তিন ভাই-বোনের মধ্যে আব্দুর রহমান মেজো। জন্ম ভারতের আসাম রাজ্যে। দেশভাগের পর বাবা পরিবার নিয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। রহমানের বয়স তখন চার বছর। প্রথমে বিক্রমপুরে বসবাস শুরু করে তাঁর পরিবার। দুই বছরের মাথায় মারা যান বাবা। মাও তেমন শিক্ষিত ছিলেন না। ফলে আসামে কোথায় বাড়ি, সেখানে আর কে কে আছেন বা যোগাযোগের মাধ্যম কী—কিছুই জানতে পারেননি রহমান। উল্টো সংসার চালানোর জন্য নেমে পড়তে হয় জীবিকার তাগিদে। ১২ বছর বয়সে মেকঅ্যাপ শিল্পী সালামের সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। অন্য পেশায় যাওয়ার সুযোগ থাকলেও ভালোবাসা ও ভালো লাগার জন্য শেষ পর্যন্ত এই পেশাকেই জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করলেন। একক মেকঅ্যাপ শিল্পী হিসেবে ১৯৬৫ সাল থেকে থিয়েটারে কাজ করলেও চলচ্চিত্রে সুযোগ পান আরো পরে। ১৯৭৬ সালে এ জে মিন্টুর ‘মিন্টু আমার নাম’ দিয়ে শুরু। এরপর বাংলাদেশের প্রায় সব পরিচালকের ছবিতেই কাজ করেছেন। নারায়ণ ঘোষ মিতা, তানভীর মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, হুমায়ূন আহমেদ, এফ আই মানিক, সোহানুর রহমান সোহান—কারো ছবিই বাদ যায়নি! রহমান বলেন, ‘একটা সময় ছিল, সকাল ৮টায় বাসা থেকে বের হতাম আর ফিরতাম মধ্যরাতে। কোনো কোনো দিন ফেরাও হতো না। বাসায় ভাত খাওয়া হতো না। কাজটাকে খুব উপভোগ করতাম। আর তাই ভুলে ছিলাম নিজের সুখ-শান্তি আর ভবিষ্যতের কথা।’ আব্দুর রহমান বিয়ে করেননি। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে শুধু ছোট বোনটাই বেঁচে আছেন, বিক্রমপুরে থাকেন। বয়সের কারণে যাওয়া হয় না তাঁর কাছে। মাঝেমধ্যে ফোনে কথা হয়। তার ওপর কিছুদিন আগে স্ট্রোক করার কারণে বাসা থেকে বেরও হতে পারেন না। এখন চার দেয়ালের মধ্যেই কাটে জীবন। দুর্দশার কথা বলেন নিজেই, ‘মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। কেন যে বিয়েটা করলাম না! হিসাব মেলাতে পারি না। ঢাকা শহরে কেউ নেই। এক ছোট ভাই আমার করুণদশার কথা শুনে বাড্ডায় তার ছোট্ট ফ্ল্যাটে আশ্রয় দিয়েছে। এটাই এখন শেষ ভরসা।’ তিন শতাধিক ছবির মেকঅ্যাপ শিল্পী রহমান। তাঁর হাতে গড়া শিষ্য শরিফুল, সেলিমরা আজ চলচ্চিত্রে সবচেয়ে ব্যস্ত। তবে কেউ ভুলে যাননি ওস্তাদকে। সব সময় খোঁজ-খবর রাখেন। ভালো-মন্দ জানার চেষ্টা করেন। এটুকুতেই খুশি রহমান। এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই। ‘তবে রক্তের সম্পর্কের কেউই নেই পাশে। আমি অসহায়। উন্নত চিকিত্সার জন্য প্রয়োজন টাকা। কোথায় পাব টাকা? চলচ্চিত্র সংগঠন ও সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, আমার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের। জীবনের পুরো সময়টা চলচ্চিত্রের পেছনে ব্যয় করেছি। তাই চলচ্চিত্রও আমাকে কিছু দিক, এটা আমার অধিকার।’ দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন—গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’ ও মাসুদ পথিকের ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ ছবির জন্য। সর্বশেষ ছবি ফকরুল আরেফিন খানের ‘ভুবন মাঝি’। এই ছবির জন্যও জাতীয় পুরস্কার পাবেন বলে তাঁর ধারণা।