বাংলাদেশে কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। বর্তমান কৃষিব্যবস্থার উন্নয়নে আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার, যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা (বীজ, সার ও সেচ), উন্নত গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষকের দ্বারপ্রান্তে কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা ও মোট উৎপাদন প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এর ফলে খোরপোশ কৃষি বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কৃষকরা প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণে শাক-সবজি ও ফলমূল আবাদ করছেন। ফলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন শাক-সবজি ও ফলমূল বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ ১৪৮টি দেশে কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুসারে, উল্লেখযোগ্য কৃষিজাত রপ্তানি পণ্য হলো পাট ও পাটজাত দ্রব্য, সুগন্ধি চাল, শাক-সবজি ও ফলমূল যেমন হিমায়িত আলু, কচু, পটোল, কচুমুখি, লাউ, পেঁপে, শিম, করলা, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, মিষ্টিকুমড়া, আম, কাঁঠাল, লেবু, লিচু, লটকন, আমড়া, পেয়ারা, শুকনা বরই ইত্যাদি। চা, ফুল, নানা রকম মসলা যেমন কালিজিরা, হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া, শুকনা মরিচ, বিরিয়ানি মসলা, কারি মসলা, তামাক, ড্রিংকস, ড্রাই ফুডস প্রভৃতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ‘ড্রাই ফুড’ বা শুকনা খাদ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব ড্রাই ফুডের মধ্যে আছে বিস্কুট, চানাচুর, কেক, পটেটো ক্র্যাকার ও বাদামের মতো নানা রকম খাদ্যপণ্য। কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় রুটি, বিস্কুট ও চানাচুরজাতীয় শুকনা খাবার, ভোজ্যতেল ও সমজাতীয় পণ্য, ফলের রস, বিভিন্ন ধরনের মসলা, পানীয় এবং জ্যাম-জেলির মতো বিভিন্ন সুগার কনফেকশনারি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য রপ্তানি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষিপণ্য থেকে ১.১২ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে সবজি, ফল, চা, মসলা এবং তামাকের মতো কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি ৯.৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা ৫৯৫.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের রপ্তানি করেছে। তথ্য বলছে, একই সময়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে (জুলাই-ডিসেম্বর) রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৪৪.৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ১৩.৩ ট্রিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। গত বছর বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার (দেশীয় চাহিদা ও রপ্তানি) ছিল ৪৮০ কোটি ডলারের। আর কৃষিপণ্যের বাজার ছিল চার হাজার ৭৫৪ কোটি ডলারের।
দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের প্রায় এক হাজার কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র। বাকি ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড়। এর মধ্যে রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৫০টি কারখানা।
প্রাণ-আরএফএল শুকনা খাবারের বড় রপ্তানিকারক। এ ছাড়া স্কয়ার গ্রুপ, এসিআই ফুডসসহ কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এই বাজার। তবে বৈশ্বিক বাজার সামনে রেখে গত কয়েক বছরে রপ্তানিতে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন শিল্প গ্রুপ। এসব শিল্প গ্রুপ এত দিন দেশের বাজারে খাদ্যপণ্য বাজারজাত করে আসছিল। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি এখন রপ্তানিতে নজর দিয়েছে তারা। আবার দেশে ডলার সংকটের মধ্যেও গ্রুপগুলো রপ্তানি বাড়াতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এখনো কম্পানিগুলোর অন্যতম লক্ষ্য বিদেশে বসবাসকারী প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজার।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাত অত্যান্ত সম্ভাবনাময় একটি শিল্প। এটা অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খরচ বেড়ে যায়। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়ে থাকে কৃষিকাজ করে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সহযোগিতা ও গ্রামীণ বেকারদের এবং নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হলে অবশ্যই কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের দিকে নজর দিতে হবে। এতে নারীরা পরিবারের সংসারের কাজের পাশাপাশি আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করতে পারবেন। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের স্থানীয় বাজার বড় করতে পারলেই রপ্তানি বাজার বড় হবে।’
প্রাণের প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানির বিষয়ে প্রাণ গ্রুপের এমডি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে আমরা ১৪৮টি দেশে প্রক্রিয়াজাত পণ্য রপ্তানি করছি। এখন আমরা গাল্ফ কান্ট্রি বা উপসাগরীয় দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি করছি। আগে ভারতে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হতো।’
জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কৃষিপণ্য রপ্তানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে শাক-সবজি। তবে কিছু কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে। সব মিলিয়ে বছরে এক বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মাঝে কয়েক অর্থবছর কৃষিপণ্য রপ্তানিতে তেমন প্রবৃদ্ধি ছিল না। গত অর্থবছরে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিভিন্ন দেশে শাক-সবজি রপ্তানির লক্ষ্যে করপোরেট কম্পানিগুলো ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে শাক-সবজি চাষ করছে। রপ্তানি বাড়াতে গেলে আমাদের উত্তম কৃষিচর্চা বাড়াতে হবে। ল্যাব টেস্ট ও সার্টিফিকেশন আরো দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিদেশে বড় সুপারশপগুলোতে পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিকতা আরো বাড়ানো দরকার। তাহলেই রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে।’




