পেনাল্টি মিস করেছিলেন, দুটি গোল হজম করে পিছিয়ে পড়েছিল দলও। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত দুরুদুরু বুকে কাঁপতে শুরু করেছিল ভক্তরা। কারণ চোখ রাঙাচ্ছিল দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন জার্মানি ও ব্রাজিলের মতোই বিদায়ের শঙ্কা। কিন্তু চলতি বিশ্বকাপে অদম্য লিওনেল মেসিকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি মিসরের রক্ষণভাগ, তিনি কোটি ভক্তের আশা বাঁচিয়ে রাখতে আবারও ত্রাতার ভূমিকায়। পরের ১৩ মিনিটে (যোগ করা সময়সহ) তাঁর পায়েই রচিত হয়েছে আরেকটি অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে রোমাঞ্চকর জয়ের গল্প। ম্যাচের ২১ মিনিটে স্পট কিকে লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হলেও পরে একটিতে অ্যাসিস্ট করেছেন এবং আরেকটি নিজেই লক্ষ্যভেদ করে দলকে সমতায় ফিরিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ম্যাচের যোগ করা সময়ে এনসো ফের্নান্দেসের গোলে ৩-২ গোলে মিসরকে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। আটলান্টায় গতকাল মঙ্গলবার শেষ ষোলোর ম্যাচে এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। হাল না ছাড়া লিওনেল স্কালোনির শিষ্যরা পরের ১৩ মিনিটে তিন গোল করে নাটকীয় জয় ছিনিয়ে নেয় মেসি ম্যাজিকে।
ফর্মের তুঙ্গে আছেন মেসি। চলতি বিশ্বকাপে গোল করেছেন আর্জেন্টিনার সব ম্যাচেই; কিন্তু সেই মেসি করেন দ্বিতীয়বারের মতো পেনাল্টি মিস। এতেই এক আসরে দুইবার স্পট কিকে গোল করতে না পারা প্রথম খেলোয়াড় হয়ে যান তিনি। মিসরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে প্রথমার্ধে ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ১৫ মিনিটের সময় মারওয়ান আতিয়ার ক্রসে হেড করে বল জালে জড়িয়ে মিসরকে এগিয়ে নেন ইব্রাহিম ইয়াসের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে নিজেদের গৌরবময় বিশ্বকাপের সাফল্য আরো সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে নেমেই সাফল্য পায় মিসর। বিশ্বকাপে এই প্রথম দুই দলের সাক্ষাৎ এটি। অবশ্য সমতায় ফেরার মোক্ষম সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই; কিন্তু পেনাল্টি থেকে গোল করতে ব্যর্থ হন বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বাধিক গোল করা মেসি। এবার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও পেনাল্টি থেকে গোল করতে পারেননি তিনি। এ নিয়ে আটবার বিশ্বকাপে পেনাল্টি নিয়ে সর্বাধিক চারবার মিস করলেন তিনি। টানা তিন বিশ্বকাপে স্পট কিকে গোল করতে না পারার দুর্ভাগ্যও একমাত্র মেসির। ২০১৮ সালের আসরে আইসল্যান্ড এবং ২০২২ সালের আসরে পোল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক।
পরে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের আরো কয়েকটি সুযোগ প্রতিহত করেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। তাঁর দক্ষতার কারণেই সমতায় ফিরতে পারেনি আলবিসিলেস্তেরা। ফলে ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকেই প্রথমার্ধ শেষ করে আর্জেন্টিনা। দ্বিতীয়ার্ধেও আর্জেন্টিনা দাপট নিয়ে খেলেও পাচ্ছিল না গোলের দেখা। উল্টো কাউন্টার অ্যাটাকে মিসর আরেকটি গোল করে, যদিও ভিএআর বিশ্লেষণে তা বাতিল হয় ফাউলের কারণে। তবে ৬৭ মিনিটে মোস্তফা জিকোর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মিসর (২-০)। কিন্তু আক্রমণের ধার কমেনি আর্জেন্টিনার। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রসে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড কমিয়ে দেয় ব্যবধান (২-১)। আরো উজ্জীবিত আলবিসিলেস্তেরা চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং ৮৩ মিনিটেই সমতায় ফেরে তারা। এবার গনসালো মনতিয়েলের পাসে বল পেয়ে দুর্দান্ত শটে গোল করেন মেসি (২-২)। এটি বিশ্বকাপে তাঁর টানা ৯ ম্যাচে গোল।
৯৬ বছর আগের ইতিহাস ফিরিয়েছেন মেসি। দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন হিসেবে তিনিও এক বিশ্বকাপে করলেন আট গোল। ১৯৩০ সালে গিলের্মো স্তাবিল করেছিলেন আটটি গোল।
হতাশ মিসরীয়রা আরো কোণঠাসা হয়ে পড়ে। যোগ করা সময়ে (৯২ মিনিট) লাউতারো মার্তিনেসের ডান প্রান্ত থেকে করা লম্বা ক্রসে হেড করে আর্জেন্টাইন সমর্থকদের আনন্দে ভাসান এনসো ফের্নান্দেস (৩-২)। এবারই প্রথম বিশ্বকাপে দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও জিতল আলবিসিলেস্তেরা। স্নায়ুচাপের সেই জয় এলো মেসির ক্যারিসমায়, শেষ আটে পা রাখল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। আর তাই ম্যাচ শেষে কেঁদেছেন মেসিও, সেটি হারের মুখ থেকে অবাক প্রত্যাবর্তনে যুদ্ধজয়ের সাফল্যের কান্না।




