টানা সাত দিনের ভারি বর্ষণ, উপচে পড়া জলাবদ্ধতা এবং সাগরে বৈরী পরিস্থিতির মারাত্মক প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বাজারটিতে দৈনিক বেচাকেনা ও আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে এই পাইকারি বাজারে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ কোটি টাকার লেনদেন হয়ে থাকে। তবে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে বর্তমানে মাত্র ৩০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ সাধারণ সময়ের চেয়ে বাজারটিতে প্রতিদিন গড়ে ২২০ কোটি টাকার লেনদেন কমে গেছে, যা শতকরা হিসেবে ৮৮ শতাংশ।
ব্যবসায়ীরা বাজারের এই অচলাবস্থার পেছনে মূলত চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য স্থবিরতাকে দায়ী করছেন। অতিবৃষ্টির কারণে কয়েক দিন ধরে বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও ডেলিভারি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৯ থেকে ১১ হাজার টিইইউএস (২০ ফিট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের একক) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়ার কথা, সেখানে তা নেমে এসেছে চার হাজার থেকে সাত হাজার টিইইউএসে।
কনটেইনারের পাশাপাশি জেনারেল কার্গো বার্থ ও বহির্নোঙরে থাকা মাদার ভ্যাসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাস প্রায় বন্ধ। গতকাল সোমবার সাগরে ৬৯টি পণ্যবাহী বড় জাহাজ অলস বসে থাকায় প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, যা এরই মধ্যে ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গতকাল সোমবার বন্দরের ভেতরে কনটেইনারের স্তূপ ছিল ৪৬ হাজার ৩০২ টিইইউএস। এর আগের দিন রবিবার ছিল ৪৬ হাজার ৯৪৯ টিইইউএস।
একই সঙ্গে সাগরের উত্তাল পরিস্থিতি এবং চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজ কর্ণফুলী নদী ও উপকূলে আটকা পড়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন থমকে গেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের ৭০ শতাংশের বেশি নৌপথে হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাতুনগঞ্জের আড়তগুলোতে।
টানা বৃষ্টিতে বন্যার কারণে চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও কক্সবাজারে যানবাহন চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের বিভিন্ন অংশ বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া এবং সড়কের ভাঙনে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। আবার চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক কেরানীহাট হয়ে বান্দরবানে যাতায়াতের প্রধান রুট হওয়ায় এবং পাহাড়ি সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়াসহ সড়কে পাহাড়ধসে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই উপজেলা, চট্টগ্রাম-রাঙামাটি, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় যাতায়াতে বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের প্রতিবন্ধকতা স্বাভাবিক সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। এ কারণে পাইকারি বাজার ও বন্দরে পণ্য মজুদ থাকলেও বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারা বাজারে আসতে পারছেন না। আবার চাহিদা থাকলেও পণ্য পাঠাতে বিলম্ব ও বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
খাতুনগঞ্জের সেলি এন্টারপ্রাইজের কর্মী রনি বিশ্বাস কালের কণ্ঠকে বলেন, বৃষ্টিপাতের কারণে পণ্য লোডিং-আনলোডিংয়ে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে প্রান্তিক পর্যায়ের বাজারগুলোয় নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।
গতকাল খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ের বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, চিড়া, খেজুরের চাহিদা বেশি বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রতি বস্তা (২৫ কেজি) সাধারণ মানের চিড়ার দাম ১০০ টাকা বেড়ে এক হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁয়াজ দেশি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ টাকা কেজি। অথচ সপ্তাহ আগেও ছিল ২৬-২৭ টাকা। চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে ১০৫ টাকা কেজি। এটির দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে। আর আদা বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা। এটির দাম ১০ টাকা বেড়েছে।
এ ছাড়া কেজিপ্রতি মুড়ির দাম দু-তিন টাকা বেড়ে ৬৫-৬৮ টাকায় (মানভেদে) বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে শুকনা খেজুরের দাম মানভেদে ২০-৩০ টাকা বেড়ে কেজিপ্রতি ১৮০ থেকে ৩০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। সয়াবিন তেল মণপ্রতি (৩৭.৩৮ কেজি) সাত হাজার ৩০০ টাকা, পাম অয়েল মণপ্রতি ছয় হাজার ৩৫০ টাকা, সুপার পাম অয়েল মণপ্রতি ছয় হাজার ৫৫০ টাকা, চিনি মণপ্রতি তিন হাজার ৬২০ টাকা, মোটা মসুর ডাল কেজিপ্রতি ৮০ টাকা, চিকন মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৫০ টাকা, মটর ডাল (অ্যাংকর) কেজিপ্রতি ৪৩-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের দাম প্রতি কেজিতে তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, খাতুনগঞ্জ থেকে পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে গম, ভোজ্যতেল, চিনি ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে বন্দর ও বেসরকারি ডিপোসমূহের জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসন এবং কনটেইনার খালাস স্বাভাবিক করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী নেতারা।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ সাধারণ আড়তদার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সভাপতি সোলায়মান বাদশা কালের কণ্ঠকে বলেন, অতিবৃষ্টিতে খাতুনগঞ্জের আড়তে পানি প্রবেশ করেনি। কিন্তু জেলার অন্যান্য এলাকায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পণ্য সরবরাহ প্রায় বন্ধ। আগে খাতুনগঞ্জে ১০০টি পণ্যবাহী ট্রাক প্রবেশ করলেও এখন ১০টিও প্রবেশ করছে না। বলা যায় বেচাবিক্রি একেবারেই নেই।