বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাস আয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তা সত্ত্বেও জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ কম। আধুনিক পৃথিবীতে কায়িক শ্রমের চাহিদা দিন দিনই কমছে। বাড়ছে দক্ষ ও প্রযুক্তিগতভাবে অগ্রসর শ্রমশক্তির চাহিদা। কিন্তু দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি খুবই কম। তা ছাড়া নতুন নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও সেসব বাজারে কর্মী প্রেরণের ক্ষেত্রেও আমাদের খুব একটা অগ্রগতি নেই। গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সৌদি আরব ও কয়েকটি দেশ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য প্রায় বন্ধ। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাস আয়ের প্রবৃদ্ধি এবং সরকারের শ্রম রপ্তানির লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব, সেখানেও কর্মী নিয়োগ কমছে। এর ফলে সামগ্রিকভাবেই বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির গতি নিম্নমুখী। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে বিভিন্ন দেশে কাজের উদ্দেশ্যে গেছেন এক লাখ ৬৬ হাজার ৩৪৫ জন বাংলাদেশি। পরবর্তী তিন মাস ১১ দিনে (১ এপ্রিল থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত) বিদেশে গেছেন এক লাখ ২৭ হাজার ২২০ জন। এই সময়ে প্রথম তিন মাসের তুলনায় কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৯ হাজার ১২৫ জন।
দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রথম তিন মাসে সৌদি আরবে গেছেন এক লাখ ৩৪ হাজার ৬৫৪ জন, কাতারে ১৩ হাজার ৬৮৯ জন, কুয়েতে ছয় হাজার একজন, জর্দানে চার হাজার ৫৮৬ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে তিন হাজার ৬১৭ জন, ইরাকে দুই হাজার ৮৮৩ জন, লেবাননে ৮৭৫ জন, ওমানে ১৭ জন, তুরস্কে ১৬ জন এবং ইয়েমেনে চারজন। অন্যদিকে ১ এপ্রিল থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ৮৯ হাজার ৬১ জন, কাতারে ১৮ হাজার ৩১৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় হাজার ৬০৩ জন, কুয়েতে পাঁচ হাজার ৮০৮ জন, জর্দানে চার হাজার ৮৯০ জন, ইরাকে এক হাজার ৭৫২ জন, লেবাননে ৭৫০ জন, ওমানে ২০ জন, তুরস্কে ১৮ জন এবং বাহরাইনে তিনজন। কাতার ও আরব আমিরাতে কর্মী যাওয়া কিছুটা বাড়লেও সৌদি আরবে বড় ধরনের পতন হয়েছে।
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা-পরবর্তীকালে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে খুবই অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ইসরায়েল লেবাননেও হামলা চালাচ্ছে। এই সংঘাত খুব সহজে থামবে, তা-ও বলা যায় না। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিদেশি শ্রমশক্তির চাহিদা আরো কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে। অথচ আমাদের শ্রমবাজার প্রধানত মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। বন্ধ বা সীমিত শ্রমবাজারগুলো দ্রুত চালু করার পাশাপাশি বিদ্যমান ১০ থেকে ১২টি প্রধান শ্রমবাজার সচল রাখার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে।
আমরা মনে করি, বিদ্যমান শ্রমবাজারগুলোতে আরো বেশি কর্মী প্রেরণের চেষ্টা চালাতে হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর সর্বাধিক জোর দিতে হবে।

