বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একাধিক ইপিজেড (চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড) এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রুত প্রসার ও শিল্প-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের (এয়ার কার্গো) চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্গো ফ্লাইট ও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ব্যবসায়ীরা যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন, তা নিরসনে এই পদক্ষেপ নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সরকারের অনুমতি মিললে এ বছরের শেষে সরাসরি এয়ার শিপমেন্ট কার্যক্রম শুরু হতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ আমলে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল শুরু করে। ২০১৩ সালে বছরে ১৫ লাখ যাত্রী পরিবহনে সক্ষম এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকাও-এর স্বীকৃতি লাভ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো পরিবহন এবং এর ফলস্বরূপ রাজস্ব আয় উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। একসময় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে থাই এয়ার, সিল্ক এয়ার, কুয়েত এয়ার, ইতিহাদ ও এমিরেটসের কার্গো ফ্লাইট চলাচল করত। ২০২২ সালের আগে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্য আসত। দুবাই-চট্টগ্রাম-ব্যাংকক এবং দুবাই-চট্টগ্রাম-দুবাই রুটে এমিরেটস পণ্য পরিবহন করত। তবে ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবরের পর এমিরেটসের কোনো ফ্লাইট আর আসেনি।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্গো ভিলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এই অঞ্চল থেকে উৎপাদিত তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য ফিনিশড গুডস রপ্তানির জন্য সড়কপথে ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়, যা একদিকে যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুলও। সাম্প্রতিককালে ভারত কর্তৃক ট্রানজিট সুবিধা বাতিলের পর এই সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতকে এড়িয়ে এয়ার ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে তৈরি পোশাক পাঠানোর জন্য চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সরাসরি পণ্য পরিবহনের জন্য শাহ আমানত বিমানবন্দরে ২৭০ টন ধারণক্ষমতার দুটি ওয়্যারহাউস প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি অত্যাধুনিক স্ক্যানার এবং ওয়েট মেশিন সচল করা হয়েছে, যা দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পণ্য হ্যান্ডলিং নিশ্চিত করবে। এই উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের রপ্তানিকারকরা এখন সরাসরি তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাতে পারবেন, যা তাঁদের সময় ও খরচ সাশ্রয় করবে।
চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমানে শাহ আমানতের কার্গো স্টেশনে ২৫০ টন আমদানি এবং ২০ টন রপ্তানি পণ্যের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে আমদানি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ থাকায় স্টেশনটি অনেকটাই অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। তবে এখন সপ্তাহে বড় সাইজের দুটি কার্গো ফ্লাইট এলেও তা হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম এই স্টেশনটি। এবার শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে এয়ার শিপমেন্ট চালু করতে তিনটি ধাপে সংস্কারকাজ চলছে। ওয়্যারহাউস ক্যাপাসিটি (২৭০ টন সক্ষমতা), যা দিয়ে সপ্তাহে দুটি ওয়াইড বডি কার্গো ফ্লাইট হ্যান্ডল করা সম্ভব। এর মধ্যে কাস্টমসও বিমানবন্দরের কার্গো শাখায় স্থায়ীভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব দিচ্ছে।’
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানোর খরচ কলকাতার তুলনায় দ্বিগুণ। এর অন্যতম কারণ হলো এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশিদের দুর্বল অবস্থান। তবে সম্প্রতি ভারত ট্রানজিট সুবিধা বাতিল করায় বিমানে কার্গো রপ্তানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা কাজে লাগাতে কর্তৃপক্ষ পরিসর বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে চীন হয়ে পণ্য রপ্তানিতে নতুন ফ্লাইট চালু হচ্ছে, যা চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশ এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দেবে। চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ইউরোপে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইয়ংওয়ান তাদের পণ্য পাঠানোর মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু করবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বড় বড় গার্মেন্টস গ্রুপগুলো চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারবে।
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএর পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কার্গো ফ্লাইট চালু হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমবে এবং ঢাকার ওপর চাপও হ্রাস পাবে।’ এমিরেটস ও ইতিহাদের স্থানীয় এজেন্ট ভয়েজার এভিয়েশনের ম্যানেজার মোরশেদুল আলম বলেন, ‘শুধু কার্গো ফ্লাইট চালু করলেই হবে না, রপ্তানি কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ইডিএস এবং আরএ-থ্রি স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব সুবিধা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেই। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ইউরোপে সরাসরি পণ্য পাঠাতে হলে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক।’
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকার ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ এম চৌধুরী সেলিম বলেন, ‘চট্টগ্রামে কমার্শিয়াল কার্গো না আসায় আমাদের ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদি এসব কার্গো চট্টগ্রামে আসত, তাহলে আমাদের সময় ও খরচ অনেক কমে যেত। এখন ঢাকা থেকে পণ্য আনতে গিয়ে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। কখনো জট লেগে এ সময় আরো বেড়ে যায়। চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের কমার্শিয়াল ক্যাপিটাল, তাই এখান থেকে কার্গো ফ্লাইট চালু করা অত্যন্ত জরুরি। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট চালু হলে আমাদের ব্যয় আরো কমবে।’
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর জানিয়েছেন, ‘ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ করার বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য ইতিবাচক। এখন আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারব। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কাজে লাগিয়ে আমরা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইউরোপসহ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে কার্গো পরিবহন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।’




