ওষুধ জনস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অন্য বাজারি পণ্যের মতো ওষুধ খাতেও বিরাজ করছে সীমাহীন নৈরাজ্য। মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ওষুধে বাজার সয়লাব। রয়েছে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। জীবন রক্ষাকারী বহু ওষুধের উচ্চমূল্য নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। এসব অনিয়ম রোধে আইন থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তেমন প্রয়োগ নেই। ফলে যে ওষুধের জীবন বাঁচানোর কথা, অনেক সময় সেই ওষুধই মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে কালের কণ্ঠে ‘ওষুধের অন্তরালে’ শিরোনামে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনের প্রথম পর্বে বলা হয়েছে, ওষুধের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো সরিয়ে ফেলার কথা, কিন্তু অতি মুনাফার লোভে দোকানিরা সেগুলোই দেদার বিক্রি করছেন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামেও একই চিত্র। শুধু তা-ই নয়, অপারেশন থিয়েটারেও মিলেছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। খবরে বলা হয়েছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সেবনের ফলে মৃত্যুও হয়েছে। জানা গেছে, দেশে নিবন্ধিত ফার্মেসির সংখ্যা দুই লাখ ৩৫ হাজারের বেশি, কিন্তু অনিবন্ধিত ফার্মেসি রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। মাঝেমধ্যে এসবের বিরুদ্ধে অভিযান চলে, তবে নামমাত্র জরিমানা করা হয়। এতে কাজের কাজ হয় না।
ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখতে পাই, ক্যান্সারের ওষুধের কাঁচামাল আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য করেছে সরকার, অথচ বাজারে ওষুধের দাম কমেনি, যদিও এই ছাড়ের ফলে ওষুধের দাম ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অন্যদিকে প্রতিবছর নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষ। দুরারোগ্য ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছে।
তৃতীয় পর্বে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। তবে এ কারণে ওষুধ কম্পানিগুলো বেছে নিয়েছে অনৈতিক বিপণন কৌশল। বিক্রয় প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের দামি উপহার দিচ্ছেন, বিনিময়ে প্রেসক্রিপশনে যুক্ত হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় উচ্চমূল্যের ওষুধ, যা শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী রোগীর কাঁধেই বর্তায়। গতকাল শেষ পর্বে বলা হয়েছে, এত এত অনিয়ম থাকলেও শাস্তির নজির নেই বললেই চলে। ২০২৩ সালে প্রণীত ওষুধ ও কসমেটিকস আইনে নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও বিপণনে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু আইনটি কার্যকর হওয়ার আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এই আইনে কাউকে দণ্ড দেওয়া হয়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আকতার হোসেন বলেন, প্রতিবছর ওষুধের মান যাচাই হয়, কিন্তু এই সংখ্যা খুব কম। বিষয়টি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত থাকলেও পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। কারণ পর্যাপ্ত লোকবল নেই।
দেশের ওষুধশিল্প আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। জাতীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই মিটিয়ে থাকে দেশীয় খাত। অভ্যন্তরীণ বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আমাদের ওষুধ এখন রপ্তানিও হচ্ছে। কথা হলো, তার পরও এই খাতে এত নৈরাজ্য কেন?
আমরা মনে করি, ওষুধ খাতে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা রোধে ঔষধ প্রশাসনের আরো কার্যকর ভূমিকা নেওয়া দরকার। লোকবল বাড়িয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ নিয়ে যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা বন্ধে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

