যুক্তরাষ্ট্রে গত ৩৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হামের সংক্রমণ রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) প্রকাশিত নতুন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই ২ হাজার ৩১৮ জনের শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এটি গত বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
সিডিসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ২ হাজার ২৮৯ জন হামে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সে বছর টিকা না নেওয়া দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়ায় হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। অনেক অভিভাবক টিকা নিয়ে দ্বিধায় থাকায় আগের মতো টিকাদান হচ্ছে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সংক্রমণের ওপর। আগামী নভেম্বরে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য প্যানেল সিদ্ধান্ত নেবে, যুক্তরাষ্ট্র হাম নির্মূল করা দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে পারবে কি না।
আরো পড়ুন
‘প্রেস ফ্রিডম’ নৈশভোজে রসিকতা ও কটাক্ষে ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশে একই ধরনের হামের ভাইরাস যদি এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে টানা ছড়াতে থাকে, তাহলে সেই দেশ হাম নির্মূলের মর্যাদা হারায়। গত বছর কানাডা এই মর্যাদা হারিয়েছে। একই ধরনের ঝুঁকিতে এখন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন, সেই সংখ্যা আগের ২৫ বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যার চেয়েও বেশি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫টি অঙ্গরাজ্যে হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।
গত বছর টেক্সাসে মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেখানে টিকা না নেওয়া দুই শিশুর মৃত্যু হয়। একই সময়ে প্রতিবেশী নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে টিকা না নেওয়া একজন প্রাপ্তবয়স্কও হামে মারা যান। এ ছাড়া গত এক মাসে ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভানিয়ায় নতুন করে হামের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। অন্যদিকে উটাহ অঙ্গরাজ্য এখনো গত বছর শুরু হওয়া সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এটিকে পরবর্তী মহামারির মতো উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন।
আরো পড়ুন
বিশ্ববাজারে বেড়েছে সোনার দাম
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে সাধারণত লালচে দাগ বা ফুসকুড়ি দেখা দেয়। এ ছাড়া জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। টিকা আবিষ্কারের আগে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতো। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম খুব সহজেই একজন থেকে আরেকজনের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। রোগটি অনেক সময় প্রাণঘাতী হতে পারে। আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্মৃতি নষ্ট হয়ে যাওয়া। ফলে শরীর পরে অন্য সংক্রমণের বিরুদ্ধেও দুর্বল হয়ে পড়ে।
হামের এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, হাম সম্পর্কে তার বিভিন্ন মন্তব্য এবং টিকা নীতিতে আনা পরিবর্তন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করেছে। টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশের জন্য পরিচিত কেনেডি এমএমআর (হাম, মাম্পস ও রুবেলা) টিকা নিয়ে একাধিকবার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই টিকাকে নিরাপদ ও অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণ করা হয়েছে।
আরো পড়ুন
প্রচণ্ড দাবদাহ ও বজ্রপাতে কানাডাজুড়ে ছড়াচ্ছে দাবানল
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে এক থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের এমএমআর টিকার দুটি ডোজ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি ডোজ এই রোগ থেকে প্রায় ৯৭ শতাংশ সুরক্ষা দেয়। তবে কেনেডি নিজেও বলেছেন, এমএমআর টিকাই ‘হামের বিস্তার ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’ পাশাপাশি তিনি এমন কিছু চিকিৎসা পদ্ধতিরও প্রচার করেছেন, যেগুলোর কার্যকারিতা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়। চলতি বছরের শুরুতে তিনি আইনপ্রণেতাদের বলেন, বিশ্বের কয়েকটি দেশ সম্প্রতি হাম নির্মূলের মর্যাদা হারিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে হামের সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপেরও প্রশংসা করেন। তার ভাষায়, ‘সারা বিশ্বেই হামের সবচেয়ে খারাপ বছর গেছে।’
চলতি বছরের শুরুতে এক ফেডারেল বিচারক কেনেডির নেতৃত্বে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা স্থগিত করেন। ওই পরিকল্পনার মধ্যে শিশুদের জন্য সুপারিশ করা টিকার সংখ্যা ১৭ থেকে কমিয়ে ১১-তে নামিয়ে আনার প্রস্তাবও ছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার ঠেকাতে গণরোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি করা জরুরি। এর জন্য মোট জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কিছু এলাকায় টিকাদানের হার এর চেয়ে অনেক কম।
এর একটি উদাহরণ দেখা যায় গত বছর সাউথ ক্যারোলাইনার স্পার্টানবার্গ এলাকায়। সেখানে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে আসা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ওই সম্প্রদায়ের কিছু স্কুলে শিশুদের টিকাদানের হার ছিল মাত্র ২০ শতাংশ, যা বিশেষজ্ঞদের মতে বড় ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করেছে।