মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) ভারতীয় বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক গ্যাংস্টার নীতিশ কৌশলকে গ্রেপ্তার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে জমা পড়া নথি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) কানাডা সীমান্তের ভার্মন্ট এলাকা থেকে এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা কৌশলকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেশ কয়েকদিন ধরে নীতিশ নানা কৌশলে এফবিআইয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংসহ ভারতের বেশ কয়েকটি অপরাধী চক্র যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের নানা দেশে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক, অর্থ, অস্ত্র, মানবপাচারসহ নানান অপকর্ম করে বেড়াচ্ছিল। আন্তর্জাতিক চক্রটিকে নিশ্চিহ্ন করতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ মিলে ‘অপারেশন হার্ড বল’ নামে বিরল যৌথ অভিযান শুরু করে। দীর্ঘদিন গোপনে এসব গ্যাংয়ের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গত ৭ জুলাই মার্কিন বিচার বিভাগ লস অ্যাঞ্জেলেসের আদালত থেকে তিনটি বিশাল চার্জশিট প্রকাশ করে, যেখানে মোট ৩৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগনামা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একযোগে ৫০টিরও বেশি স্থানে এক বিশাল ক্র্যাকডাউন চালানো হয়। অভিযানে ভারত-ভিত্তিক গ্যাংগুলোর ২৪ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়. জব্দ করা বিপুল নগদ অর্থ, অস্ত্র ও মাদক।
অভিযুক্ত ৩৭ জনের অন্যতম বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার হওয়া নীতিশ কৌশল। তিনি 'জগ্গু ভগবানপুরিয়া অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ'-এর সদস্য। কৌশল সমাজের জন্য বিপজ্জনক এবং যে কোনো সময় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে, এ যুক্তিতে ফেডারেল প্রসিকিউটররা তাকে বিচার শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত কারাগারে আটকে রাখার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
আটকের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, লস অ্যাঞ্জেলেস আদালতের অভিযোগনামাটি প্রকাশ্যে আসার পর কৌশল তার মোবাইল ফোনটি ফেলে দিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়, যা তদন্তকারীরা আদালতের অনুমতি নিয়ে ট্র্যাক করছিলেন। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে শুধু মোবাইল ফেলে দেয়াই নয়, কৌশল অন্য একজনের ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহার করছিলেন। নাম পাল্টে নিজেকে তিনি ’লালা’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছিলেন।
আরো পড়ুন
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক-মহাসড়ক দ্রুত সংস্কারের নির্দেশ: সড়ক প্রতিমন্ত্রী
প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, ১৬ জুলাই কানাডা সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে একটি গাড়ি ফেলে যাওয়ার পর, সীমান্ত থেকে এক মাইলেরও কম দূরত্বের মধ্যে কৌশলকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, ভার্মন্টের এক বাসিন্দা তার বাড়ির সিকিউরিটি ক্যামেরায় এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে একটি গাড়ির ভেতর উঁকি দিতে এবং একটি খামারে প্রবেশ করতে দেখেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, পরবর্তীতে মার্কিন সীমান্ত টহল এজেন্টরা যখন কৌশলের মুখোমুখি হয়, তখন সে অন্য এক ব্যক্তির নাম সংবলিত নিউ জার্সির একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখায়। কিন্তু আঙুলের ছাপ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তার আসল পরিচয় নিশ্চিত করা হয় এবং কৌশল নিজেও স্বীকার করে যে লাইসেন্সটি তার নয়। এর পাশাপাশি প্রসিকিউটররা কিছু ছবিও জমা দিয়েছেন, যেখানে তদন্ত চলাকালীন নথিবদ্ধ করা একটি বিশেষ সিংহ ট্যাটুর সঙ্গে তার গ্রেফতারের পর দৃশ্যমান ট্যাটুর মিল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ভারতের পাঞ্জাবে জগ্গু ভগবানপুরিয়ার নেতৃত্বে 'জগ্গু ভগবানপুরিয়া অর্গানাইজড ক্রাইম গ্রুপ'এর জন্ম। জগ্গু একসময় কারাবন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগী ছিলেন, পরে তিনি নিজে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী অপরাধ চক্র গড়ে তোলেন। প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, এ সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের অপরাধের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে। বিশ্বজুড়ে এর সদস্য ও সহযোগীর সংখ্যা হাজারেরও বেশি, যার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই সক্রিয় আছেন অন্তত একশ জন। কৌশলের বিরুদ্ধে নির্দিষ্টভাবে এই সংগঠনের পক্ষে সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
কৌশলের বিরুদ্ধে আনা প্রধান অভিযোগগুলোর একটি ২০২৪ সালের ১০ জুলাইয়ের একটি ঘটনা। অভিযোগনামা অনুযায়ী, সংগঠনের সদস্যরা বিশ্বাস করত যে এক ব্যক্তি তাদের গ্যাংয়ের একটি মাদকের চালান চুরি করেছে। চক্রের এক সহযোগী ওই ভুক্তভোগীকে ক্যালিফোর্নিয়ার ম্যানটেকার একটি বাড়িতে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসে, যেখানে নীতিশ কৌশল, অমৃতপাল সিং বাল, হর্ষপ্রীত সিং এবং অমরবীর সিং তাকে আটকে রাখে। অভিযোগনামায় আরও বলা হয়েছে যে, কৌশল এবং হর্ষপ্রীত সিং ভুক্তভোগীকে মারধর করে। এরপর কৌশল, বাল এবং অমরবীর সিং তাকে ফ্রেস্নোর একটি অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যায়। প্রসিকিউটররা জানান, চুরি হওয়া মাদকের চালানের ক্ষতিপূরণ হিসেবে গ্যাং সদস্যরা তার কাছে ৫০ হাজার ডলার দাবি করে এবং টাকা না দেওয়া পর্যন্ত তাকে আটকে রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, পরে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে জগ্গু ভগবানপুরিয়া নিজে ওই ভুক্তভোগীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
আরো পড়ুন
সুনামগঞ্জ কারাগারে হাজতির মৃত্যু
আদালতের নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই সংগঠনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে বড় আকারে কোকেন এবং মেথামফেটামিন পাচারের রুট পরিচালনা করত। তারা দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পূর্ব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মার্কিন-কানাডা সীমান্তে একশ কেজি বা তার বেশি ওজনের মাদকের চালান পাঠাত।
নতুন জমা দেওয়া এই আটকের আবেদনে কৌশলের অতীত জীবন সম্পর্কে বলা হয়, ২০২২ সালে অ্যারিজোনার ইউমা হয়ে অবৈধভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিল কৌশল। ২০২৩ সালে তার বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, ষড়যন্ত্র এবং অস্ত্র আইনের অপরাধে অভিযোগ আনা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সে একটি অস্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয় এবং তাকে ৬০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালে তার বিরুদ্ধে মাদকের একটি মামলাও ছিল।