ইরানের কৌশলগত বন্দরনগরী চাবাহারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার টোকিও সময় সকাল ৭টা ৪৯ মিনিট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৫.২০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮.০২ ডলারে পৌঁছায়। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১.৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৪.৫৬ ডলারে দাঁড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দামে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। ইরানে মার্কিন হামলার পর বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আবুধাবির প্রধান রপ্তানিযোগ্য অপরিশোধিত তেল মুরবান ক্রুডের দাম ৬.৬৭ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৩.৫৭ ডলারে পৌঁছেছে। এশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগারে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এই গ্রেডের তেলের দাম আন্তর্জাতিক অন্যান্য বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। সর্বশেষ লেনদেনে এর দাম ০.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ইউনিট ৩.২২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে, যা জ্বালানির দামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে পারে। ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত ইরানের একমাত্র সমুদ্রবন্দর চাবাহারে সামরিক-সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় রাতভর মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম মার্কিন সামরিক অভিযান। এর ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং উত্তেজনা হরমুজ প্রণালির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ অঞ্চলে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চাবাহারে হামলা শুধু সামরিক উত্তেজনাই বাড়ায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
চাবাহারে মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বেড়েছে। বাজারের আশঙ্কা, ইরান প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো বা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। যদিও চাবাহার বন্দর হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত, বিশ্লেষকদের মতে মূল উদ্বেগ হলো সংঘাত বিস্তৃত হয়ে পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ ধরনের আশঙ্কার প্রতিফলন দেখা গেছে তেলের বাজারে। আবুধাবির মুরবান অপরিশোধিত তেলের দাম অন্যান্য প্রধান বেঞ্চমার্কের তুলনায় বেশি হারে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুরবান তেলের মূল্যবৃদ্ধি এশিয়ার ক্রেতাদের উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীনসহ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলোর শোধনাগারগুলো এই তেল ব্যাপকভাবে ব্যবহার ও লেনদেন করে থাকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মুরবান অপরিশোধিত তেলের দামের তীব্র বৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তবে তেলের দাম বাড়লেও তা এখনও আগের সংঘাতের সময় দেখা ১০০ ডলারের বেশি স্তরে পৌঁছায়নি। এর অর্থ, বাজার এখনো দীর্ঘমেয়াদি বা বড় ধরনের রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না বা গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে কি না, সেদিকে বাজারের নজর রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর জ্বালানি বাজার এ অঞ্চলের পরিস্থিতির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, সামরিক সংঘাত বাড়লে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ও বীমা ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বিনিয়োগকারীরা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ ও বক্তব্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। পাশাপাশি তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল বা তেল উৎপাদনে কোনো বিঘ্ন ঘটে কি না, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।






