বড় মাইলফলক অতিক্রম করেছে ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসনের পর শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন এক হাজার ৫৬৯ দিন ধরে চলছে। যে সময় ১৯১৪-১৯১৮ সালের যুদ্ধের সময়কালকেও ছাড়িয়ে গেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনমত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক ইউক্রেনীয় মনে করেন, এই যুদ্ধ আরো দীর্ঘকাল চলবে এবং আগামী বছরের আগে শেষ হবে না। এর ফলে যুদ্ধের সময়কাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাছাকাছি চলে আসবে। দ্বীতিয় বিশ্বযুদ্ধ ৬ বছরের লড়াইয়ের পর শেষ হয়েছিল। যদিও দুটি সংঘাতের মাত্রা এবং বৈশ্বিক বিস্তৃতি ভিন্ন।
ইতিহাসবিদ ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইউক্রেন যুদ্ধ এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। বিশেষ করে, উভয় যুদ্ধই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পড়েছে এবং নতুন প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন ও কৌশলে বড় পরিবর্তন এনেছে।
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করলে মস্কো দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিল। রুশবাহিনী রাজধানী কিয়েভের দিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই শহরটি দখল করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনের শক্ত প্রতিরোধের মুখে সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর পাল্টা প্রতিরোধের কারণে রুশ সেনাদের কিয়েভের আশপাশের এলাকা থেকে পিছু হটতে হয়। এরপর যুদ্ধ দ্রুত বিজয়ের লড়াই থেকে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সংঘাতে রূপ নেয়, যেখানে উভয়পক্ষই দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একই অবস্থানে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
পরে যুদ্ধটি ধীরে ধীরে একটি ক্ষয়ক্ষতির যুদ্ধে পরিণত হয়, যেখানে উভয়পক্ষই দীর্ঘ সময় ধরে একই রণাঙ্গনে অবস্থান ধরে রেখে লড়াই চালিয়ে যায়।
নিজেকে শুধু ‘ফ্রান্স’ নামে পরিচয় দেওয়া এক ইউক্রেনীয় সেনা বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম যুদ্ধ হয়তো দুই বা তিন বছর চলবে, তারপর রাজনীতিবিদরা কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবেন।’ এরপরের পরিস্থিতির সঙ্গে প্রায়ই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তুলনা করা হয়।
সে সময় ইউরোপজুড়ে সৈন্যরা পরিখায় অবস্থান নিয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করেছিল। ইউক্রেন যুদ্ধেও রুশ ও ইউক্রেনীয় সেনারা বাংকার ও সুরক্ষিত অবস্থান থেকে মাসের পর মাস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গোলন্দাজ বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সাবেক ফরাসি কর্নেল ও সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল গোয়া বলেন, ‘যখন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র দীর্ঘ সময় স্থবির হয়ে যায়, তখন তা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেয়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছিল।
ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এগুলো যুদ্ধক্ষেত্র নজরদারি করছে, শত্রুর অবস্থান শনাক্ত করছে এবং আগের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। ফলে আধুনিক যুদ্ধের চেহারা দ্রুত বদলে যাচ্ছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে ড্রোন ট্যাংকারের মতো প্রচলিত অস্ত্রের গুরুত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার প্রচলিত পরিখার নেটওয়ার্ককে বিপজ্জনক করে তুলেছে, যা সেনাদের আরো গভীরে মাটির নিচে ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করছে। এগুলোকে সহজে শনাক্ত করা যায় না।
ফ্রান্স বলে, ‘এই পরিস্থিতিতে, যারা পরিখা খনন করে তারা বেশি দিন বাঁচে এবং বেশি নিরাপদ থাকে।’
বড় আকারের সেনা চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ ড্রোন দ্রুত সৈন্যদের শনাক্ত করে আক্রমণ করতে পারে। এমনকি ট্যাংক, যা এক সময় শক্তিশালী রণক্ষেত্রের অস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতো, সেগুলোও এখন আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ আকাশ থেকে সেগুলোকে সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা যায়।
ইউক্রেনের বিভিন্ন অংশে দেখা ধ্বংসযজ্ঞ অনেক পর্যবেক্ষককে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। তা সে ক্ষতিগ্রস্ত শহরই হোক, বিধ্বস্ত ভূদৃশ্যই হোক বা অবিরাম গোলাবর্ষণে ক্ষতবিক্ষত মাঠই হোক।
তবে ঐতিহাসিকরা সতর্ক করেছেন, সরাসরি তুলনার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিভিন্ন মহাদেশের একাধিক দেশ জড়িত ছিল। সেখানে ইউক্রেনের যুদ্ধ একটি প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংঘাত আধুনিক ইতিহাসে ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
ইউক্রেনীয় ঐতিহাসিক ইয়ারোস্লাভ বলেন, ‘এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, তবে ড্রোন দিয়ে।’ শান্তি আলোচনা থমকে যাওয়ায়, এই যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য তেল সম্পদের ওপর ইউক্রেনের ড্রোন হামলা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে মস্কোর সক্ষমতা দুর্বল করার কৌশলের একটি প্রধান অংশ হয়ে উঠেছে।