কক্সবাজারে টানা ৯ দিনের বর্ষণজনিত বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানি এখন অনেক এলাকায় নেমে গেছে। কিন্তু পানির সঙ্গে ভেসে গেছে হাজারো মানুষের বছরের সঞ্চয়, জীবিকার অবলম্বন, আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। কোথাও পুকুর-ঘের খালি, কোথাও ডুবে গেছে ফসলের মাঠ, ভেঙে পড়েছে বেড়িবাঁধ, ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সড়ক। অনেক পরিবার এখনো ঘরে ফিরতে পারেনি, আবার কেউ ফিরেও দেখছেন- বেঁচে আছে শুধু ভাঙা ঘর আর কাদামাটির স্তূপ।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব বলছে, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় কক্সবাজারে সাতটি খাতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দুর্যোগে জেলার অন্তত সাত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জেলার ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিক তথ্যে আরো বলা হয়েছে, বন্যায় জেলার মোট ১ হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১০ উপজেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৭০টি কমবেশি প্লাবিত হয়েছে। পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটির বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে জেলার মৎস্য খাতে। কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, হাজারো পুকুর ও ঘের বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়ে ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ, চিংড়ি, পোনা ও পোস্ট লার্ভা (পিএল)। ক্ষুদ্র ও মাঝারি মাছচাষিদের অনেকেই এক রাতেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৭৬৮ জন মৎস্যচাষি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকা। মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩ লাখ ৫৬ হাজার পোনা এবং ২২১ লাখ পিস পোস্ট লার্ভা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক জানিয়েছেন, জেলায় প্রাথমিক হিসাবে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, এটা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাব। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে যাচাই শেষে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রাথমিক হিসাবে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।
দুর্যোগের পরও ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ২৯৮ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৩ হাজার ৬৩৫ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ২৩৩ মেট্রিক টন চাল বিতরণের কাজ চলছে। তবে এখনো ৫৭ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ৫৩০ মেট্রিক টন চাল, ২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, ৪ হাজার ৮৮৩ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৯৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের প্রয়োজন রয়েছে।




