মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটা ভিডিও- পানি হাতে ছুটছে এক ছাত্র। তীব্র সংঘর্ষ চলাকালে চিৎকার করে বলছে, ‘পানি লাগবে পানি...’। পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের কারণে তার চোখ খোলা রাখতে সমস্যা হচ্ছিল। পরনে থাকা টি-শার্ট দিয়ে চোখ মুছে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে গুলিতে মারা যান তিনি।
মুগ্ধ’র এই আত্মত্যাগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। এই আত্মত্যাগ মানুষের ক্ষোভ ও শোককে এক কাতারে নিয়ে আসে। আন্দোলনের ভাষা তীব্র হয়। নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদে রাজপথ আরো প্রকম্পিত হয়ে উঠে।
এই মৃত্যু ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে একটি চূড়ান্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ দেওয়ার পেছনে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। পানি লাগবে পানি স্লোগানে উত্তাল হয় পুরো দেশ। দেয়ালে দেয়ালে এখানো শোভা পাচ্ছে পানি হাতে নিয়ে ছুটে চলা সেই দৃশ্য।
বলা হচ্ছিল শহীদ মীর মুগ্ধ’র কথা। পুরো নাম মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ২০২৪ সালের আজকের এই দিনে (১৮ জুলাই) কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকার উত্তরার আজমপুর এলাকায় গুলিতে নিহত হন মুগ্ধ। মুগ্ধ’র দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনায় তাঁর আত্মত্যাগকে মূল্যায়নের আহবান জানানো হয়।
মীর মুগ্ধদের আদি বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কাইতলা গ্রামে। বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমানের চাকরির সুবাদে থাকতেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার কাজীপাড়ায়। পরবর্তীতে তারা পরিবার নিয়ে ঢাকার উত্তরায় বসবাস করতেন।
মুগ্ধ’র জন্ম ১৯৯৮ সালের ৯ অক্টোবর ঢাকার উত্তরাস্থ বাংলাদেশ মহিলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে অনার্স (স্নাতকোত্তর) শেষে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল-এ এমবিএতে অধ্যয়নরত ছিলেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ও ডেপুটি ডিরেক্টর হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত। মুগ্ধ জমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ অনার্স (স্নাতকোত্তর) পাস।
পরিবারের লোকজন জানান, মুগ্ধর শৈশব কাটে উত্তরাতেই। ছোটবেলা থেকেই সে সবার সঙ্গে মিশতো। নামাজি ছিল। যেকোনো কাজে পরিবারের পরামর্শ নিত। পরিবারের অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করত না। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দেওয়ার বিষয়েও পরামর্শ করেন।
গুলিতে মারা যাওয়ার আগে মুগ্ধ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছিলেন। একটি পোস্টে জামায়াত-শিবির, ছাত্রদলের উদ্দেশে ছাত্র আন্দোলনটাকে রাজনৈতিক দলের আন্দোলন না বানানোর আহ্বান জানান তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ১৭ জুলাই তারা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে যেতে আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে যান। বাস আড়াই ঘণ্টা বিলম্বে ছিল। ওই সময় পর্যন্ত মুগ্ধ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেই ছিল। পরদিন সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বড় ভাই মীর মাহবুবুর রহমান জানতে পারেন আন্দোলনকারিদের মাঝে পানি বিতরণ করতে গিয়ে মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পরদিন সকালে বাসায় এসে তারা মুগ্ধ লাশ দেখতে পান। বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা এ সময় জ্ঞান হারান। বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এতটাই শোকাগ্রস্ত ছিলেন যে টানা কয়েক মাস তিনি যেন কাঁদতেই ভুলে গেছিলেন। শুকিয়ে গিয়েছিল চোখে পানি।
মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, শৈশবকালে যখন আমি বুঝলাম মুগ্ধ দেশ ও জাতির জন্য কিছু করতে চায়, তখন আমি তার জমজ ভাই স্নিগ্ধ ও মুগ্ধকে স্কুল জীবনে স্কাউটের মাধ্যমে সামাজিক কাজে উদ্বুদ্ধ করি। স্কাউটের মাধ্যমে তারা বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও অগ্নি নির্বাপক কাজে অথবা ঈদ বা পূজায় যানজট নিরসন এবং সরকারি বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করত। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিশেষ করে ফুটবল খেলা, ভ্রমণ, গিটার খুব পছন্দ করত।
তিনি বলেন, ‘মুগ্ধ’র জীবনের লক্ষ্য ছিল বড় ব্যবসায়ী হওয়া এবং সাধারণ মানুষের যোগ্যতা অনুসারে কর্ম ব্যবস্থার মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান করে দেশের জন্য কিছু করাই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য বা স্বপ্ন। তার নেতৃত্ব আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ছাত্র প্রতিনিধি কনভেনারের দায়িত্ব পালন করে সুনাম অর্জন করে মুগ্ধ।




