• ই-পেপার

শতকোটি ডলার ছাড়াল কৃষিপণ্য রপ্তানি

চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য যাবে সরাসরি

সরকারের অনুমতি মিললে এ বছরের শেষে সরাসরি এয়ার শিপমেন্ট কার্যক্রম শুরু হতে পারে সরাসরি পণ্য পরিবহনের জন্য শাহ আমানত বিমানবন্দরে ২৭০ টন ধারণক্ষমতার দুটি ওয়্যারহাউস প্রস্তুত করা হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য যাবে সরাসরি

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্য পাঠানোর এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একাধিক ইপিজেড (চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড, কোরিয়ান ইপিজেড) এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের দ্রুত প্রসার ও শিল্প-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের (এয়ার কার্গো) চাহিদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্গো ফ্লাইট ও পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে ব্যবসায়ীরা যে ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন, তা নিরসনে এই পদক্ষেপ নতুন আশার সঞ্চার করেছে। সরকারের অনুমতি মিললে এ বছরের শেষে সরাসরি এয়ার শিপমেন্ট কার্যক্রম শুরু হতে পারে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ আমলে যাত্রা শুরু করা চট্টগ্রাম বিমানবন্দর নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের সঙ্গে বিমান চলাচল শুরু করে। ২০১৩ সালে বছরে ১৫ লাখ যাত্রী পরিবহনে সক্ষম এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকাও-এর স্বীকৃতি লাভ করে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো পরিবহন এবং এর ফলস্বরূপ রাজস্ব আয় উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। একসময় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে থাই এয়ার, সিল্ক এয়ার, কুয়েত এয়ার, ইতিহাদ ও এমিরেটসের কার্গো ফ্লাইট চলাচল করত। ২০২২ সালের আগে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্য আসত। দুবাই-চট্টগ্রাম-ব্যাংকক এবং দুবাই-চট্টগ্রাম-দুবাই রুটে এমিরেটস পণ্য পরিবহন করত। তবে ২০২২ সালের ১৩ অক্টোবরের পর এমিরেটসের কোনো ফ্লাইট আর আসেনি।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি পূর্ণাঙ্গ কার্গো ভিলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এই অঞ্চল থেকে উৎপাদিত তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য ফিনিশড গুডস রপ্তানির জন্য সড়কপথে ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়, যা একদিকে যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনি ব্যয়বহুলও। সাম্প্রতিককালে ভারত কর্তৃক ট্রানজিট সুবিধা বাতিলের পর এই সমস্যা আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতকে এড়িয়ে এয়ার ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতাদের কাছে তৈরি পোশাক পাঠানোর জন্য চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। সরাসরি পণ্য পরিবহনের জন্য শাহ আমানত বিমানবন্দরে ২৭০ টন ধারণক্ষমতার দুটি ওয়্যারহাউস প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি অত্যাধুনিক স্ক্যানার এবং ওয়েট মেশিন সচল করা হয়েছে, যা দ্রুত ও নির্বিঘ্নে পণ্য হ্যান্ডলিং নিশ্চিত করবে। এই উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের রপ্তানিকারকরা এখন সরাসরি তাদের পণ্য বিশ্ববাজারে পাঠাতে পারবেন, যা তাঁদের সময় ও খরচ সাশ্রয় করবে।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহীম খলিল কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে শাহ আমানতের কার্গো স্টেশনে ২৫০ টন আমদানি এবং ২০ টন রপ্তানি পণ্যের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। ২০২২ সাল থেকে আমদানি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ থাকায় স্টেশনটি অনেকটাই অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল। তবে এখন সপ্তাহে বড় সাইজের দুটি কার্গো ফ্লাইট এলেও তা হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম এই স্টেশনটি। এবার শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে এয়ার শিপমেন্ট চালু করতে তিনটি ধাপে সংস্কারকাজ চলছে। ওয়্যারহাউস ক্যাপাসিটি (২৭০ টন সক্ষমতা), যা দিয়ে সপ্তাহে দুটি ওয়াইড বডি কার্গো ফ্লাইট হ্যান্ডল করা সম্ভব। এর মধ্যে কাস্টমসও বিমানবন্দরের কার্গো শাখায় স্থায়ীভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্ব দিচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানোর খরচ কলকাতার তুলনায় দ্বিগুণ। এর অন্যতম কারণ হলো এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশিদের দুর্বল অবস্থান। তবে সম্প্রতি ভারত ট্রানজিট সুবিধা বাতিল করায় বিমানে কার্গো রপ্তানিতে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা কাজে লাগাতে কর্তৃপক্ষ পরিসর বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে চীন হয়ে পণ্য রপ্তানিতে নতুন ফ্লাইট চালু হচ্ছে, যা চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশ এবং সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলে দেবে। চট্টগ্রামের গার্মেন্টস কারখানায় উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ইউরোপে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইয়ংওয়ান তাদের পণ্য পাঠানোর মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু করবে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বড় বড় গার্মেন্টস গ্রুপগুলো চট্টগ্রাম থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠাতে পারবে।

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান ও বিজিএমইএর পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম থেকে কার্গো ফ্লাইট চালু হলে ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমবে এবং ঢাকার ওপর চাপও হ্রাস পাবে। এমিরেটস ও ইতিহাদের স্থানীয় এজেন্ট ভয়েজার এভিয়েশনের ম্যানেজার মোরশেদুল আলম বলেন, শুধু কার্গো ফ্লাইট চালু করলেই হবে না, রপ্তানি কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে ইডিএস এবং আরএ-থ্রি স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করাও জরুরি। এসব সুবিধা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে নেই। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে ইউরোপে সরাসরি পণ্য পাঠাতে হলে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা আবশ্যক।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকার ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এ এম চৌধুরী সেলিম বলেন, চট্টগ্রামে কমার্শিয়াল কার্গো না আসায় আমাদের ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। যদি এসব কার্গো চট্টগ্রামে আসত, তাহলে আমাদের সময় ও খরচ অনেক কমে যেত। এখন ঢাকা থেকে পণ্য আনতে গিয়ে কমপক্ষে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় লাগে। কখনো জট লেগে এ সময় আরো বেড়ে যায়। চট্টগ্রাম যেহেতু দেশের কমার্শিয়াল ক্যাপিটাল, তাই এখান থেকে কার্গো ফ্লাইট চালু করা অত্যন্ত জরুরি। থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট চালু হলে আমাদের ব্যয় আরো কমবে।

চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আবদুল্লাহ আলমগীর জানিয়েছেন, ভারত ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ করার বিষয়টি আমাদের দেশের জন্য ইতিবাচক। এখন আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারব। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং মন্ত্রণালয় থেকে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এগুলো কাজে লাগিয়ে আমরা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইউরোপসহ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে কার্গো পরিবহন করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারব।

সহায়তা পেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়বে

বর্তমানে দেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য বিশ্বের ১৪৮টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। এই খাতের সম্ভাবনা ও নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজীব আহমেদ

সহায়তা পেলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়বে
ইলিয়াছ মৃধা

বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য শিল্পের সম্ভাবনা কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

বাংলাদেশের কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। এটি অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খরচ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে কৃষিকাজ করে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সহযোগিতা এবং বেকার ও নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হলে অবশ্যই কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। এই শিল্পের স্থানীয় বাজার বড় করতে পারলেই রপ্তানি বাজার বড় হবে। 

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে রপ্তানি আয়ে কী ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে?

বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কয়েক বছর ধরে অনেক ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের পড়তে হচ্ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতি, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়তি শুল্ক আরোপে রপ্তানি বাণিজ্য হোঁচট খেয়েছে। এর পরও আমাদের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। আমরা নতুন নতুন বাজার খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কমিউনিটিকে টার্গেট করেই পণ্য রপ্তানি করব। আমরা সেভাবেই পণ্যের ডিজাইন, প্রাইসিং, গুণগত মান উন্নত করার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে আমরা মূলধারার বাজারে প্রবেশ করতে পারি। সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। 

 

প্রাণ গ্রুপ বর্তমানে কতটি দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছে?

বর্তমানে আমরা ১৪৮টি দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করছি। বিশেষত উপসাগরীয় দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করছি। আগে ভারতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হতো। 

 

আন্তর্জাতিক বাজারে গুণগত মান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রাণ কী ধরনের মান নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করে?

রপ্তানি করতে হলে অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদন করতে হবে। তাই বিশ্বের সর্বশেষ প্রযুক্তির সরঞ্জাম আমরা বাংলাদেশে নিয়ে আসছি। বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ লোকজন এনে আমাদের কর্মীদের দক্ষ করছি, যেন আমরা আন্তর্জাতিক মানের পণ্য রপ্তানি করতে পারি।

 

বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় কোন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?

আমাদের দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি করলে ১২০ দিনের মধ্যে ফরেন কারেন্সি আনতে হয়, এখন দেখা যাচ্ছে একটি পণ্য উৎপাদন করে যখন রপ্তানি করছি সে দেশে পৌঁছাতেই আড়াই থেকে তিন মাস চলে যাচ্ছে। সাধারণত সে দেশে যাওয়ার পর রপ্তানিকারক পণ্য বিক্রি করে টাকা দেবে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকাটি আসছে না। ফলে এখানে ওভারডিউ হয়ে যাচ্ছে আড়াই থেকে তিন মাস। আমি সরকারকে বলব, ১২০ দিনের পরিবর্তে অন্তত ১৮০ দিন যাতে বিবেচনা করা হয়।

 

রপ্তানি উপযোগী প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরিতে মান নিয়ন্ত্রণ ও সার্টিফিকেশন নিয়ে কী ধরনের জটিলতা আছে?

আমাদের দেশে সার্টিফিকেশন সংস্থা নেই, ফলে আমাদের বিদেশি কনসালট্যান্ট বা বিদেশি এজেন্সির ওপর নির্ভর করতে হয়। এটি আমাদের জন্য ব্যয়বহুল। যদি সরকারের কোনো সংস্থার মাধ্যমে এই ফ্যাসিলিটিগুলো দেওয়া হতো তাহলে আমরা খুবই কম খরচে এগুলো নিতে পারতাম।

 

সরকার কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছে এই খাতকে এগিয়ে নিতে?

সরকার প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি খাতের জন্য আলাদা করে কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। রপ্তানিতে আগে নগদ সহায়তা ছিল ২০ শতাংশ, সেটি নামিয়ে এখন ১০ শতাংশে নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া আমাদের প্রণোদনা হিসেবে বছরে সম্মানসূচক রপ্তানি ট্রফি দেওয়া হয়। এটি পেয়ে আমরা অনুপ্রাণিত হই। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি মেলার আয়োজন করছে। এসব মেলায় আমরাও অংশগ্রহণ করছি। এতে দেশের পণ্যের প্রচার ও প্রসার ঘটছে। নতুন নতুন বাজার উন্মোচন করতে সক্ষম হচ্ছি।

 

এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার?

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভ্যাট-ট্যাক্স সুবিধা ও নিরবচ্ছিন্ন পানি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দিতে হবে। এখন আমরা যখন নতুন প্রজেক্ট করতে যাচ্ছি তারা আমাদের বাংলাদেশে রাজনৈতিক সরকার না আসা পর্যন্ত ঋণ সহায়তা দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে। তাই আমাদের দেশে অতিদ্রুত রাজনৈতিক সরকার আসা উচিত।

 

বাংলাদেশ কি কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বড় কোনো মাইলফলক ছুঁতে পারবে?

এরই মধ্যে কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানিতে বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে। যদিও তা পোশাক খাতের তুলনায় খুবই অল্প। এই খাতকে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে যদি সহযোগিতা করা হয় তাহলে আগামী কয়েক বছরেই এই খাতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। 

 

ভবিষ্যতে প্রাণ গ্রুপের রপ্তানি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা কী?

আমরা প্রতিনিয়তই নতুন নতুন পণ্য যুক্ত করছি। আমরা আগামী দিনগুলোকে লক্ষ্য করে বিশ্বমানের কনফেকশনারি পণ্য, বিস্কুট ইত্যাদি উৎপাদন করছি। এগুলোর রপ্তানির বাজার প্রচুর উন্মুক্ত। আমরা যদি এখানে আরো কাজ করি তাহলে রপ্তানির দ্বার আরো উন্মোচিত হবে। আমাদের রপ্তানির হার আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

 

ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতায় বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন দেখছেন?

বর্তমানে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১৪-১৫ শতাংশে উঠে গেছে। পাশের দেশে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট। আসিয়ান দেশগুলোতে সুদের হার মাত্র ৪-৫ শতাংশ। ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় যদি টিকে থাকতে চাই তাহলে অবশ্যই আমাদের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটের মধ্যে রাখতে হবে।

রপ্তানি বাজারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড এ বছর ১টি জাহাজ রপ্তানি করেছে, আরো ৪টি জাহাজ রপ্তানি করবে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ডেনমার্কে জাহাজ রপ্তানি করে ঢাকার আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ

মুহাম্মদ আবু তৈয়ব, চট্টগ্রাম
রপ্তানি বাজারে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বৈশ্বিক মন্দা এবং সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে স্থবির হয়ে পড়া বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা এবং দেশীয় শিপইয়ার্ডগুলোর নিরলস প্রচেষ্টায় ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে পুনরায় জাহাজ রপ্তানি শুরু হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড এই পুনরুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। প্রতিষ্ঠানটি চলতি বছর একটি জাহাজ রপ্তানি করেছে, আরো চারটি জাহাজ রপ্তানি করবে। এ ছাড়া ২০২৬ সালে আরো দুটি জাহাজ রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে। ওয়েস্টার্ন মেরিন এখন পর্যন্ত ১১টি দেশে ৩৩টি জাহাজ রপ্তানি করেছে, যার মোট মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

জানা যায়, ২০০৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো ডেনমার্কে জাহাজ রপ্তানি করে ঢাকার আনন্দ শিপইয়ার্ড অ্যান্ড স্লিপওয়েজ। এরপর ২০১০ সালের ৩০ নভেম্বর জার্মানিতে সমুদ্রগামী জাহাজ রপ্তানি করে নিজেদের নাম লেখায় চট্টগ্রামের ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। কিন্তু এ শিল্পে সম্ভাবনা থাকলেও ২০১১ সাল থেকে বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের মন্দার মূল প্রভাব পড়তে শুরু করে বাংলাদেশে। এরপর শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। তখন ক্রমাগত রপ্তানি আদেশ বাতিল করে বিদেশি ক্রেতারা।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারের নীতি সহয়তায় বাংলাদেশ থেকে আবারও জাহাজ রপ্তানি শুরু হয়। ২০২৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক মারওয়ান শিপিংয়ের সঙ্গে আটটি জাহাজ নির্মাণের জন্য চুক্তি সই করে ওয়েস্টার্ন মেরিন। চুক্তি অনুযায়ী, ৬৯ মিটার দৈর্ঘ্যের ল্যান্ডিং ক্রাফট রায়ান ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে হস্তান্তর করা হয়। খালিদঘায়া নামের দুটি টাগবোটসহ বাকি আরো চারটি জাহাজ চলতি বছরের শেষের দিকে সরবরাহ করা হবে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুটি অয়েল ট্যাংকার জাহাজ রপ্তানি করবে ওয়েস্টার্ন মেরিন। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্রয়াদেশ পেয়ে এরই মধ্যে জাহাজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

এর আগে ২০১৭ সালে মারওয়ান শিপিংয়ের জন্য একটি জাহাজ রপ্তানি করেছিল ওয়েস্টার্ন মেরিন। সেই সফল রপ্তানির সূত্র ধরেই মারওয়ান শিপিং নতুন এই চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়। রপ্তানির পাশাপাশি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনকে (বিআইডব্লিউটিএ) দুটি যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি রূপসাএমভি সুগন্ধা সরবরাহ করবে ওয়েস্টার্ন মেরিন। ওয়েস্টার্ন মেরিন এখন পর্যন্ত ১১টি দেশে ৩৩টি জাহাজ রপ্তানি করেছে, যার মোট মূল্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

২০১০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশের গ্রাহকদের জন্য কনটেইনার জাহাজ, তেলবাহী ট্যাংকার, টাগবোটসহ বিভিন্ন ধরনের ৫০টি জলযান তৈরি করেছে কম্পানিটি। তবে করোনা মহামারির কারণে ২০১৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটির রপ্তানি থমকে যায়। ২০২০ সালে দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ রপ্তানি করে।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের তথ্য কর্মকর্তা শাহেদুল বাশার কালের কণ্ঠকে বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ক্রয়াদেশ পাওয়ার আট মাসের মধ্যে রায়ান নামের ৬৯ মিটারের ল্যান্ডিং ক্রাফট জাহাজ তৈরি করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে হস্তান্তর করা হয়েছে। চলতি বছরে আরো চারটি জাহাজ তৈরি করে রপ্তানি করা হবে। ২০২৫ সালে মোট পাঁচটি জাহাজ রপ্তানির পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানের। ২০২৬ সালে আরো দুটি রপ্তানি করা হবে।

ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান বলেন, ২০২০ সালে আমরা একটি জাহাজ ভারতে রপ্তানি করেছিলাম। এরপর কভিড ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক মন্দায় বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে ২০২৩ সালে আমরা বায়ারের খোঁজ শুরু করি। আরব আমিরাতের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্ডার পাই। এর মধ্যে মারওয়ান শিপিংয়ের কাছে তিনটি জাহাজ রপ্তানি করছি। ২০১৭ সালে মারওয়ান শিপিংয়ের কাছে একটি জাহাজ রপ্তানি করেছিলাম। তাতে সন্তুষ্ট হয়ে মারওয়ান শিপিং নতুন প্রকল্পে চুক্তি করেছে।

তিনি বলেন, জাহাজ রপ্তানি করে দেশে বৈশিক মুদ্রা আসছে। পাশাপাশি জাহাজ রপ্তানি ঘিরে দেশে গ্যাস, ইস্পাত, রং, ফার্নিচার, কেমিক্যাল, ইলেকট্রিক কেবলসহ অনেক ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠছে। আমাদের ইয়ার্ড থেকে আটটি জাহাজ রপ্তানির কাজ চলছে। আমাদের সম্পদ হচ্ছে জনশক্তি। তারা দক্ষ, কাজ করার উৎসাহ আছে। তাদের প্রশিক্ষণ ও সুবিধা দিতে পারলে সাফল্য আসবে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম বলেন, সাগর দূষণমুক্ত রাখতে আগামী দিনে কোনো কার্বন নিঃসরণকারী জাহাজ চলবে না। কয়েক বছরে প্রায় ১৫ হাজার জাহাজ স্ক্র্যাপ হবে। এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে শুধু রপ্তানি আয় নয়, বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মী রপ্তানি হবে। এই শিল্প একসঙ্গে দুটি কাজ করে; একটি হলো বৈদেশিক মুদ্রা আয়, অন্যটি হলো এর মাধ্যমে তৈরি হওয়া টেকনোলজিক্যাল গ্রুপ। এই গ্রুপগুলো আবার বাইরে রপ্তানি হয়। যেমন, সিঙ্গাপুরের ৭৫ শতাংশ জাহাজ নির্মাণকারী শ্রমিক কিন্তু আমাদের এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এই সুযোগ এখন কাজে লাগাতে হবে বাংলাদেশকে।

রপ্তানিতে ঋণ খরচ কমাতে সুদহারে প্রণোদনা দরকার

রপ্তানি খাত বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রপ্তানি খাতে ব্যাংকের অর্থায়ন, সহায়তা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ

রপ্তানিতে ঋণ খরচ কমাতে সুদহারে প্রণোদনা দরকার
মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ

ব্যাংক ব্যবসায় রপ্তানি খাত কতটা গুরুত্ব বহন করে?

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে রপ্তানি একটি মৌলিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত, যা জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। ব্যাংকগুলো রপ্তানি-সম্পর্কিত কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, বাণিজ্যিক সহায়তা এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনায় বিভিন্ন সেবা প্রদান করে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জোরদারে সহায়ক ভূমিকা রাখে। রপ্তানি খাত শুধু ব্যাংকের লাভজনক কার্যক্রম নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির গতিপ্রবাহে প্রাণসঞ্চারকারী এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান। যেমনবাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত হিসেবে তৈরি পোশাক ব্যাংকিং খাতের নিবিড় সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে রপ্তানি বিল সংগ্রহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে ব্যাংকগুলোর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরোপ করা এলসি মার্জিন সার্কুলারের বিষয়ে আপনার মতামত কী?

বাংলাদেশ ব্যাংক লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) মার্জিন বৃদ্ধির মাধ্যমে কিছু পণ্যের আমদানিতে বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। এ সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করা, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষা করা এবং সম্ভাব্য মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্বল্প মেয়াদে এ পদক্ষেপ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটির আমদানিনির্ভর ব্যবসা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এই নীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন এড়াতে এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বজায় রাখতে বেসরকারি খাতের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও স্বচ্ছ যোগাযোগ নিশ্চিত করাই হবে সময়োচিত পদক্ষেপ। সেটি করা হচ্ছে, এরই মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে শিথিল করা হয়েছে।

 

দেশের আমদানি ও রপ্তানিতে পার্থক্যের কারণ ও সমাধান কী হতে পারে?

বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণের মধ্যে বিরাট পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো বাণিজ্য ঘাটতি, যেখানে আমদানির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে রপ্তানিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ দ্বারা প্রভাবিত। তা সমাধানে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। যেমনরপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ করতে হবে। ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি পণ্য, আইটি এবং পাটজাত পণ্যের মতো খাতে রপ্তানির সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করতে হবে। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে বিনিয়োগ-তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল ও উপকরণ দেশেই উৎপাদনের মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমাতে হবে। এ ছাড়া বাজার সম্প্রসারণসহ আরো নানা পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

 

নীতিগতভাবে সরকার কী করতে পারে?

বাংলাদেশে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে সরকার। শুল্ক সংস্কার, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার।

বাংলাদেশ সরকার আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত শুল্ক ও অশুল্ক বাধা হ্রাসে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ব্যাবসায়িক খরচ কমাতে এবং রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে; নির্দিষ্ট পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে; শুল্ক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

 

ট্রাম্পের শুল্কনীতি বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ও ব্যাংক ব্যবসায় কেমন প্রভাব ফেলবে?

ট্রাম্প প্রশাসনের পারস্পরিক শুল্কনীতির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি রপ্তানির ওপর প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে এর গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই সিদ্ধান্ত শুধু রপ্তানি প্রবাহকে বিঘ্নিত করবে না, বরং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতেও নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে।

 

ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধি পেলে রপ্তানিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ে?

ব্যাংকঋণে সুদের হার বৃদ্ধি পেলে রপ্তানিকারকদের ঋণ গ্রহণের খরচ বৃদ্ধি পায়, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং পরিমাণ হ্রাসের কারণ হতে পারে। এই প্রভাব প্রশমিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ভর্তুকিযুক্ত রপ্তানি ঋণ, বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার মতো লক্ষ্যভিত্তিক হস্তক্ষেপ বিবেচনা করতে পারে। উচ্চ সুদের হার রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে, কারণ মূলধন ব্যয় বেড়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ বিলম্বিত হয়। এ ছাড়া সুদের হার পরিবর্তন বিনিময় হারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা রপ্তানির প্রতিযোগিতাকে প্রভাবিত করে। যেমনউচ্চ সুদের হার বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করলে স্থানীয় মুদ্রার মূল্য বেড়ে যায় এবং রপ্তানি পণ্য আরো দামি হয়ে পড়ে।

 

এ ক্ষেত্রে করণীয় কী হতে পারে?

বাংলাদেশ ব্যাংক রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য ভর্তুকিযুক্ত সুদের হার প্রণোদনা দিতে পারে, যা রপ্তানিকারকদের ঋণ খরচ কমিয়ে তাঁদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্ত করবে। যেমনমার্কিন ডলারে ইডিএফ সুবিধা পূর্বের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। বিকল্প অর্থায়নের প্রচার- রপ্তানি ফ্যাক্টরিং, ফোরফাইটিংয়ের মতো বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা উৎসাহিত করতে হবে, যা ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমাবে। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্বাভাসযোগ্য বিনিময় হার নিশ্চিত করে একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি, যা রপ্তানিকারকদের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে সহায়ক হবে। সর্বোপরি রপ্তানি খাতে সুদের হার ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা যেতে পারে।

শতকোটি ডলার ছাড়াল কৃষিপণ্য রপ্তানি | কালের কণ্ঠ