবলম্বী এবং যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুততার সঙ্গে কার্যকর করার ক্ষেত্রে বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকার এবং নেতৃত্ব এই বাহিনীকে আধুনিক বাহিনী হিসেবে রূপান্তর করার ব্যাপারে এরই মধ্যে অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নিজের সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে সব সময় সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সেনাবাহিনী তার নিজস্ব প্রযুক্তি ও জনশক্তি ব্যবহার করে ক্ষুদ্রাস্ত্রের গুলি, রাইফেল, ভারী অস্ত্রের গোলা, গ্রেনেড, মর্টার গোলা, শেল, ড্রোন এবং অন্যান্য সামরিক সক্ষমতার অংশ তৈরিতে/প্রস্তুত করতে সাফল্য অর্জন করেছে ও তা চলমান। এই সক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যাপারে সেনাবাহিনীর চৌকস সদস্যরা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। এ ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন করে নতুন নতুন সামরিক সরঞ্জাম তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন। এই সফলতা আমাদের কারো সঙ্গে যুদ্ধে বা ক্ষতি করতে কখনো উৎসাহিত করবে না, বরং এই সক্ষমতা আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত সুবিধা হিসেবে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করবে।

রাষ্ট্র ও জাতি গঠনের প্রতিটি ধাপে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গঠিত এই বাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, সততা ও কর্মদক্ষতা সবার কাছে এক আস্থার নাম। শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও সেনাবাহিনীর কার্যক্রম একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। বৈশ্বিক শান্তি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়, বরং দেশে ও বিদেশে তার কর্মকাণ্ড প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী হচ্ছে আমাদের আস্থা ও অহংকারের প্রতীক।

 লেখক : সেনা কর্মকর্তা

দেয়ালে নতুন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি | কালের কণ্ঠ