শ্রীলঙ্কার একটি কারাগারে দাঙ্গায় ২৮ জন নিহত হওয়ার পর দেশটির কারাগার ব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জোরালো হয়েছে। শুক্রবার মানবাধিকার কর্মীরা বলেছেন, কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় কমাতে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সর্বোত্তম অনুশীলনের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা উচিত।
সরকার ইতোমধ্যে একটি পুরোনো ঔপনিবেশিক যুগের কারাগার পুনরায় চালু করেছে এবং অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাণিজ্যিক রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় শহর নেগোম্বোর কারাগারে বন্দিদের দুটি দলের মধ্যে দুই দিন ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে আটজন কারা কর্মকর্তা এবং ২০ জন বন্দি নিহত হন।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ২০১২ সালের পর শ্রীলঙ্কার কারাগারগুলোতে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘর্ষ। তারা বলেন, দাঙ্গার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভিড়ের সমস্যা। নেগোম্বো কারাগারটি প্রায় ৬৫০ জন বন্দির জন্য নির্মিত হলেও সংঘর্ষের সময় সেখানে প্রায় দুই হাজার ৪০০ জন বন্দি রাখা হয়েছিল।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার ২২টি কারাগারে বর্তমানে প্রায় ৪১ হাজার বন্দি রয়েছে, যা কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতার প্রায় চার গুণ বেশি। বন্দিদের অধিকার সুরক্ষা কমিটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক রসিকা গুণবর্ধনা বলেন, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে বন্দিদের অত্যন্ত কষ্টকর অবস্থায় থাকতে হয়।
তিনি জানান, বন্দিরা তাদের ঘুমানোর ব্যবস্থাকে ‘স্যালমন প্যাকিং’ বলে থাকেন, কারণ রাতে তাদের পালাক্রমে গাদাগাদি করে শুয়ে ঘুমাতে হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা জানান, কারাগারগুলোর অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেক বন্দিকে অমানবিক পরিবেশে থাকতে হচ্ছে। নারী বন্দিসহ কিছু বন্দিকে শৌচাগারের ভেতরেই ঘুমাতে হয়। এ ছাড়া পোশাক পরিবর্তনের মতো ব্যক্তিগত কাজের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত গোপনীয়তা নেই। কারা বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ায় কারাগারগুলোর ওপর আরো চাপ বেড়েছে।
মাদকসংক্রান্ত অপরাধে বন্দির সংখ্যা ২০২১ সালে ৯ হাজার ৩৪৪ জন থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৩১ হাজার ৩১৪ জনে পৌঁছেছে। বর্তমানে এসব বন্দি দেশটির মোট কারাবন্দির ৬৫.৫ শতাংশ।
শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন কমিশনার অম্বিকা সাতকুনানাথন বলেন, ‘আপনাকে যা করতে হবে তা হলো, মানুষকে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত রাখা, মানুষকে কারারুদ্ধ হওয়া থেকে বাঁচানো এবং অতিরিক্ত কারাবাসের বিষয়ে কিছু একটা করা।’
অন্যান্য দেশের প্রমাণ থেকে দেখা যায়, ক্ষতি হ্রাস পরিষেবা, ওপিয়ড প্রতিস্থাপন থেরাপি এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক, প্রমাণ-ভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি মাদকের ওপর নির্ভরতা মোকাবেলায় কার্যকর। হোটেল পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছ। বিচার ও জাতীয় সংহতি মন্ত্রী হর্ষনা নানায়াক্কারা সংসদে জানিয়েছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং কারাগারের চাকরি আকর্ষণীয় না হওয়ায় প্রায় এক হাজার ৩০০ কারা কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ধীরগতিতে চলছে।
কারা বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কারাগারে কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগেও সমস্যা হচ্ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভালো স্কুলের শিক্ষার্থীরা এখন আর কারাগারে চাকরির জন্য আবেদন করছে না। চাকরির আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।’ কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় কমাতে সরকার কয়েকটি পদক্ষেপ নিচ্ছে।
২০১৪ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি পুরোনো ঔপনিবেশিক কারাগারকে হোটেলে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। এর পরিবর্তে সেখানে প্রায় ২ হাজার বন্দি স্থানান্তর করা হবে।
এ ছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর গালের একটি বন্ধ হাসপাতালের অংশ বন্দিদের রাখার জন্য ব্যবহার করা হবে। কলম্বোর উপকণ্ঠে একটি নৌ-শিবিরের ভেতরে নতুন কারাগার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি, কম ঝুঁকিপূর্ণ বিচারাধীন বন্দিদের গৃহবন্দি রাখার সুযোগ দিতে বিদ্যমান আইন পর্যালোচনা করছে শ্রীলঙ্কা সরকার।