দীর্ঘদিনে দেশের কাগজশিল্প বিকাশ লাভ করেছে। এই শিল্পে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক কাগজকল রয়েছে। এসব কাগজকলে উৎপাদিত কাগজ দেশের চাহিদা মিটিয়ে অনেক দেশে রপ্তানি হয়। এই শিল্পে প্রায় ১০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান রয়েছে। পরোক্ষভাবে আরো প্রায় অর্ধকোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অথচ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে সেই শিল্পটি আজ অত্যন্ত দুঃসময় মোকাবেলা করছে। এর ওপর আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে কম দামে প্রস্তুত (ফিনিশড) কাগজ আমদানি দেশীয় এই শিল্পটিকে রীতিমতো অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে।
বাংলাদেশ পেপার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় এসব কারখানার সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ১৫-১৬ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে দেশের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদা পূরণের পরও প্রায় সাত লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু কম দামে আমদানীকৃত কাগজের কারণে বেশির ভাগ মিল পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিপিএমএর সচিব এ কে এম নওশেরুল আলম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে দেশীয় শিল্প রক্ষা, কর্মসংস্থান বজায় রাখা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করতে বিপিএমএর আমদানীকৃত প্রস্তুত কাগজের ন্যূনতম কর নির্ধারণযোগ্য মূল্য প্রতি মেট্রিক টন ৯৪৫ মার্কিন ডলার নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনটি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ২৯.৫ ইঞ্চি রোল, ২০ অথবা ৩০ শিট এবং ৭০ বা ৮০ জিএসএম অফহোয়াইট ন্যাচারাল শেড প্রিন্টিং পেপার আমদানি নিষিদ্ধ করারও আহবান জানিয়েছে।
বিপিএমএর দাবি, শুল্ক ফাঁকির মাধ্যমে সস্তায় কাগজ আমদানির কারণে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এরই মধ্যে দেশের ৮০টি কাগজকল বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরো ২৬টি কাগজকল বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মেঘনা পাল্প অ্যান্ড পেপার মিলস লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার (মার্কেটিং) মোহাম্মদ ইয়ারুল ইসলাম বিদ্যুৎ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এনসিটিবির কাগজের চাহিদা ও সরবরাহ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাসচিবের সঙ্গে বৈঠকে আমরা জানিয়েছি, দেশীয় রাইটিং ও প্রিন্টিং পেপার মিলগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এনসিটিবির প্রয়োজনীয় কাগজ সরবরাহ করতে সক্ষম।’ তিনি বলেন, ‘অনেক দেশীয় প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পাল্প আমদানি করেছে এবং উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে। এখন যদি বিদেশ থেকে প্রস্তুত কাগজ আমদানি করা হয়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন পরিকল্পনা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।’
বসুন্ধরা গ্রুপের সিনিয়র ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে কাগজ উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল পাল্প সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর। প্রতি টন পাল্পের অ্যাসেসমেন্ট ভ্যালু ৮৪০ মার্কিন ডলার। অথচ প্রস্তুত কাগজ আমদানির সময় অনেক ব্যবসায়ী ৬০০ ডলার মূল্য দেখিয়ে শুল্কায়ন করছেন। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি দেশীয় শিল্প মারাত্মক প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। এই অনিয়ম বন্ধ করতে হবে।
কাগজশিল্প রক্ষায় আন্ডার-ইনভয়েসিং বন্ধ, ন্যায্য শুল্কায়ন এবং সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আমরা মনে করি, প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করা গেলে দেশীয় কাগজশিল্প শুধু দেশের চাহিদা পূরণই নয়, রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

