দেশজুড়ে মাদকের বিস্তার যেন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। মফস্বল শহরের বাসিন্দা থেকে শুরু করে শহরের উচ্চবিত্ত পর্যন্ত মাদকের বিষে জর্জরিত। একটা সময় ধারণা ছিল, তরুণরাই সঙ্গদোষে নেশার ফাঁদে পড়ে। এখন দেখা যাচ্ছে, এক শ্রেণির নারীরাও এই মারণনেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। নেশার টাকা জোগাতে তাঁরা জড়িয়ে পড়ছেন নানা অপরাধেও। লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রায়ই পত্রপত্রিকায় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করার খবর আসে। প্রশ্ন হলো, এর পরও গোটা সমাজ মাদকে সয়লাব হলো কী করে? অর্থাৎ যে পরিমাণ মাদক জব্দ করা হয়, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি মাদকদ্রব্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে মাদকাসক্তদের হাত পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
কালের কণ্ঠ গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষিত নারীরাও এখন মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকের স্বামী-সন্তানও রয়েছে। কিন্তু মাদকের ছোবলে এখন প্রায় সবকিছুই শেষ। চিকিৎসা নিচ্ছেন বিভিন্ন মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে। একটি নিরাময়কেন্দ্রে ৪৯ জন মাদকাসক্ত নারীর সঙ্গে কালের কণ্ঠের প্রতিবেদকের কথা হয়। জানা গেছে, শুরুটা হয়েছে ধূমপান দিয়ে, ধীরে ধীরে ইয়াবা, হেরোইনের মতো প্রাণঘাতী নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন।
জানা গেছে, চলতি বছরের গত ছয় মাসে আহছানিয়া মিশন নারী মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৬২ জন ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে ছয়জনই মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে গেছে। ৪৩ জন দীর্ঘদিন থেকেই মাদক সেবন করছে। বয়সের অনুপাতে ১৫ থেকে ২৫ এবং ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীরাই বেশি। এর বেশি বয়সী নারীরাও রয়েছেন। ধারণা করা হয়, সারা দেশে এই সংখ্যা আরো বেশি। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী জানিয়েছেন, আগের চেয়ে দেশে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। মানস জানিয়েছে, জীবনসঙ্গীর কারণে বেশির ভাগ নারী মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। আবার মাদক কারবারিদের মধ্যেও একটি বড় অংশ রয়েছে নারী, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তী সময়ে নেশার ফাঁদে আটকে গেছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে পাঁচ লাখের বেশি নারী মাদকাসক্ত বা মাদক কারবারিতে জড়িত।
গত সপ্তাহে কালের কণ্ঠের এক খবরে বলা হয়েছে, সীমান্তে ১৪ জেলা দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে গাঁজা। ২০২২ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত (৫২ মাস) দেশে মোট চার লাখ ৮২ হাজার ২২০ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে—দৈনিক হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় আট মণ। এ ছাড়া বাজারে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মাদকও আসছে। ২০১৮ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত নতুন মাদকের তালিকায় যুক্ত হয়েছে এক ডজনেরও বেশি নাম। প্রচলিত মাদকদ্রব্য ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, আফিম, হেরোইন, কোকেন, পেথিডিনের সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে এমডিএমবি, আইস, খাথ, এলএসডি, ফেন্টানাইল, ব্ল্যাক কোকেন, এমডিএমএ, ট্রামাডল ও কিটামিনের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর মাদক। এসব মাদকের প্রায় ৯০ শতাংশই কেনাবেচা হচ্ছে অনলাইনে। নতুন ধরনের কৃত্রিম মাদকের কারখানাও পাওয়া গেছে ঢাকায়।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক কেনাবেচা। রাজধানীর কিছু হটস্পটে ডেকে ডেকে মাদক কেনাবেচা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া যেসব মাদক কারবারি গ্রেপ্তার হয়, তারা কিছুদিন পর জেল থেকে ফিরে এসে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া অনেক রাঘব বোয়াল থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আমরা মনে করি, সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। নামমাত্র অভিযান দিয়ে সমাজকে বিষমুক্ত করা যাবে না। মাদক কারবারিরা অনেক কৌশল পাল্টেছে, সেই অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীকেও পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবক ও সুধীজনকেও মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে।

