১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলা ভাষায় বত্তৃদ্ধতা করেন এবং সেই ভাষণে তিনি প্রায় ৫০টি ইস্যু তুলে ধরেন, যা এখনো মানবজাতিকে নাড়া দেয় এবং সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন, যা এখনো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলস্তম্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তিনি উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন—‘বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব এই নীতিমালার ওপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে।’ আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নীতি হচ্ছে ‘সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারো প্রতি বিরূপ বা শত্রুতা নেই’ এবং এর ফলে বিশ্বসভায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত সম্মানের ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। জাতিসংঘে আমাদের দৃশ্যত শত্রুদেশ না থাকায় গেল ছয় বছরে আমরা জাতিসংঘের প্রায় ৫২টি কমিটি, কমিশন, ব্যুরো বা নেতৃত্বের আসনে নির্বাচিত হই। বস্তুত কোনো নির্বাচনেই আমরা পরাজিত হইনি। এর মূল কারণ বঙ্গবন্ধুর নীতি—আমাদের কোনো চিহ্নিত ‘শত্রুদেশ’ নেই। দ্বিতীয়ত, আমাদের নীতি ও উদ্যোগ ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর এবং তৃতীয়ত, আমরা যে সমস্ত কমিটি, কমিশন ইত্যাদিতে নির্বাচিত হয়েছি সে সমস্ত সংস্থায় আমরা সকলকে সঙ্গে নিয়ে, কার্যকরী বাস্তব পদক্ষেপ নিয়ে সকলের আস্থা ও সম্মান অর্জন করতে পেরেছি। এতগুলো নির্বাচনে জয়লাভ বস্তুত শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা ও বিশ্বাসের ফলশ্রুতি। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং অদ্যাবধি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে এর কোনো ব্যত্যয় হয়নি। তিনি ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান করেন এবং দ্ব্যর্থভাষায় জাতিসংঘে এর সপক্ষে জয়গান গান। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ বা ‘ন্যাম’ সংস্থার অন্যতম নেতা। এ বছরে এই সম্মেলনের চেয়ারম্যান হওয়ার সুযোগ বাংলাদেশ পেয়েও কোনো অজ্ঞাত কারণে তা বিসর্জন দেয়। এ বছর ১৩৩ দেশের সমন্বয়ে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর চেয়ারম্যানের দায়িত্বভার এশিয়া প্যাসিফিক রাষ্ট্রগুলোর ভাগে আসে এবং বাংলাদেশ এর দায়িত্বভার নেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। বস্তুত, যখন আমাদের প্রার্থিতা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, তখন হঠাৎ করে আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর বাংলাদেশের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করলে থাইল্যান্ডের সামরিক সরকারের ভাগ্য খুলে যায়। তারা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। এখানে উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালে ঢাকায় ন্যাম সম্মেলন করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কনভেনশন সেন্টারও তৈরি হয়। তবে বিএনপি সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা দখল করেই তা বাদ দেয়। বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে সংগ্রাম করার দৃঢ় প্রত্যয় শুধু ঘোষণা করেননি, এর সঙ্গে সকল দেশকে একত্রিত হয়ে তা দূর করতে আহ্বান জানান। সুখের বিষয় এই যে আজ বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা দেশনেত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ পরিচালনায় দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে এবং গেল বছরে জাতিসংঘের সকল রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সম্মতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা বিশ্ব থেকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য যে ১৭টি টেকসই লক্ষ্যমাত্রা এবং ১৬৯টি টার্গেট নির্ধারিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এখন অবশ্য এই ‘টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ও টার্গেট অর্জনে’ দেশজুড়ে সকলকে নিয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করার সময় এসেছে এবং তা করতে পারলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ অর্জন সম্ভব। তাহলেই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার স্বপ্ন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে একটি ‘উন্নত, সমৃদ্ধিশালী, শান্তিময়, স্থিতিশীল অর্থনীতি’—যা যেকোনো উন্নত দেশের সমকক্ষ হবে—তা অর্জন সফল হবে। বঙ্গবন্ধু সম্মিলিত জাতিসংঘে ‘শান্তি ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার’ জোরালো অঙ্গীকার করেন এবং সুখের বিষয়, আজ জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশ এক নম্বরে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের প্রায় ১,৫৪,০০০ শান্তিরক্ষী নিয়োজিত হন এবং দেশ ও দশের জন্য তাঁরা সুনাম বয়ে নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পাক-ভারত উপমহাদেশে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে সমধিক প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্যে উপমহাদেশে আপস-মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করিয়াছি। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশের শান্তির কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করবে।’ তাঁর ভাষণটি প্রফেটিক এ জন্য যে আজ শেখ হাসিনার কারণে উপমহাদেশে বাংলাদেশ আপস, ন্যায়নীতি, পরিপক্বতা ও সমঝোতার পররাষ্ট্রনীতি প্রচলন করেছে। বাংলাদেশ ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে জাতিসংঘের সমঝোতায় কোনো প্রকার যুদ্ধ বা ক্ষয়ক্ষতি ছাড়া আইনের মাধ্যমে সমুদ্রসীমার সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে। ৬৫ বছরের অমীমাংসিত বেরুবাড়িসহ সীমান্ত ছিটমহলগুলোর হস্তান্তর শান্তিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ করেছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মধ্যে ট্রানজিট ও যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উদ্ঘাটিত হচ্ছে। আজ বাংলাদেশ ‘ভারত ও নেপাল’ এবং ‘ভারত ও ভুটানের’ মধ্যে পারস্পরিক বন্ধুত্ব গভীর ও অর্থবহ করার ক্ষেত্রে মডারেটরের ভূমিকা পালন করছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ও ভবিতব্য আজ হাড়ে হাড়ে সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর জাতিসংঘের ভাষণে নিপীড়িত মানবজাতির সপক্ষে জোরালো বক্তব্য দেন এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত দক্ষিণ আফ্রিকা ও প্যালেস্টাইনি নিপীড়িত জনগণের বৈধ অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান। আজও বাংলাদেশ তার নীতিতে অবিচল ও সোচ্চার। বঙ্গবন্ধু আণবিক বোমার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং ভারত মহাসাগর ও উপমহাদেশকে ‘শান্তি এলাকা’ হিসেবে ঘোষণার স্বপ্ন দেখেন। তিনি মানুষ-বিধ্বংসী মারণাস্ত্র রোধ করার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতিসংঘের সকল সংস্থায় আণবিক বোমা বন্ধ ও নিশ্চিহ্নকরণ এবং অধিকতর মারণাস্ত্র তৈরি বাবদ খরচ বন্ধ করে তা ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা-রোগ নিরাময়ে এবং উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যয় করার জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। ২০১৩ সালে বিশ্বের সমরনায়ক দেশগুলো ১,৭৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার শুধু প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করে এবং এর ফলে বিশ্বের প্রতিরক্ষা বৃদ্ধির পরিবর্তে বরং শঙ্কা, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক অধিকতর বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বিজ্ঞান ও কারিগরিবিদ্যা ও সহযোগিতার ওপর জোর দেন। আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ তা অর্জনের জন্য জোর তত্পরতা চালাচ্ছে। দুই-তিন বছর ধরে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন বাংলাদেশে ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যা’ বিষয়ক জাতিসংঘের একটি দপ্তর স্থাপনের জন্য উদ্যোগ নেয়। বস্তুত জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ২০১১ সালে যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন তা পেশ করা হয় এবং মহাসচিব তা বিবেচনা করবেন বলে অঙ্গীকার করেন। এসব আলোচনা যখন চলছিল তখন তুরস্ক জাতিসংঘের এই প্রযুক্তিবিষয়ক দপ্তর তার দেশে স্থাপনের জন্য ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেবে বলে ঘোষণা দেয়। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ অবস্থা জাতিসংঘে তুলে ধরেন এবং সুখের কথা যে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য এক নম্বর মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো দূর করার জন্য সকল রাষ্ট্রের বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন এবং বর্তমানে জাতিসংঘ ‘পার্টনারশিপের’ ওপর জোর দিচ্ছে। তবে পার্টনারশিপের সংখ্যা আরো বিস্তৃত হয়েছে—বর্তমানে সকল স্টেকহোল্ডার; রাষ্ট্র, সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, সিভিল সোসাইটি ইত্যাদির নেতৃত্বের সমন্বয়ে ও যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে খাদ্য উৎপাদন ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ওপর জোর দাবি তোলেন এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি কমানোর তাগিদ দেন। তিনি সকল জাতির ঐক্যের প্রতি জোর দেন এবং সকল জাতির পারস্পরিক স্বনির্ভরতার স্বীকৃতি প্রদানে জোরালো ভূমিকা রাখেন। বঙ্গবন্ধু প্রত্যেক রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকারকে নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সুবিধা ভোগের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বের কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করেন। সম্মিলিত জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সকল ভাষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা, তাদের উন্নয়ন ও শ্রীবৃদ্ধিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে ‘বাংলা ভাষায়’ তাঁর ভাষণ প্রদান করে দেশের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বসভায় সম্মানিত করেন এবং তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁরই কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা পর পর ছয়বার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়ে সবাইকে চমকিত করেন। বঙ্গবন্ধু একবার মাত্র জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তিনি তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে নীলনকশা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে গেলেন তা আজও আমাদের আলোর দিশারি। মানবজাতির কঠিন সমস্যাগুলো যা তিনি তাঁর ভাষণে তুলে ধরেন সেগুলো আজও বিশ্ববাসীর জীবনকে করে তুলেছে সংকটময় ও বিপদসংকুল। বঙ্গবন্ধুর জাতিসংঘে ভাষণ তাই এক অনন্য ভাষণ—এর ব্যাপ্তি, এর অ্যাপিল, এর আহ্বান আজও অবাক হওয়ার। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন, রাষ্ট্রদূত এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি। লেখাটি রচিত হয় আগস্ট ৩, ২০১৬।