সাহারা মরুভূমি থেকে পাওয়া একটি বিরল উল্কাপিণ্ডের বিশ্লেষণে সৌরজগতের শুরুর দিকের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এক গবেষণায় বলা হয়েছে, এই উল্কাপিণ্ডে এমন একটি প্রাচীন জগতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা সৌরজগত গঠনের প্রাথমিক সময়ে ছিল, কিন্তু পরে তা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, হারিয়ে যাওয়া এই গ্রহের আকার অন্তত পৃথিবীর চাঁদের সমান ছিল। এমনকি এটি মঙ্গলের কাছাকাছি আকারেরও হতে পারে। তবে সৌরজগত গঠনের কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই ভয়াবহ সংঘর্ষে এর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বোল্ডার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ভূবিজ্ঞানী এই গবেষণা পরিচালনা করেছেন। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী 'আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সাইন্স লেটার্স'- এ।
এই গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বিশেষ উল্কাপিণ্ড। এর নাম 'নর্থওয়েস্ট আফ্রিকা ১২৭৭৪' বা সংক্ষেপে 'এনডব্লিউএ ১২৭৭৪'। ২০১৯ সালে সাহারা মরুভূমিতে এই কালো রঙের ছোট পাথরটি পাওয়া যায়। বাইরে থেকে এটি সাধারণ পাথরের মতো দেখালেও পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা এর ভেতরে অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য খুঁজে পান। উল্কাপিণ্ডটি ‘অ্যাঙ্গ্রাইট’ নামে পরিচিত এক বিরল ধরনের আগ্নেয় মহাকাশ পাথরের শ্রেণিতে পড়ে। পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত পাওয়া প্রায় ৮০ হাজার উল্কাপিণ্ডের মধ্যে মাত্র ০.০৯ শতাংশ অ্যাঙ্গ্রাইট। বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এই ধরনের উল্কাপিণ্ড কোনো ছোট গ্রহাণু থেকে এসেছে। কারণ এতে সিলিকা বা সিলিকন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ খুবই কম। সিলিকা হলো বালি, কোয়ার্টজ এবং পৃথিবী ও মঙ্গলের মতো পাথুরে গ্রহের বাইরের স্তরের প্রধান উপাদান। এই কারণে ধারণা করা হয়েছিল অ্যাঙ্গ্রাইট প্যারেন্ট বডি বা এই পাথরগুলোর মূল জগতটি ছিল ছোট ও সাধারণ কোনো গ্রহাণু, যার ব্যাসার্ধ ২০০ কিলোমিটারের বেশি ছিল না।
কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা উল্কাপিণ্ডের ভেতরে থাকা ক্লিনোপাইরোক্সিন নামের একটি খনিজ বিশ্লেষণ করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, এই খনিজে অস্বাভাবিক মাত্রায় অ্যালুমিনিয়াম রয়েছে। বিজ্ঞানীরা এরপর বিশেষ কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে হিসাব করেন, এমন খনিজ তৈরি হতে কত চাপ প্রয়োজন। ফলাফল তাদের বিস্মিত করে। তারা দেখেন, এই খনিজ তৈরির জন্য অন্তত ১৭.৫ কিলোবার চাপ প্রয়োজন। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর সমুদ্রখাত মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলদেশের চাপের চেয়েও ১৭ গুণ বেশি। গবেষকদের মতে, এত বেশি চাপ কোনো ছোট গ্রহাণুর ভেতরে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।
এরপর বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখেন, এমন চাপ তৈরি করতে হলে মূল গ্রহটির আকার কত বড় হতে হবে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, উল্কাপিণ্ডটি গ্রহের গভীরে নয়, বরং পৃষ্ঠের কাছাকাছি অংশে তৈরি হয়েছিল। কারণ এর খনিজ কণাগুলো খুব দ্রুত ঠান্ডা হওয়ার চিহ্ন বহন করছে। এই তথ্য থেকে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, উল্কাপিণ্ডটির উৎস কোনো ছোট গ্রহাণু নয়। তাদের হিসাবে, হারিয়ে যাওয়া সেই জগতের ব্যাসার্ধ অন্তত ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার ছিল। অর্থাৎ এটি পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও কিছুটা বড়। গবেষণার সর্বোচ্চ হিসাব অনুযায়ী, এর ব্যাসার্ধ ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা প্রায় মঙ্গলের সমান।
গবেষণাটি সৌরজগতের প্রাথমিক ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্যের জন্মের কয়েক মিলিয়ন বছরের মধ্যেই চাঁদ বা মঙ্গলের আকারের অনেক গ্রহ-ভ্রূণ তৈরি হয়েছিল। তখনকার সৌরজগত আজকের মতো শান্ত ছিল না। বরং সেখানে অসংখ্য বড় বস্তু একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত ছিল। গবেষকদের ধারণা, এনডব্লিউএ ১২৭৭৪ যে জগত থেকে এসেছে, সেটিও এমন কোনো ভয়াবহ সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে যায়। এর অধিকাংশ অংশ পরে অন্য গ্রহের সঙ্গে মিশে যায়। এমনকি সেই হারিয়ে যাওয়া জগতের কিছু উপাদান আজকের পৃথিবীর ভেতরেও থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
যে গ্রহটি ধ্বংস হয়ে গেছে, তার একটি ছোট অংশ হিসেবে এনডব্লিউএ ১২৭৭৪ টিকে ছিল কোটি কোটি বছর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি যেন অতীতের একটি ‘টাইম ক্যাপসুল’। এর ভেতরে সৌরজগতের শুরুর সময়ের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকেরা এই পাথরের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করেছেন। ইলেকট্রন মাইক্রোপ্রোব এবং বিশেষ ধরনের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তারা কোটি কোটি বছর আগের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার হয়তো কেবল শুরু। বিশ্বের বিভিন্ন জাদুঘর ও গবেষণাগারে সংরক্ষিত হাজার হাজার উল্কাপিণ্ডের মধ্যে এমন আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া জগতের চিহ্ন লুকিয়ে থাকতে পারে। তাদের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে সৌরজগতের জন্ম ও বিকাশ সম্পর্কে আরো নতুন তথ্য জানা যাবে।




