রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করতে ইউক্রেন গত মাসে রাশিয়ার ভেতরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন হামলা শুরু করে। তবে তাতে হিতে বিপরীত হয়েছে। পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য তো করা যায়ইনি, বরং রাশিয়ার পাল্টা তীব্র হামলায় কেঁপে কেঁপে উঠছে কিয়েভ। ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা অব্যাহত রেখেছে। ফলে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির টেলিফোনে কথা হয়।
ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে চান এবং শান্তিচুক্তি মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক কাছাকাছি। গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সম্মেলনের ঠিক আগে ট্রাম্পের এই ফোন কূটনীতিতে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা শুরুর ব্যাপারে আশাবাদের সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত পুতিন যুদ্ধ আরো তীব্র করার কৌশল ঠিক করছেন। গত বুধবার তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প ও জেলেনস্কি সরাসরি বৈঠক করেন। বৈঠকে ট্রাম্প ইউক্রেনকে আমেরিকার তৈরি শক্তিশালী প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নিজেদের দেশে তৈরি করার লাইসেন্স দেওয়ার বড় ঘোষণা দিয়েছেন। তাতেও মনে হচ্ছে, শান্তি সুদূর পরাহত।
ক্রেমলিনে পুতিনের ঘনিষ্ঠ সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শান্তি আলোচনায় আপাতত কোনো আগ্রহ নেই পুতিনের। বরং সামনের মাসগুলোতে আক্রমণ আরো তীব্র করার পরিকল্পনা করছেন তিনি। তার সামনে এখন লক্ষ্য দনবাস পুরোপুরি দখল করা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে গড়ালেও পুতিন আপাতত সংঘাত আরও বাড়ানোর দিকেই ঝুঁকছেন। এর মধ্যে একজন নিয়মিত পুতিনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বলেছেন, আগামী কয়েক মাসে যুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা খুবই বেশি।
একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, সম্প্রতি যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া কয়েকজন উপদেষ্টাকে ভর্ৎসনাও করেছেন পুতিন। এ বিষয়ে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রস্তুত। তবে একই সাথে স্বাধীনভাবে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরো দনবাস দখল করতে হলে রাশিয়াকে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ চালু করতে হতে পারে। তবে রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হওয়ায় ঝুঁকি থাকায় এতদিন এ ব্যাপারে অনীহা দেখিয়ে আসছিলেন পুতিন।
অন্যদিকে জেলেনস্কির কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইউক্রেনের গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী পুতিন শান্তির জন্য নয়, বরং নতুন সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এমনকি ইউক্রেনের বাইরে ইউরোপের অন্য কোনো দেশেও হামলার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
রাশিয়ার কয়েকজন সামরিক বিশ্লেষকও প্রকাশ্যেই ন্যাটোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলার আশঙ্কার কথা বলছেন। তাদের মতে, বাল্টিক অঞ্চলের ন্যাটো ঘাঁটি কিংবা ইউরোপে ইউক্রেনের জন্য অস্ত্র উৎপাদনকারী স্থাপনাগুলো ভবিষ্যতে হামলার লক্ষ্য হতে পারে। তাতে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি ন্যাটোর সাথে যুদ্ধ শুরু করা রাশিয়ার উদ্দেশ্য নয়। সীমিত হামলার মাধ্যমে ন্যাটো সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতে পারে।
তবে রাশিয়ার ভেতরে জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের অব্যাহত হামলায় ক্ষুব্ধ পুতিন গত সপ্তাহে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেয়া এক ভাষণে বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জবাবে রাশিয়া সীমান্তবর্তী আরও ইউক্রেনীয় এলাকা দখল করে একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলবে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা আন্দ্রেই ইলনিতস্কি সম্প্রতি এক নিবন্ধে দাবি করেন, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইউক্রেনের অন্তত ৩০টি বড় শিল্পকারখানা, ইস্পাত কারখানা এবং ওডেসা বন্দরে হামলা চালানো হতে পারে।
এরপর বাল্টিক দেশ ও রোমানিয়ায় ন্যাটো ঘাঁটি এবং ইউক্রেনের জন্য দূরপাল্লার অস্ত্র উৎপাদনকারী ইউরোপীয় স্থাপনাও হামলার লক্ষ্য হতে পারে। এ বিষয়ে দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউরোপের ক্রমবর্ধমান সামরিকীকরণের বাস্তবতায় রাশিয়া নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য।
ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের ভাষায়, পুতিনের কাছে দনবাস দখল নীতিগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তার মতে, পুতিনের এখন অন্তত একটি বড় বিজয় প্রয়োজন। যার জন্য সামনের দিনগুলোতে আরো তীব্রতা নিয়ে যুদ্ধকৌশল ঠিক করছেন তিনি।





