সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহনমন্ত্রী

সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।
শেখ রবিউল আলম, নৌপরিবহনমন্ত্রী

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের নিশ্চয়তার অভাবকে চিহ্নিত করেছেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘লাইসেন্স বা অনুমোদনের প্রক্রিয়ার তুলনায় শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে না পারাই বর্তমানে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। তাই বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে অনুমোদনপ্রক্রিয়ার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
ব্যবসার সহজীকরণে সরকারের উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার বেসরকারি টিভি চ্যানেল নিউজটোয়েন্টিফোরে আলোচনায় খোরশেদ আলম এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশি উদ্যোক্তারা সাধারণভাবে দুই ধরনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসেন। এক শ্রেণির উদ্যোক্তা শুধু আমদানি-রপ্তানি ও ট্রেডিং ব্যবসা পরিচালনা করেন, আর অন্যরা শিল্প স্থাপন ও উৎপাদনে বিনিয়োগ করেন।’
চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি বলেন, ‘ট্রেডিং ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি অফিস ভাড়া নিয়ে ট্রেড লাইসেন্স করেই কার্যক্রম শুরু করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। তবে শিল্প স্থাপনে বিডাসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিতে হয় এবং প্রায় ১৯ ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে হয়।’
খোরশেদ আলম বলেন, ‘সম্প্রতি চীনা বিনিয়োগকারীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে একজন উদ্যোক্তা অভিযোগ করেন, ছয় বছর আগে কুমিল্লায় শিল্প প্লট বরাদ্দ পেলেও এখন পর্যন্ত সেখানে গ্যাস সংযোগ পাননি। ফলে পরিকল্পনা অনুযায়ী কারখানা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিজ্ঞতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। সরকার একদিকে বিদেশি উদ্যোক্তাদের শিল্প স্থাপনের আহবান জানাচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারলে কারখানা চালু করা সম্ভব হবে না।’
দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের উদাহরণ তুলে ধরে খোরশেদ আলম বলেন, ‘এসব দেশে শিল্পাঞ্চল আগে থেকেই সম্পূর্ণ প্রস্তুত করা হয়। রাস্তা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করার পর বিনিয়োগকারীদের সেখানে শিল্প স্থাপনের আহবান জানানো হয়। ফলে বরাদ্দ পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়।’
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য নির্ধারিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে অনুমোদনপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগেছে। একই সঙ্গে সেখানে নির্ধারিত সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।’
খোরশেদ আলম আরো বলেন, ‘সরকার যে প্রতিশ্রুতি দেবে, সেটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হবে। বর্তমানে দেশের অনেক শিল্প-কারখানা গ্যাসসংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না; ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মিল আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা দিলেই প্রকৃত বিনিয়োগ হয় না। একটি কারখানা চালু হওয়া, উৎপাদন শুরু হওয়া, পণ্য বাজারজাত হওয়া এবং অর্থনৈতিক লেনদেন শুরু হওয়ার পরই সেটিকে প্রকৃত বিনিয়োগ বলা যায়।’
চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করে খোরশেদ আলম বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু লাভজনক ব্যবসার নিশ্চয়তাই চান না, তাঁরা জানতে চান সরকার প্রতিশ্রুত অবকাঠামো নির্ধারিত সময়ে হস্তান্তর করতে পারবে কি না। মীরসরাইয়ে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে সড়ক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক অবকাঠামো কারা নির্মাণ করবে, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। যদি সরকারের দায়িত্ব হয়, তাহলে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আস্থা তৈরি করতে হবে। একইভাবে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় গ্যাস ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘চীনের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে বাষ্প (স্টিম), লজিস্টিকস, ফর্কলিফট, অগ্নিনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকায় উদ্যোক্তাদের আলাদা বিনিয়োগ করতে হয় না। বাংলাদেশেও এ ধরনের সমন্বিত শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।’
খোরশেদ আলম আরো বলেন, ‘শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলাই হবে কার্যকর কৌশল; যেমন—চামড়া, টেক্সটাইল, সিরামিক বা অন্যান্য শিল্পের জন্য পৃথক অঞ্চল নির্ধারণ করা উচিত। এ জন্য বাংলাদেশ থেকে দক্ষ জনবল চীনে পাঠিয়ে তাদের শিল্পাঞ্চল পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জনের ব্যবস্থাও করা প্রয়োজন। দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ২০টি আধুনিক পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা উচিত। দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও বাড়বে। কারণ তাঁরা তুলনামূলক বেশি বেতন দিতে প্রস্তুত থাকলেও উচ্চ দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশা করেন।’
শ্রমিক আবাসন ও সমন্বিত পরিকল্পনার বিষয়ে খোরশেদ আলম বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য আবাসন, যোগাযোগ, বাজার, বাসস্ট্যান্ডসহ প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামোরও পরিকল্পনা থাকতে হবে। চীনের শিল্পাঞ্চলগুলোতে কারখানার কাছেই শ্রমিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে পরিকল্পিত শ্রমিক কলোনি গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে দক্ষ শ্রমিক ধরে রাখা এবং শিল্প পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে।’
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি চীনের খুনমিংয়ে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা অংশ নিলেও তাঁদের অনেকেরই পণ্য উপস্থাপন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিক্রয় কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। বিদেশে অংশগ্রহণের আগে উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন, বিপণন, ক্রেতা ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আচরণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রপ্তানি সম্ভাবনাও কমে যায়।’
সুদের হার ও চীনা ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে খোরশেদ আলম বলেন, ‘বর্তমানে ১৪ শতাংশের মতো উচ্চ সুদের হারে কোনো ব্যবসা টেকসইভাবে পরিচালনা করা কঠিন। বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন। এতে কম সুদে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে এবং দুই দেশের ব্যাবসায়িক লেনদেন আরো সহজ হবে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করা গেলে ডলারের বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি কমবে এবং আমদানিকারকরা লাভবান হবেন। এত বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও এখনো বাংলাদেশে কোনো চীনা ব্যাংক না থাকা একটি বড় সীমাবদ্ধতা।’
চেম্বারের পক্ষ থেকে চীন সরকারের কাছে বাংলাদেশের কয়লা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ উত্তোলনে প্রযুক্তিগত ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া ডিসি বা জেলা প্রশাসকদের প্রত্যাহার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে অনেককে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র কালের কণ্ঠকে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত ডিসিদের প্রত্যাহার করা হবে। কবেনাগাদ ডিসিদের প্রত্যাহার করা হবে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সরাসরি কিছু বলতে রাজি হয়নি। তবে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ‘এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।’
জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিসি নিয়োগের বিষয়টি ছিল বিতর্কিত। তখন জনপ্রশাসন সচিব পদে ছিলেন ড. মোখলেস উর রহমান। অনেকটা তড়িঘড়ি ফিটলিস্ট তৈরি করে একসঙ্গে ৫৯ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময় এই নিয়োগ বাতিল চেয়ে নজিরবিহীনভাবে সচিবালয়ে বিক্ষোভ করেন ‘বঞ্চিত’ কর্মকর্তারা। হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ৯ জন কর্মকর্তাকে পরে সরিয়ে নেওয়া হয়। এ নিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভও হয়। নিয়োগে অর্থ কেলেঙ্কারির অভিযোগ বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে অন্তর্বর্তী সরকারকে। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতার আসার পরে মাঠ প্রশাসনে ডিসি নিয়োগে স্বচ্ছতা এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
নতুন ডিসি নিয়োগে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পরীক্ষা নেওয়া হয় গত এপ্রিলের প্রথমার্ধে। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একাধিক জেলার ডিসিকে প্রত্যাহার করে নতুন ডিসি নিয়োগের সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
জানা যায়, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রকাশ্যে কাজ করেছেন, তাঁদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা তাদের খুঁজে বের করতে কাজ শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে সম্প্রতি হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার ইস্যুতে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। পরে সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির ১০ দিন পরও কর্মস্থলে যোগ দেননি মু. রেজা হাসান।
গত ২৮ জুন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে জানায়। ওই প্রজ্ঞাপন জারির পর রেজা হাসান কুমিল্লার ডিসির দায়িত্ব ছাড়লেও সিলেটে আর যোগ দেননি।
ডিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরও কী কারণে তিনি ওই পদে এখনো যোগ দেননি, এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্যও দিতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসন। সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, এ বিষয়ে (ডিসির যোগদান করা কিংবা না করা) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বলতে পারবে।
তবে স্থানীয় একটি রাজনৈতিক সূত্র জানায়, সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে মু. রেজা হাসানের নিয়োগের বিষয়টি স্থানীয় একজন মন্ত্রীর মনঃপূত হয়নি। বিষয়টি তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন। এ অবস্থায় সিলেটে আবার নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জামায়াত ও এনসিপির সুপারিশে নিয়োগ পাওয়া ডিসিদের প্রত্যাহার করা হতে পারে। এরই মধ্যে এ কাজ শুরু হয়েছে।’
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে নেত্রকোনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হেলালীর প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বর্তমান জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে যেকোনো রাজনৈতিক বা অন্যায্য প্রভাবমুক্ত রাখা হচ্ছে এবং মেধা, সততা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করার নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এ ছাড়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২০২৫ সাল পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী সরকারি অফিসগুলোতে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি এবং শূন্য পদ রয়েছে পাঁচ লাখ ২১ হাজার ৯২২টি। এসব শূন্য পদ পূরণে সরকার এরই মধ্যে ছয় মাস, এক বছর ও পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে।
কর্মপরিকল্পনায় বর্ণিত ‘স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ’-এর বিষয়ে অন্যান্য মন্ত্রণালয়/বিভাগের নিয়োগের সর্বশেষ অবস্থা এবং শূন্য পদে নিয়োগের তথ্য এবং নিয়োগের অধিযাচন প্রেরণের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুততম সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও শূন্য পদের বিপরীতে নিয়োগের বিষয়ে সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য সব মন্ত্রণালয়/বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।’
গত ১ এপ্রিল দেশের চার জেলার ডিসি প্রত্যাহার করেছে সরকার। তাঁদের প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। যাঁদের প্রত্যাহার করা হয়েছে তাঁরা হচ্ছেন পাবনার জেলা প্রশাসক ড. শাহেদ মোস্তফা, ঠাকুরগাঁওয়ের ইশরাত ফারজানা, রংপুরের মোহাম্মদ এনামুল আহসান ও রাজবাড়ীর সুলতানা আক্তার। তাঁদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। আর নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে রাজবাড়ীতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথোরিটির পরিচালক (উপসচিব) আফরোজা পারভীনকে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ রফিকুল হককে ঠাকুরগাঁওয়ে, একই মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আমিনুল ইসলামকে পাবনায় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সচিব (উপসচিব) মোহাম্মদ রুহুল আমিনকে রংপুরে।
এরপর গত ১ মার্চ দেশের পাঁচ জেলার জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে তাঁদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। এঁরা হচ্ছেন গাজীপুরের মোহাম্মদ আলম হোসেন, পঞ্চগড়ের কাজী মো. সায়েমুজ্জামান, কুষ্টিয়ার মো. ইকবাল হোসেন, নেত্রকোনার মো. সাইফুর রহমান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মো. শাহাদাত হোসেন মাসুদ।
গত বছর নভেম্বরে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২৩ জেলায় ডিসি পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করে অন্তর্বর্তী সরকার।

ইরানের পবিত্র নগরী কোমের ঐতিহাসিক জামকারান মসজিদে গতকাল মঙ্গলবার ভোরে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনির দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শীর্ষস্থানীয় আলেম আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি আলী খামেনি এবং তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যদের জানাজার ইমামতি করেন। উল্লেখ্য, কোম একটি পবিত্র শহর, যেখানে শিয়া ইসলামের সবচেয়ে প্রভাবশালী মাদরাসা ও তীর্থস্থানগুলো অবস্থিত। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত আকাশ থেকে ধারণকৃত ফুটেজে দেখা গেছে, প্রায় ১৫ লাখ মানুষের শহর কোমের রাস্তাগুলো শোকাহতদের ভিড়ে ঠাসা ছিল। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ৯৩ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ ও প্রভাবশালী শিয়া ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমোলি মসজিদের ভেতর একটি প্রার্থনাসভা পরিচালনা করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জনতা সমস্বরে স্লোগান দিচ্ছিল, ‘আমেরিকার ধ্বংস হোক’, যা ইরানের সরকারি সমাবেশগুলোতে প্রায়ই শোনা যায়—এমন একটি স্লোগান। অন্যান্য টেলিভিশন ফুটেজে দেখা গেছে, পাগড়ি পরিহিত ধর্মগুরুসহ শোকাহতরা শহীদ খামেনি এবং তাঁর সঙ্গে শহীদ চার আত্মীয়ের কফিনে শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, যাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪ মাস বয়সী এক নাতনিও রয়েছে। এরপর ট্রাকে করে মরদেহগুলো নিয়ে একটি মিছিল নবী মুহাম্মদের বংশধর অষ্টম শিয়া ইমাম রেজার বোন ফাতিমা মাসুমেহর সমাধিসৌধের দিকে এগিয়ে যায়।
এ সময় পথজুড়ে শোকাহত মানুষের উপস্থিতিতে কোমের প্রধান সড়কগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ইরানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আসা নারী-পুরুষ, তরুণ ও প্রবীণরা গত সোমবার রাত থেকেই জামকারান মসজিদ প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় সমবেত হতে শুরু করেন। ভোর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল আরো বাড়তে থাকে। শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া মানুষের হাতে ছিল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় পতাকা এবং লাল রঙের ‘ইয়া লিসারাতিল হুসাইন’ পতাকা। শোক, দোয়া ও স্লোগানের মধ্য দিয়ে তাঁরা তাঁদের প্রিয় নেতাকে শেষবিদায় জানান। অনেক শোকাহত ব্যক্তি হেঁটে এবং অনেকে যানবাহনে করে শোকযাত্রায় যোগ দেন। তাঁদের হাতে ছিল ইরানের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি লাল পতাকা।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য শহীদ হন। এর প্রায় চার মাসের গত শুক্রবার (৩ জুলাই) তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় আয়াতুল্লাহ খামেনির মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। এরপর শনি ও রবিবার বিদায় অনুষ্ঠান ও জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার তেহরানের রাজপথে লাখো মানুষের অংশগ্রহণে শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোক অনুষ্ঠান ইরানের পবিত্র শহর ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও অব্যাহত থাকবে। বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে চূড়ান্ত জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
আয়োজকদের ভাষ্য, শোকযাত্রা সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে। কারণ এটি দামাভান্দ স্ট্রিট, ইমাম হুসেন স্কয়ার, ইনকিলাব স্ট্রিট, আজাদি স্ট্রিট, আজাদি স্কয়ার এবং মেহরাবাদ বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত শহীদ লাশগরি হাইওয়ে হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে।
তিন দিনে দুই শহর অশ্রু আর শ্রদ্ধায় ভাসল : তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায়, রাজধানীতে দীর্ঘ শোকযাত্রা এবং গতকাল মঙ্গলবার পবিত্র কোমায় টানা তিন দিন ধরে শেষবিদায় অনুষ্ঠানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে বলে ইরানিরা মনে করছে। বলা হচ্ছে, দোয়া, অশ্রুপাত, নীরবতা ও স্লোগানে শহীদ শীর্ষ নেতার প্রতি ইরানিদের আবেগ ও শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে বারবার।
স্পিকারের বার্তা : ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার বাকের কলিবফ এক শোকবার্তায় বলেছেন, শহীদদের হত্যাকারীরা তাদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি থেকে রেহাই পাবে না। তিনি আরো বলেন, ন্যায়বিচার ও প্রতিরোধের আদর্শের প্রতি ইরানের জনগণের অঙ্গীকার অব্যাহত থাকবে।
কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা : ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এক বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ইরানের জনগণের সঙ্গে সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা উচিত; অন্যথায় তার জবাবও ভিন্ন ভাষায় দেওয়া হবে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল কায়ানি বলেন, শহীদ নেতার স্মৃতি প্রতিরোধের শক্তিকে আরো সুসংহত করবে এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে ঐক্য আরো জোরদার করবে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এক বার্তায় বলেছেন, একজন মহান নেতা বিদায় নিয়েছেন; কিন্তু তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা, দেশপ্রেম এবং প্রতিকূলতার মুখে দৃঢ় থাকার এক স্থায়ী প্রেরণা হয়ে থাকবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও রেডিও তেহরানের বিদায়ি উপস্থাপক