[১৯৪৫ সালে জার্মানিতে ঢুকেছিল মিত্র বাহিনী, ছিল ১৯৫৫ পর্যন্ত, এই ১০ বছরে সেখানে লাখ লাখ মার্কিন, ব্রিটিশ ও রুশ সৈন্য ঘাঁটি গেড়েছিল। সেই ঘটনারই পরোক্ষ জের ধরে এখনো জার্মানিতে আছে পাঁচটি মার্কিন সেনানিবাস, সাড়ে ৩৮ হাজার সৈন্য। আর রুশদের তো পূর্ব জার্মানি ছেড়ে যেতে সময় লেগেছে পাক্কা ৫০ বছর। প্রতিবেশী পোল্যান্ডে রুশরা ছিল ৪৮ বছর, হাঙ্গেরিতে ৪৬ বছর। আর সেই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢুকেছিল, এখনো জাপানের কয়েকটি দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে আছে মার্কিন সৈন্য। দেখা যাচ্ছে দখলমুক্ত করতে গিয়ে নিজেরাই দখলদার বনে যাওয়াটা কি সমাজতান্ত্রিক কি ধনতান্ত্রিক মোড়ল রাষ্ট্রের একটি স্বীকৃত রীতি। এদিক থেকে স্বাধীনতার ৯০ দিনের মাথায় সদ্যঃস্বাধীন একটি দেশের মাটি থেকে বিদেশি একটি দেশের সৈন্য প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়া বিরল এক ঘটনা। শক্তিশালী দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ে এই সৈন্য প্রত্যাহারের ঘটনা একটা প্রধান অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে। এত দিন তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। কারণ স্বাধীনতার অন্যতম প্রতীক বিদেশি সৈন্যমুক্ত দেশ। অথচ স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য বর্তমান। এ রকম পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে ইন্দিরা গান্ধী প্রত্যাহার করে নিলেন ভারতীয় সৈন্যবাহিনী। অচিরেই অনেক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিল বা আলাপ-আলোচনা শুরু করল। এমন একটা সাফল্যের জন্য বঙ্গবন্ধুকে কৃতিত্ব দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো তাঁর নামে ভারতঘেঁষা বলে দুর্নাম ছড়ানো হয়েছে। দেশে ফেরার মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কী কথা হয়েছিল, তার কোনো বিবরণ এখন পর্যন্ত ভারত বা বাংলাদেশ—কোনো সরকারই অবমুক্ত করেনি। মুজিব-ইন্দিরা সংলাপের একটি বিবরণই এখন পর্যন্ত আমরা পাই, সেটি তথ্য দপ্তরের তত্কালীন মহাপরিচালক এম আর আখতার মুকুলের স্মৃতিনির্ভর প্রতিবেদন। সরকারি দলিল অবমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এটির ওপরই আমাদের নির্ভর করতে হবে।] স্বাধীন-সার্বভৌম করার অব্যবহিত পর শেখ মুজিবুর রহমান আরো একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তার উল্লেখ না করলে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে মূল্যায়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শুধু আলোচনার মাধ্যমে এ দেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার একক কৃতিত্বও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের। অবশ্য এ ক্ষেত্রে তত্কালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আন্তরিক সহযোগিতা ছিল তুলনাহীন। আমার স্থির বিশ্বাস, বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের পক্ষে এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন অসম্ভব ছিল। স্বাধীনতার ঠিক ৯০ দিনের মাথায় কিভাবে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা হয়েছিল, আমি নিজেই তার অন্যতম সাক্ষী। এখন সেই দুর্লভ মুহূর্তের প্রতিবেদন। দুপুরে খাওয়ার পর কলকাতার রাজভবনে আমরা জনাকয়েক শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একান্তে আলাপ করছিলাম। আমি তখন বাংলাদেশ সরকারের তথ্য দপ্তরের মহাপরিচালক। দিন দুই আগে ঢাকা থেকে ৩৫ জন সাংবাদিককে নিয়ে কলকাতায় এসেছি। এসব সাংবাদিক কলকাতায় এসেছেন বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফরসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহের জন্য। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে কলকাতার বিখ্যাত গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলে। আমার মনে তখন দারুণ কৌতূহল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে বুকে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ‘স্যার, বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে, তাতে এজেন্ডা তো দেখলাম না? তাহলে আপনারা কী কী বিষয়ে আলোচনা করবেন?’ শেখ সাহেব তাঁর পাইপটাতে ঠিকমতো আগুন ধরিয়ে এরিনমোর তামাকের গন্ধওয়ালা একগাদা ধোঁয়া ছেড়ে কথা বলতে শুরু করলেন : ‘পাকিস্তানের কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে লন্ডনে গেলাম। সেখান থেকে ঢাকায় আসার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে জীবনে প্রথম এই মহিলাকে [ইন্দিরা গান্ধী] দেখলাম। এর আগে তো এঁর সঙ্গে আমার কোনো পরিচয়ই ছিল না।’ সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘স্যার, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দারুণভাবে সাহায্য করা ছাড়াও আপনার জীবন বাঁচানোর জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দরজায় ঘুরেছেন।’ বঙ্গবন্ধু মুচকি হেসে আবার কথা শুরু করলেন, ‘তোদের বন্ধুবান্ধবরা তো আমাকে অর্ধশিক্ষিত বলে। তাহলে ইতিহাস থেকে একটা কথার জবাব দে? আজ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদ কিংবা কমিউনিস্ট কিংবা অন্য কেউ, যারাই অন্য দেশে সৈন্য পাঠিয়েছে, তারা কি স্বেচ্ছায় সৈন্য প্রত্যাহার করেছে? তোরা কি দেখাতে পারিস যে এমন কোনো দেশ আছে?’ আমরা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। উনি পাইপে পর পর কয়েকটা টান দিয়ে হালকা মেজাজে কথা আরম্ভ করলেন, ‘কানের মাঝ থেকে সাদা-কাঁচা চুল বাইরাইয়া আছে, ভারতে এমন সব ঝানু পুরনো আইসিএস অফিসার দেখছোস? এঁরা সব ইন্দিরা গান্ধীরে বুদ্ধি দেওনের আগেই আজ আলোচনার সময় ম্যাডামের হাত ধইর্যা কথা লমু। জানোস কী কথা? কথাটা হইতাছে, ম্যাডাম তুমি বাংলাদেশ থাইক্যা কবে ইন্ডিয়ান সোলজার ফেরত আনবা?’ বঙ্গবন্ধু প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন। কলকাতার রাজভবনে ফার্স্ট রাউন্ড আলোচনার শুরুতে দুজনে পরস্পরের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এরপর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার জন্য ভারতের জনগণ, ভারত সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু হঠাত্ করে আসল কথাটা উত্থাপন করলেন। মুজিব : ম্যাডাম, আপনে কবে নাগাদ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করবেন? ইন্দিরা : বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি তো এখন পর্যন্ত নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। পুরো ‘সিচুয়েশন’ বাংলাদেশ সরকারের কন্ট্রোলে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কি বাঞ্ছনীয় নয়? অবশ্য আপনি যেভাবে বলবেন, সেটাই করা হবে। মুজিব : মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রায় ৩০ লাখ লোক আত্মাহুতি দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আইন ও শৃঙ্খলাজনতি পরিস্থিতির জন্য আরো যদি লাখ দশেক লোকের মৃত্যু হয়, আমি সেই অবস্থাটা বরদাশত করতে রাজি আছি। কিন্তু আপনারা অকৃত্রিম বন্ধু বলেই বলছি, বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব। ইন্দিরা : এক্সিলেন্সি, কারণটা আরেকটু ব্যাখ্যা করলে খুশি হব। মুজিব : এখন হচ্ছে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সময়। এই মুহূর্তে দেশে শক্তিশালী রাজনৈতিক বিরোধিতা আমাদের কাম্য নয়। কিন্তু ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতিকে অছিলা করে আমাদের বিরোধীপক্ষ দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম হবে বলে মনে হয়। ম্যাডাম, আপনেও বোধ হয় এই অবস্থা চাইতে পারেন না। তাহলে কবে নাগাদ ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করছেন? ইন্দিরা : (ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তা করলেন) এক্সিলেন্সি, আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আগামী ১৭ই মার্চ বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। মুজিব : ম্যাডাম, কেন এই বিশেষ দিন ১৭ই মার্চের কথা বললেন? ইন্দিরা : এক্সিলেন্সি প্রাইম মিনিস্টার, ১৭ই মার্চ আপনার জন্ম তারিখেই আমাদের সৈন্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরে আসবে। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। ভারত সরকারের আমলাতন্ত্র এবং দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক মহলের বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে যেদিন ভারতীয় সৈন্যদের শেষ দলটি বাংলার মাটি ত্যাগ করে সেদিন ছিল ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। [‘পুরো সিচুয়েশন বাংলাদেশ সরকারের কন্ট্রোলে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কি বাঞ্ছনীয় নয়?’ ইন্দিরা গান্ধীর এই আশঙ্কা যে কতখানি সত্য, কয়েক মাসের মধ্যেই টের পাওয়া যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় বিদ্রোহীদের কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছিল না বাংলাদেশের নবগঠিত প্রতিরক্ষা বাহিনী। তাই প্রত্যাহারের কয়েক মাসের মধ্যেই ভারতীয় সৈন্যদের আবার ডাকতে হলো। সূত্র : এম আর আখতার মুকুলের ‘মুজিবের রক্ত লাল’