লিভার সিরোসিস কী? লিভার সিরোসিস লিভার বা যকৃতের একটি জটিল রোগ, যাতে লিভার বা যকৃত ফাইব্রোসিস হয়ে শক্ত হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে লিভার তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কেন হয়? লিভার সিরোসিস মূলত ‘হেপাটাইটিস বি’ এবং ‘হেপাটাইটিস সি’ নামক দুটি ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। এ ছাড়া কিছু বিরল কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। যেমন—অতিরিক্ত মদ্যপান অথবা অস্বাভাবিক বিপাকীয় কারণে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমা হয়ে ‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’, কিছু জেনেটিক কারণ, যেমন উইলসন’স ডিজিজ, হেমাক্রোমাটসিস ইত্যাদি কারণে লিভার সিরোসিস হয়ে থাকে। লক্ষণ শরীর দুর্বল লাগা, জন্ডিস হওয়া, পেট ও পায়ে পানি এসে ফুলে যাওয়া, রক্তবমি হওয়া, আলকাতরার মতো কালো নরম পায়খানা হওয়া, অজ্ঞান হয়ে পড়া, এলোমেলো আচরণ করা লিভার সিরোসিসের প্রধান লক্ষণ। তবে লিভার সিরোসিস অনেক সময় উপসর্গহীনভাবেও থাকতে পারে। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সার লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীর লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। তবে সব লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীই লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হন না। চিকিৎসা লিভার সিরোসিস একটি দুরারোগ্য দীর্ঘস্থায়ী অসুখ। এটি পুরোপুরি ভালো হয়ে যাওয়ার ওষুধ এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু লিভার সিরোসিসের কারণে যেসব জটিলতা শরীরে হয় সেগুলোর চিকিৎসা করা সম্ভব। কারো কারো ক্ষেত্রে লিভার ট্রান্সপ্লেন্টেশন করেও এ রোগের চিকিৎসা করা যায়। আর দেশেই লিভার সিরোসিসের চিকিৎসা সম্ভব। পরামর্শ হটিকা দেওয়ার মাধ্যমে লিভার সিরোসিসের অন্যতম প্রধান কারণ ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। ০, ১, ৬ মাস ব্যবধানে একটি করে মোট তিনটি টিকা নিলেই ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। কোনো বুস্টার ডোজ টিকার প্রয়োজন নেই। ♦ ‘হেপাটাইটিস বি’ ছাড়া অন্য কোনো কারণে লিভার সিরসিসে আক্রান্ত হলে অবশ্যই ‘হেপাটাইটিস বি’ ও ‘হেপাটাইটিস এ’র টিকা নিন। ♦ ‘হেপাটাইটিস সি’ ভাইরাসকে টিকার দ্বারা প্রতিরোধ করা না গেলেও শুধু তিন মাসের মুখে খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে তা নির্মূল করা সম্ভব। হপরিবারের সদস্যদের হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস আছে কি না তা নিরূপণের জন্য HBsAg, Anti-HBS Antibodz এবং Anti HCV Antibodz পরীক্ষা করাবেন এবং উক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসা নেবেন অথবা টিকা নেবেন। ♦ এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ওষুধের দ্বারা ‘হেপাটাইটিস বি’ ভাইরাসকে একেবারে নির্মূল করা না গেলেও তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ♦ স্ক্রিনিংবিহীন রক্তসঞ্চালন, জন্মদানের সময় মায়ের শরীর থেকে বাচ্চার শরীরে, অনিরাপদ যৌন সংসর্গের মাধ্যমে এবং একজনের টুথব্রাশ, নেইল কাটার, রেজর আরেকজন ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ছড়ায়। ♦ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ খাবার, পানি অথবা স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায় না। হপেট ব্যথা, রক্তবমি, কালো পায়খানা, পেটে ও পায়ে পানি এলে, সংজ্ঞাহীন হয়ে গেলে অথবা এলোমেলো কথা বললে ও অস্বাভাবিক আচরণ করলে অতিসত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ♦ কবিরাজি ও হারবাল ওষুধ অবশ্যই পরিহার করবেন। এসব ওষুধে ভালো হওয়ার চেয়ে লিভার আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ♦ পেটে ও পায়ে পানি এলে পাতে লবণ খাওয়া পরিহার করুন। ♦ রাতে ঘুমানোর আগে হালকা খাবার খেয়ে ঘুমান। ♦ যেকোনো ঘুমের ওষুধ পরিহার করুন। ♦ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোনো ওষুধ খাবেন না। ♦ লিভার সিরোসিসের কারণে লিভার ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি থাকে বিধায় প্রতি ৬ মাস অন্তর পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম এবং S.Alpha Fetoprotein পরীক্ষা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। ♦ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি অন্য কাউকে রক্ত দান করতে পারবেন না। ♦ নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শমতো চলুন ও সুস্থ থাকুন। লেখক সহকারী অধ্যাপক শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল মহাখালী, ঢাকা