বায়ুদূষণ দিন দিন অদৃশ্য ঘাতকে রূপ নিচ্ছে। মানবদেহে বাসা বাঁধছে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ অন্যান্য কঠিন রোগ। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে অকালমৃত্যুর হার। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, বায়ুদূষণের কারণগুলো আমাদের অজানা নয়, কিন্তু দূষণ রোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেই বললেই চলে। সভা-সেমিনার-নীতিমালা প্রণয়ন—সবকিছুই চলে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগের দেখা মেলে না। এমন উদাসীনতার কারণে বাংলাদেশে বায়ুদূষণ আজ ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায়ও সেই চিত্রই উঠে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষণা বলছে, মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের (সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫) কারণে দেশের ছয়টি প্রধান শহরে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার ২৪০ জন মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে প্রায় ২৪২ জন। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পলিউশন জার্নালেও প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় আরো যেসব সংখ্যাচিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বায়ুদূষণের কারণে হৃদরোগে বছরে মারা গেছে ৩৭ হাজার ৫১৯ জন, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে আট হাজার ৩৪৪ জন এবং ফুসফুসের ক্যান্সারে ৮১১ জন। দূষণ যেহেতু থেমে নেই, এ কারণে মৃত্যুর এই হারও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। গবেষণার সূচকে দেখা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল—ছয়টি শহরে বায়ুদূষণজনিত অকালমৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক চিত্র রাজধানী ঢাকায়, যেখানে মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের কারণে অকালমৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার ৪৮৪ করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গবেষণাদলের প্রধান ড. মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ৮৮ হাজার অকালমৃত্যু এবং ৫ শতাংশ জিডিপির সমান অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের গবেষণার ফলাফল দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা।’
বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো আমাদের অপরিচিত নয়। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কালো ধোঁয়া, সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটা দেশের বাতাসকে আজ প্রাণঘাতী করে তুলেছে। বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) সরাসরি আমাদের ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করছে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা। চিকিৎসকরা বারবার সতর্ক করছেন, বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা এক ধরনের ‘রুগ্ণ ফুসফুস’ নিয়ে বেড়ে উঠছে। অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সবাইকে এর মূল্য চোকাতে হবে।
এদিকে কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, গত বুধবার এক সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু সতর্ক করেছেন, ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কোনোভাবেই কাঠ পোড়ানো যাবে না। তিনি বলেন, ইটভাটা বন্ধ না করে কিভাবে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দূষণ কমানো যায়, সেদিকে বেশি দৃষ্টি দিতে হবে। দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ওই সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
আমরা মনে করি, বায়ুদূষণ রোধে সরকারের নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এ বিষয়ে সচেতন ভূমিকা নিতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য, নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই।

